

ক্ষুদীরাম দাস :
এক.
প্লাস্টিকের ছাদ বেয়ে চুইয়ে পড়া রোদের আলোটা যখন রামপদের মুখে এসে পড়লো, তখন বেলা অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের খাঁ খাঁ রোদ যেন আগুন ঢেলে দিচ্ছে ইট-পাথরের শহরে। বস্তির ছোট্ট একচালা ঘরটিতে বাতাসের কোনো চলাচল নেই। ঘরের কোণে রাখা পুরনো টিনের টেবিল ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছিলো, কিন্তু তাতে যেন বাতাসের বদলে গরম বাষ্প বের হচ্ছিলো।

রামপদ পেশায় একজন দিনমজুর। শরীরে যেটুকু ক্ষমতা আছে, তার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে সে প্রতিদিন ইটের পাঁজায় কিংবা কনস্ট্রাকশনের কাজে খেটে খায়। প্রতিদিনের উপার্জনে প্রতিদিনের সংসার চলে। আজ সকালেও রামপদ গায়ে হাতকাটা গেঞ্জিটা চড়িয়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
মানসী রান্নাঘরের কোণে বসে চালের কৌটোটা নাড়াচাড়া করছিলো। কৌটোর তলায় সামান্য কয়েক মুঠো চাল পড়ে আছে, যা দিয়ে রাতের রান্না তো দূরের কথা, দুপুরের খিদে মেটানোই কঠিন। মানসী করুণ চোখে রামপদের দিকে তাকালো।
“হ্যাঁ গো, আজ কি শরীরটা ভালো লাগছে তোমার? সকালে ওঠার পর থেকেই তো মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আজ অন্তত কাজটা বন্ধ রাখো,” মানসী উদ্বেগভরা কণ্ঠে বললো।
রামপদ মৃদু হেসে স্ত্রীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বললো, “কাজ বন্ধ রাখলে যে আজ হাঁড়ি চড়বে না মানসী। চালের কৌটো তো খালি। অর্ক বাচ্চা মানুষ, ওকে তো না খাইয়ে রাখা যাবে না। শরীর একটু ক্লান্ত লাগছে, কাজে গেলে ঠিক হয়ে যাবে। তুই চিন্তা করিস না, বিকেলে ফেরার পথে চাল আর টুকটাক আনাজ নিয়ে আসবো।”
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদের চার বছরের সন্তান অর্ক বাবার পা জড়িয়ে ধরে তোতলা গলায় বললো, “বাবা, আজ আমার জন্যে একটা লজেন্স আনবে?”
রামপদ হেঁট হয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে চুমু খেলো। সে বললো, “হ্যাঁ রে সোনা, বাবা আজ কাজ শেষে তোর জন্যে মিষ্টি লজেন্স নিয়ে আসবে। তুই মার কথা শুনে চলিস, বুঝলি?”
ছোট্ট অর্ক আনন্দের সাথে মাথা নাড়লো। কিন্তু মানসীর মন অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে উঠছিলো। যে মানুষটার গায়ের চামড়া রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে, সেই শক্তপোক্ত মানুষটার চোখে আজ কেমন যেন এক অদ্ভুত ক্লান্তির ছাপ দেখা যাচ্ছিলো।
দুই.
দুপুরের রোদের তাপ যতো বাড়ছিলো, শহরের বড় রাস্তার ধারের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের পরিবেশ ততোই দমবন্ধ হয়ে উঠছিলো। রামপদ মাথায় ঝুড়ি ভর্তি করে ভারী ইট আর সিমেন্টের বস্তা বয়ে ওপরের তলায় নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রচণ্ড তাপদাহে শরীরের সব জল শুকিয়ে আসছিলো। গায়ের গেঞ্জিটা ঘেমে একেবারে গায়ে সেঁটে গেছে।
“ওরে রামপদ, একটু জিড়িয়ে নে ভাই! আজকের রোদটা বড়ই ভয়ঙ্কর,” পাশের সহকর্মী সনাতন হাঁপাতে হাঁপাতে বললো।
রামপদ কপালে জমে থাকা ঘামের ফোঁটাটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে বললো, “আর কিছুটা কাজ বাকি আছে সনাতন। আজ মজুরি পুরোটা না পেলে ঘরে চাল নেওয়া যাবে না। অর্ক আর মানসী পথ চেয়ে বসে আছে।”
এই বলেই সে আবার ভারী ইটের ঝুড়িটা মাথায় তুলে নিলো। কিন্তু তিন তলার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হঠাৎ রামপদের চারপাশটা কেমন যেন ঘুরতে লাগলো। মাথার মধ্যে বিকট একটা শব্দ হলো। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। হাতের ঝুড়িটা ঝনঝন করে হাত থেকে পড়ে গেলো ইটের ওপর, আর তার সাথেই ঢলে পড়লো রামপদের শক্ত শরীরটা।
“ওরে রামপদ! কী হলো তোর!” সনাতন চিৎকার করে উঠলো।
কাজের সহকর্মীরা সবাই তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো। রামপদের মাথায় জল ছিটিয়ে দেওয়া হলো, কিন্তু তার জ্ঞান ফিরলো না। প্রচন্ড রোদে হিট স্ট্রোকের মতো হয়ে শরীর পুরো নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিলো।
স
হকর্মীরা মিলে একটা রিকশা ডেকে কোনো মতে রামপদকে তার বস্তির ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলো। কাজের সর্দার দয়া করে হাতে জমানো একশোটা টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললো, “আজকের কাজের জলখাবারের পয়সাটা রাখ। রামপদকে ঘরে নিয়ে যা, ডাক্তার দেখা।”
তিন.
বিকেলের সূর্য যখন ধীরে ধীরে হেলে পড়ছিলো, ঠিক তখনই রিকশার শব্দ শুনে মানসী বাইরে বেরিয়ে এলো। রিকশা থেকে সনাতন আর অন্য একজন শ্রমিক মিলে রামপদকে ধরে বের করছে দেখে মানসীর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো।
“কী হয়েছে গো সনাতন দাদা? ওনার এমন অবস্থা কেন?” মানসী থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে উঠলো।
সনাতন বিষণ্ন কণ্ঠে বললো, “রোদের মধ্যে কাজ করতে করতে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলো বৌদি। রক্তচাপ একদম নেমে গেছে মনে হয়, শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। ওকে ধরে ভেতরে নাও, ঘরে মাথায় জল দাও।”
মানসী আর সনাতন মিলে রামপদকে ঘরের একমাত্র চটের বিছানায় শুইয়ে দিলো। রামপদের মুখখানা বিবর্ণ, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মানসী বারবার রামপদের গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে লাগলো, “হ্যাঁ গো, চোখ খোলো! কী হলো তোমার? এভাবে চুপ করে আছো কেন?”
রামপদ ক্ষীন কণ্ঠে চোখ খুলে একটু তাকানোর চেষ্টা করে আবার বন্ধ করে ফেললো। তার শরীর থেকে যেন শেষ শক্তিটুকুও বেরিয়ে গেছে।
ঘরের আবহাওয়া মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেলো। চিকিৎসার জন্যে ঘরে একটা টাকাও ছিলো না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা বাক্সে মানসী তন্ন তন্ন করে খুঁজলো, কিন্তু কয়েকটা এক টাকার কয়েন ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলো না। সনাতন দাদা যে ১০০ টাকাটা দিয়েছিলো, তা দিয়ে ওষুধের দোকানে গিয়ে প্রাথমিক কিছু স্যালাইন আর দুটো ট্যাবলেট আনতেই শেষ হয়ে গেলো।
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতো অর্থ তাদের ছিলো না। এমনকি রাতের খাবারের চালটুকুও আজ বাড়িতে বাড়ন্ত। ঘরের চালের কৌটো সম্পূর্ণ খালি। চারপাশের অভাব আর অমানসিক বাস্তবতার নিষ্ঠুর রূপ মানসীকে গ্রাস করতে লাগলো।
চার.
স্বামীর এমন অসহায় অবস্থা দেখে মানসী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। যে মানুষটা তাদের সব বিপদ থেকে আগলে রাখে, সেই শক্ত মনের মানুষটি আজ খড়কুটোর মতো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্েযর এই কঠিন থাবা যে এতোটা নির্মম হতে পারে, তা মানসী আজ হাড়হাড় টের পাচ্ছিলো।
মানসী বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে রামপদকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। অঝোর ধারায় তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে রামপদের বুকে পড়তে লাগলো।
সে রামপদের বুকে মাথা রেখে আর্তনাদ করে বলতে লাগলো, “তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমাদের কী হবে? এই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াবো? ওগো, চোখ খোলো, একবার কথা বলো আমার সাথে! আমরা আর কিছু চাই না, শুধু তুমি ভালো হয়ে ওঠো। এভাবে চুপ করে থেকো না, আমার যে বড় ভয় করছে!”
রামপদ অসুস্থ শরীরে কষ্ট করে হাতটা বাড়িয়ে স্ত্রীর মাথায় রাখলো। তার নিজের চোখ দিয়েও জল ঝরছিলো। কিন্তু মানসীকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তার জানা ছিলো না। সে তো একজন ব্যর্থ বাবা, যে আজ নিজের অসুস্থতার কারণে পরিবারের জন্য এক মুঠো চালও জোগাড় করতে পারেনি, সন্তানের জন্য সেই মিষ্টি লজেন্সটা কিনে আনতে পারেনি।
ঠিক তখনই, ঘরের মেঝ হাঁটু মুড়ে বসে থাকা তাদের ছোট্ট সন্তান অর্ক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিলো সবটা। ৪ বছরের এই বাচ্চাটির কাছে পৃথিবীটা ভীষণ সরল। সে বুঝতে পারছিলো না তার বাবা-মা কেন কাঁদে, কেন ঘরের পরিবেশ এমন ভারী হয়ে গেছে।
অর্ক উঠে এসে মায়ের আঁচলটা চেপে ধরলো। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে মানসীর চোখের জল মোছানোর চেষ্টা করে তোতলা কণ্ঠে বললো, “মা, তুমি কাঁদছো কেন? বাবা, তোমার কষ্ট হচ্ছে? আমি তো আর লজেন্স চাইবো না, বাবা। তুমি কেঁদো না!”
বাবার ও মায়ের চোখের জল দেখে সেই ছোট্ট শিশুটির মনেও এক অজানা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। অর্কের কচি মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সে বুঝতে পারছিলো কোনো একটা বড় বিপদ তাদের ঘিরে ধরেছে, কিন্তু সেই বিপদটা ঠিক কী, তা বোঝার বয়স তার হয়নি। ঘরের থমথমে নীরবতার মধ্য দিয়ে শুধু অর্কের কান্নার আওয়াজ আর মানসীর দীর্ঘশ্বাস ভাসতে লাগলো।
পাঁচ.
রাত যতো বাড়তে লাগলো, শহরের আলো তত উজ্জ্বল হলো, কিন্তু এই ছোট একচালা ঘরটিতে অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে নামলো। মানসী নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলো। কাঁদে ভেঙে পড়লে তো চলবে না, অসুস্থ স্বামী আর ছোট বাচ্চাটার দিকে তাকাতে হবে তাকেই।
মানসী অর্ককে কোলে তুলে নিয়ে একটু স্যালাইনের জল খাওয়ালো। ঘরে থাকা শেষ অবশিষ্ট এক কামড় শুকনো রুটি অর্কের মুখে তুলে দিয়ে বললো, “খেয়ে নে সোনা, অর্ক ভালো ছেলে না? বাবা একটু ঘুমাচ্ছে, কাল সকালে বাবা আবার ভালো হয়ে যাবে।”
অর্ক মায়ের বুকে মাথা রেখে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু মানসীর চোখে ঘুম ছিলো না। সে সারারাত রামপদের মাথায় ঠান্ডা জলের পট্টি দিয়ে গেলো। প্রতি মুহূর্তে রামপদের নিশ্বাসের শব্দ শুনে সে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করছিলো।
মানসী মনে মনে শ্রীকৃষ্ণের চরণে প্রার্থনা জানাতে লাগলো, “হে প্রভু, আমাদের মতো গরীবদের জীবনে এতো পরীক্ষা কেন নাও? আমাদের তো চাওয়ার কিছু নেই, শুধু একটু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু দাও। আমার স্বামীকে ভালো করে দাও ঠাকুর, তা না হলে এই ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো?”
ভোরের আলো যখন ফুটে উঠলো, তখন রামপদের গায়ের উত্তাপ কিছুটা স্বাভাবিক হলো। সারারাতের পরিচর্যা আর মানসীর আপ্রাণ চেষ্টায় রামপদ চোখ মেলে তাকালো।
মানসী ভিজে হাত দিয়ে রামপদের কপাল ছুঁয়ে বললো, “এখন কেমন লাগছে তোমার?”
রামপদ ধীমে কণ্ঠে বললো, “একটু ভালো লাগছে মানসী। কিন্তু তুই সারারাত জেগে রইলি? তোর মুখটা শুকিয়ে গেছে।”
মানসী মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললো, “আমার কিছুই হয়নি। তুমি সুস্থ থাকলে আমাদের সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। আজ আর তোমাকে কোথাও যেতে দেবো না। আমি পাশের বাড়ির বৌদির ঘরে গিয়ে কিছু কাজ করে দেবো, উনি যা দেবেন তা দিয়েই আজকের দিনটা চলে যাবে।”
ছয়.
সকাল বেলা বস্তির মাতব্বর ও পাশের ঘরের দয়ালু প্রতিবেশীরা রামপদের অসুস্থতার কথা শুনতে পেয়ে দেখতে এলো। সনাতন দাদাও সকাল সকাল এক কেজি চাল আর কিছু আনাজ নিয়ে হাজির হলো।
সনাতন বললো, “রামপদ, তোরা আমাদের পর ভাবিস নাকি? কাল রাতে অতটা বিপদে পড়েছিলি, আমাদের একবার ডাকলি না কেন? আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু একে অপরের পাশে তো দাঁড়াতেই পারি।”
মানসী চোখের জল মুছে সবাইকে ধন্যবাদ জানালো। প্রতিবেশীদের এই সামান্য সহানুভূতিটুকু সেই মুহূর্তে তাদের কাছে স্বর্গের মতো মনে হচ্ছিলো।
বেলা বাড়ার পর অর্ক ঘুম থেকে উঠে দেখলো তার বাবা চোখ খুলে তাকিয়ে আছে। সে আনন্দে বাবার পাশে গিয়ে বসলো। রামপদ হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কোলে টেনে নিলো।
“বাবা, তোমার কি আর ব্যথা করছে?” অর্ক জিজ্ঞেস করলো।
রামপদ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে হাসলো, “না রে সোনা, বাবা এখন একদম ভালো। আজ তোকে অনেক লজেন্স কিনে দেবো।”
অর্ক হেসে উঠে বললো, “আমার লজেন্স লাগবে না বাবা, তুমি সুস্থ থাকলেই হবে।”
মানসী রান্নাঘরের কোণে গিয়ে উনুনটা ধরালো। ঘরের চালের কৌটোয় আবার চাল উঠেছে, হাঁড়িতে জল ফুটতে শুরু করেছে। কাল রাতের যে হাহাকার আর অন্ধকার তাদের গ্রাস করতে চেয়েছিলো, ভোরের আলোয় তা কেটে গেছে। দারিদ্র্য হয়তো তাদের জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী, অভাব হয়তো তাদের নিত্যদিনের ছায়া, কিন্তু পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি আর বেঁচে থাকার অদম্য লড়াইয়ের কাছে সেই দারিদ্র্যও হেরে যেতে বাধ্য হয়।
মানসী উনুনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলো—যতো বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, যতক্ষণ তারা একসাথে আছে, ততক্ষণ কোনো ঝড়ই তাদের সংসারকে ভাঙতে পারবে না। জীবন সংগ্রামের এই কঠিন পথে তারা একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে যাবে অনেক দূর, নতুন এক সকালের দিকে।
সাত.
পরদিন সকালে রামপদের শরীরে নতুন শক্তি ফিরে এলো। কালকের সেই বিভীষিকাময় রাতের পর আজ যেন সে জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাচ্ছিলো। মানসী সকালে উঠে অল্প কিছু ভাত ফুটিয়ে রামপদকে দিলো। রামপদ মানসীর দিকে তাকিয়ে দেখলো, কাল সারারাত জেগে থাকা সত্ত্বেও মানসীর চোখে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“মানসী,” রামপদ ডাকলো।
মানসী ফিরে তাকিয়ে বললো, “বলো?”
“আমি ভেবেছিলাম আমি একা সব চালাই, কিন্তু কাল রাতে বুঝলাম তুই না থাকলে আমি আর আমাদের এই সংসার সম্পূর্ণ অচল। তুই আমাকে নতুন জীবন দিলি,” রামপদ আবেগভরা কণ্ঠে বললো।
মানসী একটু মুচকি হেসে বললো, “সংসার কি একজনে চলে? আমরা যে দু’জন। বিপদে পড়াটাই তো বড় কথা নয়, বিপদ থেকে একসাথে ঘুরে দাঁড়ানোটাই আসল কথা। তুমি শুধু নিজের শরীরের যত্ন নাও, আমরা সবাই মিলে এই কষ্টের দিনগুলো পার করে দেবো।”
অর্ক তখন ঘরের সামনে উঠোনে ছোট্ট একটা কাঠের গাড়ি নিয়ে খেলছিলো। কালকের সেই ভয় আর আতঙ্ক তার ছোট্ট মন থেকে উবে গেছে। সকালের রোদ এসে পড়েছিলো অর্কের মিষ্টি কচি মুখটায়।
রামপদ আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো। শরীরের দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, কিন্তু মনের ভেতরে এক নতুন প্রত্যয় জেগে উঠেছে। সে জানে, জীবন যতোই কঠিন হোক, এই পরিবারের ভালোবাসা আর বন্ধনই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সে আর হেরে যাবে না, হেরে যেতে সে দেবে না তার পরিবারকেও।
বস্তির সরু গলি দিয়ে আবার শহরের কোলাহল ভেসে আসতে শুরু করলো। ইটের ভাঁটার ধোঁয়া, দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্ন আর মানুষের কর্মচাঞ্চল্য বুঝিয়ে দিচ্ছিলো—আরেকটা নতুন দিন শুরু হয়ে গেছে। রামপদ মানসী আর অর্কের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, কিন্তু সেই দীর্ঘশ্বাসে কোনো হতাশা ছিলো না, ছিলো বেঁচে থাকার অদম্য বিশ্বাস আর এগিয়ে যাওয়ার নতুন সংকল্প।
জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে এমন এক প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে চারপাশের সব পথ বন্ধ বলে মনে হয়। কিন্তু অন্তরের টান, পরম সহানুভূতি আর পরিবারের ঐক্য থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিই মোকাবিলা করা সম্ভব। রামপদ ও মানসীর দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের এই ছোট গল্পটি প্রমাণ করে যে, জীবনের আসল সম্পদ অর্থ বা প্রাচুর্য নয়; বরং বিপদের দিনে একে অপরের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসাই হলো বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














