

মূল : জন পার্কিন্স
অনুবাদ ও সম্পাদনা : জালাল কবির, টরন্টো, কানাডা
অধ্যায়-৩
ইন্দোনেশিয়া : একজন ইএইচএমের জন্য শিক্ষা

আমার নতুন পেশায় শিক্ষা নেওয়া ছাড়াও, ইন্দেনেশিয়ার উপরে লেখা বই পড়ে আমি অনেক সময় ব্যয় করেছি। “একটি দেশে যাওয়ার আগে তার সম্পর্কে তুমি যত জানবে, তোমার কাজ ততই সহজ হবে”। ক্লডিন আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল। আমি সহৃদয়ে তার কথা গ্রহন করেছিলাম।
১৪৪২ সালে যখন কলম্বাস তার জাহাজ সমুদ্রে ভাসিয়েছিল, সে চেষ্টা করেছিল ইন্দোনেশিয়া পৌছার। সে সময় এর নাম ছিল ‘মশলা-দ¦ীপ‘। পুরো উপনিবেশ-যুগ ধরে, একে একটি সম্পদ বলে বিবেচনা করা হত, যার মুল্য আমেরিকা মহাদেশের চাইতে অনেক বেশী। জাভা, তার শোভনীয় বস্ত্র, রূপকথার মশলা, এবং বিত্তবান রাজত্ব, সব মিলিয়ে সে ছিল একসাথে রতœ-মুকুট এবং স্পেনীশ, ডাচ, পর্তুগীজ এবং বৃটিশ অভিযানকারীদের সহিংস সংঘর্ষ-ভুমি। ১৭৫০ সালে হলান্ডের উত্থান হয়েছিল জয়ীর বেশে, কিন্ত যদিও জাভা তাদের নিয়ন্ত্রনে ছিল, বাকি সব বাইরের দ্বীপগুলি কাবু করতে ১৫০ বছরেরও বেশী সময় লেগেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানীদের ইন্দোনেশিয়া আগ্রাসনের সময় ডাচ-সৈন্যরা সামান্যই প্রতিরোধ করেছিল। ফলে, ইন্দানেশিয়ানরা, বিশেষ করে জাভাবাসীরা অত্যন্ত ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। জাপানীদের আত্মসমর্পনের পর, একজন ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন নেতা, সুকর্নোর, আবির্ভাব হল। তিনি ইন্দেনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনা করলেন। চার বছর ধরে চলল সংগ্রাম। ২৭শে ডিসেম্বর, ১৯৪৯ সালে যার চুড়ান্ত অবসান। হলান্ড তার পতাকা নামিয়ে ফেলে জনতার কাছে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিল। এমন একটি জনতা, যারা তিন শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে লড়াই আর প্রভুত্ব ছাড়া আর কিছুই জানত না। সুকর্নো হলেন নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
যাইহোক, ইন্দোনেশিয়াকে শাসন করা হলান্ডকে পরাজিত করার চাইতে একটি বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ। সমজাতিক তো দুরের কথা, প্রায় ১৭,৫০০ দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই দ্বীপপুঞ্জ ছিল একটি আদিবাসীতন্ত্র। বিভিন্ন সংস্কৃতি, ডজন ডজন ভাষা এবং উপভাষা, দেশজ গোষ্ঠিবৃন্দ যারা শতাব্দির পুরোনো শত্রæতায় জর্জরিত, সবাইকে নিয়ে এই সমাজ যেন এক সম্মিলিত টগবগ করে ফোটা উত্তপ্ত পানির পাত্র। সংঘর্ষ ছিল দৈনন্দিন ঘটনা এবং নিষ্ঠুর। সুকর্নো দৃঢ়ভাবে তার ক্ষমতাকে আটকে রাখলেন। ১৯৬০ সালে তিনি পার্লামেন্ট বাতিল করে দিলেন। তারপর ১৯৬৩ সালে নিজেকে ‘আজীবন-প্রেসিডেন্ট‘ বলে ঘোষনা করলেন। তিনি সারা পৃথিবীর কম্যুনিষ্ট সরকারগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা স্থাপন করলেন। বদলে তিনি তাদের কাছ থেকে পেলেন সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রসস্ত্র, প্রশিক্ষণ। সারা দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়াতে কম্যুনিজমের প্রসারের জন্য তিনি রাশিয়ান অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যবাহিনী প্রতিবেশী মালয়েশিয়াতে প্রেরণ করেছিলেন। তার চেষ্টা ছিল দুনিয়ার সব সমাজতন্ত্রী নেতাদের অনুমোদন অর্জন করা।
বিরোধী দল গঠিত হল এবং ১৯৬৫ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটল। সুকর্নো শুধুমাত্র তার জীবনসঙ্গিনীর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য প্রাণনাশ এড়াতে পেরেছিলেন। তার অনেক উচ্চ সামরিক অফিসার এবং ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা ছিলেন কম ভাগ্যবান। ঘটনাটি ১৯৫৩ সালে ইরানে যা ঘটেছিল, তার সাথে মিলে যায়। অবশেষে, কম্যুনিষ্ট পার্টিকে দায়ী করা হল। বিশেষ করে সেই সব অঙ্গদল যারা চীনের সাথে মিত্রতাবন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এরপরে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে সংগঠিত গণহত্যায়, আনুমানিক তিনশ হাজার থেকে পাঁচশ হাজার ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল সুহার্তো ১৯৬৮ সালে ইন্দোনেশীয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করলেন।
১৯৭১ সালে, আমেরিকার দৃঢ়সংকল্প- ইন্দোনেশিয়াকে প্রলোভনের মাধ্যমে কম্যুনিজম থেকে দুরে সরিয়ে আনার বিষয়টি বিরাট একটি কৃতিত্ব হিসেবে দেখানো হয়েছে। কারন তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিনতি অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে দেখা দিয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে প্রেসিডেন্ট নিক্সন একের পর এক সৈন্যদল সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু করেছেন। ঐ সময় আমেরিকার পরিচালনা-কৌশল বেশি করে বৈশ্বিক অবস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। কৌশলটি হল, একের পর এক সরকারের পতন ও সেখানে কম্যুনিজম-শাসনের আগ্রাসন রোধ করা। ডোমিনো-প্রতিক্রিয়ার পদ্ধতিতে অনেকগুলি দেশের প্রতি নজর দেয়া হল- ইন্দোনেশিয়া হল চাবিকাঠি। ‘মাইনের’ বিদ্যুতায়ন-প্রকল্প ছিল একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ, যা দক্ষিণপুর্ব এশিয়াতে আমেরিকার প্রভুত্ব নিশ্চিত করবে।
আমেরিকার বৈদেশিক নীতির ভিত্তি হল, সুহার্তো এমনভাবে ওয়াশিংটনের দাসত্ব করবে, ঠিক যেভাবে ইরানের শাহ করে থাকে। আমেরিকা আরও আশা করে, এ দেশটি এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলির আদর্শ হিসেবে কাজ করবে। ওয়াশিংটনে তৈরি করা এই কৌশলের একটি অংশের অবলম্বন হল, ইন্দেনেশিয়াতে যা লাভ হবে, তা হয়ত সারা ইসলামিক বিশ্বে প্রতিধ্বনির সঞ্চার করবে। বিশেষ করে বিষ্ফোরক মধ্যপ্রাচ্যে এবং এটা যদি যথেষ্ট প্রেরণা না হয়, তবে তো ইন্দেনেশিয়ার তেল আছে। এর গোটা সঞ্চয়ের পরিমান এবং গুণাগুণ নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। কিন্ত তেল কোম্পানীর ভুমিকম্প-বিশেষজ্ঞরা এর সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছসিত।
বিপির লাইব্রেরিতে আমি যখন অনন্যচিত্তে বই পড়ায় ব্যস্ত, আমার উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। আমি আসন্ন অভিযান নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। মাইনের জন্য কাজ করার সময় শান্তিবাহিনীর অমার্জিত ও জীর্ণ জীবনযাত্রার বদলে আমার জীবন অনেক বেশি বিলাসী এবং মোহিনী হবে। ক্লডিনের সাথে আমি যে সময়টা কাটিয়েছি তার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই আমার অন্যতম একটি অলীক কল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। এটি সত্যের চাইতেও অনেক বেশি উত্তম। আমি ভাবলাম, আংশিক হলেও আমার সেই পুরোপুরি বালকদের প্রিপারেটরি স্কুলে জেল খাটার যথার্থতা প্রমান হয়েছে।
আরও একটা কিছু আমার জীবনে ঘটছিল। এ্যান এবং আমি ভালোমত এক অপরের সাথে চলতে পারছি না। আমার মনে হয় সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে, আমি একসাথে একটি দ্বৈত-জীবন যাপন করছি। আমি আমার আচরনকে ন্যায়সংগত বলে ভেবেছি। আমাদের মেলামেশার প্রথম দিকেই জোর করে আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য করার জন্য আমি তার প্রতি যে বিরূপ হয়েছিলাম, এটি তারই একটি যৌক্তিক পরিনতি। এটাও সত্য, সে ইকুয়েডরে শান্তিবাহিনীর চাকরির সময় আমাকে প্রতিপালন করেছে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুরোপুরি সমর্থন দিয়েছে। আমার বাবা-মার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করার আমার (একদা) যে আদর্শ ছিল, আমি এখনও তাকে সেটার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখি। আবশ্য আমি যখন ফিরে তাকাই, আমি নিশ্চিত, ক্লডিনের সাথে আমার সম্পর্কটি একটি প্রধান ঘটনা ছিল। আমি এ্যানকে এ বিষয়ে বলতে পারিনি। কিন্ত সে ঠিকই আন্দাজ করেছে। যাই হোক, আমরা আলাদা আলাদা এপার্টমেন্টে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
১৯৭১ সালে একদিন আমার ইন্দোনেশিয়া যাবার প্রায় এক সপ্তাহ আগে, আমি ক্লডিনের এপার্টমেন্টে গেলাম। ছোট একটি খাবার টেবিলে নানা ধরনের পনীর এবং রুটির সমাবেশ। একটি খাঁটি বোর্দো মদের বোতলও ছিল। সে আমার সুস্বাস্থ্য কামনা করল। “তুমি কৃতকার্য।” মুখে স্মিত হাসি। তবে কেন জানি মনে হল, তা কিছুটা কৃত্রিম। “তুমি এখন আমাদের একজন”। আমরা আধঘন্টা হালকা কথাবার্তা বললাম। তারপর বোতলের শেষ মদ পান করার সময়, সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যা এর আগে আমি কখনও দেখিনি। “কাউকে কোনো সময়েই আমাদের দেখাসাক্ষাতের কথা বলবে না,” দৃঢ়কন্ঠে সে বলল। “যদি কখন বল, আমি তোমাকে ক্ষমা করব না এবং আমিও স্বীকার করব না যে আমাদের আদৌ দেখা হয়েছে।” সে আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। সম্ভবত এই একটি মাত্র মুহূর্তে আমার মনে হল, সে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। তারপর সে একটা শীতল হাসি হাসল। “আমাদের নিয়ে কথা বললে, তোমার জীবন বিপন্ন হবে”।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ভীষন ভয় পেলাম। কিন্ত পরে, যখন আমি একা হেঁটে প্রæডেন্সিয়াল সেন্টারে এলাম, আমি পুরো পরিকল্পনাটিকে প্রশংসা না করে পারলাম না। সত্য হল, একসাথে আমাদের সমস্ত সময় তার এপার্টমেন্টে কেটেছে। কোথাও আমাদের সম্পর্কের কোনো চিহ্ন নেই, প্রমান নেই। মাইনের কেউ এর মধ্যে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। আমার মধ্যে একটি অংশ তার সততায় মুগ্ধ। সে আমাকে কোনো প্রতারণা করেনি, যেমন আমার সাথে বাবা মা টিল্টন এবং মিডলবারী নিয়ে করেছে। (চলবে)
শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫















