সাংবাদিকতায় শুধুই ‘নাই’ আর ‘নাই’ — রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ কি তবে শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে?

২১টি ‘নাই’-এর ভিড়ে বেঁচে থাকা এক পেশার নাম সাংবাদিকতা; ১৪ দফা দাবিতে ৭ মে ঢাকায় মহাসমাবেশ

ফিচার প্রতিবেদক :  রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। অথচ এই স্তম্ভের ইট-পাথর যারা গাঁথেন, সেই সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের হিসাব মেলাতে গেলে শুধুই ‘নাই’ আর ‘নাই’। কোনো কাঠামো নাই, সুরক্ষা নাই, বেতন নাই, পেনশন নাই, সম্মান নাই—আছে কেবল হামলা, মামলা, গ্রেফতার আর অনিশ্চয়তা।

প্রথম বুলেটিনের সম্পাদক মোঃ মোস্তফা কামালের সাম্প্রতিক একটি পোস্টে উঠে এসেছে সাংবাদিকদের জীবনের ২১টি ‘নাই’-এর তালিকা। সেই তালিকা ধরে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি—কেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ শুধুই শূন্যতার উপর দাঁড়িয়ে। আর কেন আগামী ৭ মে ঢাকায় সাংবাদিকদের ১৪ দফা দাবি আদায়ের সমাবেশে যোগ দেওয়ার ডাক এসেছে।

১. নাই-এর তালিকাটা ঠিক কেমন?
সাংবাদিকদের পেশাগত কাঠামোর দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে শূন্যতা।

১. সাংবাদিকদের তালিকা : কোনো পূর্ণাঙ্গ, হালনাগাদকৃত জাতীয় ডেটাবেজ নাই।
২. নিয়োগ নীতিমালা : গণমাধ্যমভেদে ভিন্ন নিয়ম, কোনো অভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতিমালা নাই।
৩. সুরক্ষা আইন : সাংবাদিক সুরক্ষা আইন এখনও খসড়াতেই আটকে, কার্যকর আইন নাই।
৪. নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো : ওয়েজবোর্ড থাকলেও বাস্তবায়ন নাই। বহু হাউজে ৮-১০ হাজার টাকায় কাজ চলে।
৫. ভাতা, বোনাস, পেনশন : বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব বোনাস, পেনশন—কিছুই নাই।
৬. রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি : সরকারি ফর্মে পেশা হিসেবে ‘সাংবাদিকতা’র উল্লেখ প্রায়ই নাই।
৭. বিচার : হতাহত সাংবাদিকদের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার নাই।
৮. ত্রাণ-সহায়তা : দুর্যোগে বা সংকটে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সরকারি বরাদ্দ নাই।
৯. পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি : স্কুল-কলেজের বইয়ে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা নিয়ে অধ্যায় নাই।
১০. মরণোত্তর মর্যাদা : দীর্ঘদিন পেশায় থেকেও রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মর্যাদা নাই।
১১. পরিবহন সুবিধা : সরকারি-বেসরকারি পরিবহনে ভাড়ায় কোনো ডিসকাউন্ট নাই।
১২. প্রশিক্ষণ : সকল সাংবাদিকের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নাই (হয়তো কিছু কিছু সাংবাদিককে পিআইবি, টিআইবি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে)
১৩. প্রযুক্তি সহায়তা : পেশাগত কাজে ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মোবাইল কেনায় সহায়তা নাই। অথচ জেলেদের নৌকা, কৃষকের সার-বীজ, শিক্ষকদের ল্যাপটপ দেওয়া হয়।
১৪. সামাজিক সমর্থন : হামলা-মামলার শিকার হলে এলাকার মানুষ পাশে দাঁড়ায় না।
১৫. সন্তানের শিক্ষা সহায়তা : সাংবাদিক সন্তানদের জন্য বিশেষ বৃত্তি বা কোটা নাই্
১৬. কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা : রিপোর্ট করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া নিত্যদিনের ঘটনা, কিন্তু নিরাপত্তা নাই।

২. ‘নাই’-এর ভিড়ে যা আছে: টেনশন, মামলা আর কারাবাসের সৌভাগ্য!
এই পেশায় যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করেন, তাদের প্রাপ্তির খাতায় জমা হয় শুধু মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা আর ভয়। দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখলেই হামলা, মামলা, গ্রেফতার। দ্রুত বিচার আইনে মামলা হলে জামিন মেলা ভার।

চরিত্র হননের জন্য ‘হলুদ সাংবাদিক’, ‘অপ-সাংবাদিক’ ট্যাগ তো আছেই। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ‘গরম’ করে দেওয়া হয়। অথচ সাংবাদিকরা নিজেরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সুরক্ষা পান না।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—সাংবাদিক বাদী হলে পুলিশ আসামি খুঁজে পায় না। কিন্তু সাংবাদিককে আসামি করতে দেরি হয় না। গ্রেফতারের জন্য মামলাও লাগে না অনেক সময়।

৩. অন্য পেশার সাথে তুলনা করলেই বৈষম্য স্পষ্ট
একজন জেলে মাছ ধরতে সরকারি নৌকা-ট্রলার পান। কৃষক পান ভর্তুকিতে সার-বীজ-ট্রাক্টর। শিক্ষক পান ল্যাপটপ। সরকারি কর্মচারীরা পান গৃহনির্মাণ ঋণ, গাড়ি সুবিধা, পেনশন।

অথচ একজন সাংবাদিক, যার ক্যামেরা-ল্যাপটপ-মোবাইল ছাড়া একদিনও চলে না, তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রযুক্তি সহায়তা পান না। বরং সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ক্যামেরা ভাঙলে, ল্যাপটপ ছিনতাই হলে—ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, উল্টো মামলা খাওয়ার ভয় থাকে।

৪. পাঠ্যপুস্তক থেকে রাষ্ট্রীয় ফর্ম—কোথাও নেই সাংবাদিকতা
একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছে, তা বোঝা যায় পাঠ্যপুস্তক দেখে। দুঃখজনকভাবে, স্কুল-কলেজের কোনো বইয়ে ‘গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা’ নিয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায় নাই। ফলে নতুন প্রজন্ম জানেই না—সংবাদ কী, ফ্যাক্টচেক কী, গুজব কীভাবে ঠেকাতে হয়।

আবার পাসপোর্ট, ব্যাংক, চাকরির ফর্মে পেশার ঘরে ‘কৃষক’, ‘শিক্ষক’, ‘ব্যবসায়ী’ থাকলেও অনেক সময় ‘সাংবাদিক’ অপশনটাই থাকে না। ‘অন্যান্য’ লিখে দায় সারতে হয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এই সংকট সাংবাদিকদের পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

৫. মৃত্যুর পরও মর্যাদা নাই
একজন সাংবাদিক ৩০-৪০ বছর পেশায় কাটিয়ে দিলেন। দুর্নীতি তুলে ধরলেন, মানুষের অধিকার নিয়ে লিখলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গার্ড অব অনার’ তো দূরের কথা, একটা শোকবার্তাও জোটে না অনেকের ভাগ্যে। অথচ এই পেশার ঝুঁকি একজন সৈনিকের চেয়ে কম নয়।

৬. তাহলে সাংবাদিকরা কেন এই পেশায়?
প্রশ্ন জাগে—এত ‘নাই’-এর পরও কেন মানুষ সাংবাদিকতা করে? উত্তর একটাই: দায়বদ্ধতা। সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। অনেকেই অন্য পেশায় গেলে আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। কিন্তু সংবাদপত্রকে, টেলিভিশনকে, অনলাইন পোর্টালকে তারা মিশন হিসেবে নিয়েছেন।

কিন্তু মিশন দিয়ে তো পেট চলে না। সংসার চলে না। সন্তানের স্কুলের বেতন হয় না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা যায় না। ফলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে ভয় পাচ্ছেন। আর যারা আছেন, তারাও বিকল্প খুঁজছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা গণমাধ্যম।

৭. সমাধান কোথায়? ১৪ দফা দাবি কী বলছে
এই ‘নাই’-এর সংস্কৃতি থেকে বের হতে জাতীয় গণমাধ্যম ‘প্রথম বুলেটিন’ ও অন্যান্য সংগঠন ১৪ দফা দাবি তুলেছে। আগামী ৭ মে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

1. অবিলম্বে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
2. অভিন্ন জাতীয় ওয়েজবোর্ড ঘোষণা ও শতভাগ বাস্তবায়ন
3. সকল গণমাধ্যমে নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বাধ্যতামূলক করা
4. হামলা-মামলার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন
5. ঝুঁকি ভাতা, স্বাস্থ্যবীমা ও পেনশন চালু
6. সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়ন ও ডিজিটাল ডেটাবেজ
7. সরকারি খরচে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
8. প্রযুক্তি কেনায় সহজ ঋণ ও ভর্তুকি
9. সাংবাদিক পরিবারের জন্য শিক্ষাবৃত্তি ও চিকিৎসা সহায়তা
10. পরিবহনে হাফ ভাড়া বা বিশেষ পাস
11. পাঠ্যপুস্তকে গণমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকিং অধ্যায় অন্তর্ভুক্তি
12. মৃত্যুবরণকারী সাংবাদিকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা
13. সাইবার বুলিং ও চরিত্র হননের বিরুদ্ধে সুরক্ষা
14. গণমাধ্যমকে শিল্প ঘোষণা করে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা

৮. শেষ কথা: স্তম্ভ বাঁচাতে হলে মানুষ বাঁচান
একটি দালান তখনই মজবুত হয়, যখন তার চারটি স্তম্ভই শক্ত থাকে। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ—আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ—তাদের কাঠামো আছে, বাজেট আছে, সুরক্ষা আছে। কিন্তু চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম আজ ‘নাই’-এর উপর দাঁড়িয়ে।

সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে। সংবাদ বাঁচলে গণতন্ত্র বাঁচবে। আর গণতন্ত্র বাঁচলেই রাষ্ট্র বাঁচবে। তাই ২১টি ‘নাই’-কে ‘হ্যাঁ’-তে পরিণত করার এখনই সময়।

আগামী ৭ মে’র সমাবেশ শুধু সাংবাদিকদের নয়, এটা মুক্ত সাংবাদিকতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার সমাবেশ। আপনি আসছেন তো?

তথ্যসূত্র: মোঃ মোস্তফা কামাল, সম্পাদক, প্রথম বুলেটিন ও চেয়ারম্যান, পিটিভি টেলিভিশন

বিঃদ্রঃ এই লেখার অনেক বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতই সৌন্দর্য। তবে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে একমত হওয়া জরুরি।

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy