শত কোটি টাকার মালিক হতে পারতাম, কিন্তু রবের জবাবদিহিতাই বড়” — ঋণে জর্জরিত হয়েও নীতি থেকে সরেননি সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিব

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নীতির প্রশ্নে আপস না করার কারণে আজ তিনি প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার ঋণে জর্জরিত। ব্যাংক লোন থেকে শুরু করে পরিচিত কয়েকজন ভাইয়ের কাছেও দেনা রয়েছে তার। অথচ চাইলে ‘শত কোটি টাকার মালিক’ হতে পারতেন—এমন সুযোগ বারবার এসেছিল জীবনে। কিন্তু আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় তাকে সে পথ থেকে ফিরিয়েছে।

সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসে এমনই আবেগঘন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তরুণ সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিব। তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা পেশায় নীতি-নৈতিকতা, দুর্নীতির প্রলোভন এবং একজন সংবাদকর্মীর আত্মত্যাগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

লাইভে যা বললেন মোসাদ্দেক আল আকিব

গতকাল রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে আসেন মোসাদ্দেক। প্রায় ২২ মিনিটের লাইভে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, পেশাগত সংকট এবং ঈমানের পরীক্ষার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন,
“আমি বাস্তবিক কারণে ব্যাংকের ঋণ সহ প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার মত বেশ কয়েকজন ভাইয়ের নিকট ঋণি রয়েছি। এই ঋণ থাকার কথা ছিল না। এমন বেশ কিছু অপর্চুনিটি আমার সামনে এসেছে, আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় না থাকলে আজ সেগুলো গ্রহণ করলে শত কোটি টাকার মালিক ঠিকই থাকার কথা ছিল আমার। যা আমার অনেক সিনিয়র এবং জুনিয়র সহকর্মীর জানা রয়েছে। ঋণী থাকা সত্ত্বেও আমি রবের নিকট জবাবদিহিতাকেই প্রায়োরিটি দিয়েছি। এর উত্তম পুরস্কার শুধুমাত্র আমার রবের কাছেই গচ্ছিত রয়েছে ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমার কোনোরূপ দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারেন তাহলে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আর যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় দুর্নীতির প্রমাণ না দেখাতে পারেন তাহলে তার বিচারের ভার আপনাদের উপরই রইলো। অন্ততঃ আমার একটি দুর্নীতির প্রমাণ দিন, চাঁদা তো দূরে থাক। অনেক অনেক উপঢৌকন বা গিফটে দিতে চেয়েছেন কিন্তু আল্লার ভয়ে তা নেইনি। যারা আমাকে অপবাদ দিচ্ছেন তারা কি জানেন না যে আমি কেমন মানুষ, তাই শুধুমাত্র মুখের কথা নয়, একটি প্রমাণ হাজির করুন। আমি যদি ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি করে থাকি, তাহলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আহ্বান জানাবো জেলা প্রশাসক অভিভাবক হিসেবে প্রত্যেকটা সরকারি দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করুন যে আমি কারও কাছ থেকে কোনো চাঁদাবাজি বা টাকা গ্রহণ করেছি কিনা? তাহলেই বুঝা যাবে আমি মজলুম নাকি অন্যায়কারী চাঁদাবাজ, আমি প্রশাসনের সকল প্রশাসনের কাছে দাবি করবো, আমার কোনো চাঁদাবাজির ইতিহাস থাকলে তা প্রকাশ করুন, তদন্ত করুন। যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি না করে থাকি তাহলে যারা অপবাদ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তানা হলে আমার জীবন বাজি রেখে আল্লাহর মাধ্যমে আমি এই অপমানের প্রতিকার চাইবো।”

তিনি পৌরসভার প্রশাসককে বলেন, “তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়া যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে বলবো আপনি আমাকে বসিয়ে রেখে সহকর্মীদের মাধ্যমে যে কাণ্ড ঘটালেন তা দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে। কারণ সিসি ক্যামেরাতেই তার প্রমাণ আছে, আর যদি প্রমাণ না থেকে তবে বুঝবো সিসি ক্যামেরা বন্ধ করেই আপনার নির্দেশে আমার উপর হামলা করা হয়েছে। আমার মোবাইলে কি ছিলো যে, আমার মোবাইলগুলো ভেঙ্গে ফেলতে হবে? আমি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বিচারের ভার জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে আবেদন করেছি। এই প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তথ্য জানার বিষয়ে আবেদন করেছি তার মধ্যে কি এমন সমস্যা আছে যে, সেগুলো না দিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত ও মব ক্রিয়েট করেছেন, সৎ সাহস থাকলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করুন এবং তা ওপেন করে দেখুন। কেন এই সিসি ক্যামেরার ফুটে কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না? “

লাইভ চলাকালে বেশ কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করেই তিনি ইঙ্গিত দেন, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে ‘অনৈতিক সুবিধা’, ‘নিউজ চাপা দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অফার’ এবং ‘বিশেষ মহলকে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব’ এসেছিল।

কে এই মোসাদ্দেক আল আকিব?

চাঁদপুর জেলা সদরের বাসিন্দা মোসাদ্দেক আল আকিব গত এক দশক ধরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করে ইতোমধ্যে তিনি পরিচিত মুখ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমি দখল, নদী দূষণ ও স্থানীয় সরকারের অনিয়ম নিয়ে তার একাধিক প্রতিবেদন আলোচিত হয়েছে।

সহকর্মীরা জানান, মোসাদ্দেক পেশাগত জীবনে অত্যন্ত স্পষ্টভাষী। ‘তেলবাজি’ বা ‘আপসকামী সাংবাদিকতা’র ঘোর বিরোধী তিনি। এ কারণে অনেকবার চাকরি হারানোর উপক্রম হয়েছে, বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়েছে হাউসের, তবুও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “আকিবের সামনে যে ধরনের ‘অফার’ এসেছে, তা অনেকের কল্পনার বাইরে। একটি মহল তাকে তাদের পক্ষে নিউজ করানোর জন্য ফ্ল্যাট, গাড়ি এমনকি বিদেশে সেটেল করার প্রস্তাবও দিয়েছিল। সে সব ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ সে ঋণী, কিন্তু মাথা উঁচু করে চলতে পারে।”

কেন এই ঋণ? নেপথ্যের গল্প

লাইভের পর মোসাদ্দেকের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে পারিবারিক চিকিৎসা, মামলা-মোকদ্দমা এবং পেশাগত কারণে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

১. পারিবারিক চিকিৎসা ব্যয়: গত বছর তার মায়ের জটিল অপারেশনে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়। এর বড় অংশই ধার-দেনা করে মেটাতে হয়েছে।
২. আইনি লড়াই: একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়েন। তার নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। মামলা চালাতে গিয়ে ব্যাংক থেকে লোন নিতে বাধ্য হন।
৩. চাকরিচ্যুতি ও বেতন বন্ধ: নীতিগত কারণে গত ৮ মাসে দুটি হাউস থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে দাবি সহকর্মীদের। এ সময় ফ্রিল্যান্স করে সংসার চালালেও ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

শত কোটি টাকার সুযোগ’ বলতে কী বোঝালেন?

মোসাদ্দেক লাইভে ‘অপর্চুনিটি’ শব্দটি ব্যবহার করলেও বিস্তারিত বলেননি। তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মূলত তিন ধরনের প্রলোভন তাকে দেওয়া হয়েছিল:

নিউজ বাণিজ্য : প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতির নিউজ প্রকাশ না করার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের মাসোহারা।
কর্পোরেট সুবিধা : বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানির ‘মিডিয়া কনসালট্যান্ট’ হিসেবে যোগ দেওয়া, যেখানে কাজ শুধু কোম্পানির পজিটিভ ব্র্যান্ডিং।
রাজনৈতিক আশ্রয় : স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মিডিয়া সেলের দায়িত্ব নিয়ে আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা নেওয়া।

একজন জুনিয়র রিপোর্টার জানান, “ভাইকে একবার একটি শিল্পগ্রুপ ৫০ লাখ টাকা অফার করেছিল শুধু একটা রিপোর্ট ‘ড্রপ’ করার জন্য। ভাই সরাসরি না করে দেন। বলেছিলেন, ‘এই টাকা দিয়ে কবরে শান্তি কিনতে পারব না’।”

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

মোসাদ্দেকের লাইভের পর ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। #StandWithAkib হ্যাশট্যাগে হাজার হাজার মানুষ পোস্ট করছেন।

সমর্থনকারীরা বলছেন: “এই যুগে এমন সাংবাদিক বিরল। টাকার কাছে বিক্রি না হয়ে তিনি তরুণদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলেন।”
সমালোচকদের প্রশ্ন: “আবেগ দিয়ে সাংবাদিকতা চলে না। পরিবার চালাতে না পারলে নীতি ধুয়ে পানি খাবেন?”

বিশিষ্ট কলামিস্ট ড. আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেন, “মোসাদ্দেকের ঘটনা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অন্ধকার দিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এখানে সৎ থাকা মানে অভাবের সাথে যুদ্ধ করা।”

সাংবাদিকতা পেশায় নৈতিকতার সংকট কতটা গভীর?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৭% স্থানীয় সাংবাদিক মনে করেন ‘টিকে থাকতে হলে’ কোনো না কোনোভাবে আপস করতে হয়। বিজ্ঞাপনের চাপ, মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়—এই তিনটি কারণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শফিউল ইসলাম বলেন, “মোসাদ্দেক আল আকিবের মতো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সমস্যা হলো, সৎ সাংবাদিকদের জন্য কোনো ‘সেফটি নেট’ নেই। রাষ্ট্র বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়ায় না। ফলে তারা ঋণী হয়, একঘরে হয়।”

মোসাদ্দেকের পরবর্তী পরিকল্পনা কী?

লাইভের শেষ দিকে মোসাদ্দেক জানান, তিনি হতাশ নন। ঋণ শোধ করার জন্য তিনি ছোট পরিসরে কৃষিকাজ ও অনলাইনভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা করছেন। তবে সাংবাদিকতা ছাড়বেন না।

তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, রিজিকের মালিক আল্লাহ। আজ ঋণী বলে কালও ঋণী থাকব—এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু আমি যদি হারাম পথে কোটি টাকার মালিকও হই, কবরে সেই টাকা আমার কোনো কাজে আসবে না। আমার সন্তানদের আমি হালাল উপার্জন খাওয়াতে চাই।”

তিনি আরও যোগ করেন, তার এই স্বীকারোক্তির উদ্দেশ্য ‘সিমপ্যাথি আদায়’ নয়। বরং তরুণ সাংবাদিকদের বার্তা দেওয়া—”প্রলোভন আসবেই, কিন্তু জবাবদিহিতার ভয় থাকলে আপনি টিকে যাবেন।”

সহকর্মীদের উদ্যোগ

মোসাদ্দেকের লাইভ ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকার সাংবাদিক সমাজ তার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ‘ঢাকা জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক’ ইতোমধ্যে তার আইনি লড়াই ও পারিবারিক চিকিৎসার জন্য ফান্ড সংগ্রহ শুরু করেছে।

তবে মোসাদ্দেক এই ফান্ড নিতে রাজি কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, তিনি ‘করুণা’ নয়, ‘কাজ’ চান।

মোসাদ্দেক আল আকিবের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির আর্থিক টানাপোড়েনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিবেকের আয়না। যেখানে নীতি আর পেটের ক্ষুধার লড়াই প্রতিদিন চলছে। ‘শত কোটি টাকা’র হাতছানি উপেক্ষা করে ঋণের বোঝা মাথায় নেওয়া এই সাংবাদিক প্রমাণ করলেন—কলমের কালি এখনও বিক্রি হয়ে যায়নি।

তার ভাষায়, “এর উত্তম পুরস্কার শুধুমাত্র আমার রবের কাছেই গচ্ছিত রয়েছে ইনশাআল্লাহ।” সেই পুরস্কারের অপেক্ষায় আছেন মোসাদ্দেক, আর অপেক্ষায় আছে গোটা সাংবাদিক সমাজ—এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র ও সমাজ কবে দিতে শিখবে।

প্রকাশিত : রোববার, ০৩ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy