পারিবারিক কলহের বলি: মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ড , ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

মন্তব্য প্রতিবেদন : বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা

ক্ষুদীরাম দাস

গতকাল সংবাদটি পড়ে গা শিউরে উঠলো। পারিবারিক সহিংসতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এখন এসব ঘটনা যেন স্বাভাবিক পযায়ে চলে গেছে। একটা ঘটনায় মানুষ হতবাক হওয়ার পর পরই অন্য আরেকটি ঘটনা জীবনে এসে হাজির হয়। আর তখন আগের ঘটনা মন থেকে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু মানুষের মানসিক যাতনার শেষ হয় না। বলছিলাম, প্রিয় সময়ে প্রকাশিত ‘কুমিল্লায় মা-মেয়েকে হত্যার অভিযোগ, ছেলে-পুত্রবধূ আটক’ শিরোনামে সংবাদটির কথা!

কুমিল্লার সদর দক্ষিণে মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং সমাজের পারিবারিক সম্পর্কের অবক্ষয় এবং সম্পত্তির লোভে মানুষের মানবিকতা হারানোর এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। ৩১ আগস্ট কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের রামনগর গ্রামে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত হয়েছেন সত্তোর্ধ্ব লুৎফা বেগম এবং তার মেয়ে আয়েশা আক্তার শিল্পী। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ আটক করেছে লুৎফা বেগমের ছেলে শাহিন আলম ও তার স্ত্রী লাকি আক্তারকে। এ হত্যাকাণ্ড এক গভীর সামাজিক প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে- সম্পত্তির লোভ কি এতটাই শক্তিশালী যে তা রক্তের সম্পর্ককেও ছিন্ন করতে পারে?

পুলিশ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও নির্যাতনের পরিণতি। সংবাদটি পড়ে জানা যায়, নিহত লুৎফা বেগম এবং তার মেয়ে শিল্পী অভিযুক্ত শাহিন ও তার স্ত্রীর সঙ্গে একই ঘরে থাকতেন। মা ও ছেলের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে মতবিরোধ ছিলো, যা’ প্রায়শই সহিংস রূপ নিত। শাহিন ও তার স্ত্রী প্রকাশ্যে লুৎফা বেগম ও শিল্পীকে মারধর করতেন। স্থানীয়রা এ বিষয়ে অবগত থাকলেও শাহিনের স্ত্রী লাকির ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি, যা’ সমাজের নীরবতার এক বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরে। প্রতিবেশীদের এমন নিষ্ক্রিয়তা অনেক সময় অপরাধীদের আরো বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

নিহত লুৎফা বেগমের বড় মেয়ে শিউলী আক্তারের বক্তব্য থেকে ঘটনার ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট হয়। তিনি জানিয়েছেন, তার ভাই ও ভাবী দীর্ঘদিন ধরে মা ও বোনের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। শনিবারও তাদের মারধর করা হয়। শিউলী আক্তারের দৃঢ় বিশ্বাস, সম্পত্তির লোভেই তার ভাই ও তার স্ত্রী পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাÐ ঘটিয়েছে। একজন ভাই যখন সম্পত্তির জন্য নিজের মা ও বোনকে হত্যা করতে পারে, তখন এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না; বরং পুরো সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভ‚মিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ৯৯৯-এ খবর পেয়ে দ্রæত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং সন্দেহভাজনদের আটক করা একটি সঠিক পদক্ষেপ। তবে, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা এবং দোষীদের দ্রæত বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন ইপিজেড ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, প্রাথমিকভাবে নিহতদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা’ শ্বাসরোধে হত্যার সম্ভাবনাকে জোরালো করে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এ বিষয়ে আরো নিশ্চিত তথ্য দেবে।

এ ধরনের ঘটনা সমাজের প্রতিটি মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে সম্পত্তির মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি? যেখানে পারিবারিক বন্ধন এতো ঠুনকো যে সামান্য কলহের জেরে হত্যাকাÐ ঘটে যায়? এ ঘটনা শুধু একটি অপরাধের প্রতিবেদন নয়, বরং আমাদের সমাজের নৈতিক স্খলনের একটি প্রতিফলন। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। যদি স্থানীয়রা সময় মতো নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতেন, তবে হয়তো এ হত্যাকাÐ এড়ানো যেত। এ ঘটনায় নিহত মা ও মেয়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবারিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্মান ফিরিয়ে আনতে না পারলে, ভবিষ্যতে আরো অনেক লুৎফা বেগম এবং শিল্পীর জীবন এভাবেই ঝরে যাবে। এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে এটি প্রমাণ করতে হবে যে, আইনের চোখে অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে।

উপরোক্ত ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সম্পত্তির লোভে মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ সমাজকে এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যে পারিবারিক বন্ধন সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানেই এমন নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের লোভ কতোটা ভয়াবহ হতে পারে। এ ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়; বরং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নৈতিক স্খলনের এক করুণ চিত্র। আমরা আশা করি, এ হত্যাকাÐের দ্রæত ও সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং দোষীদের কঠোর বিচার নিশ্চিত করা হবে। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্যে আমাদের সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

মঙ্গলবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy