সম্পত্তির লোভে এক কিশোরীর জীবন ধ্বংস : আমাদের সমাজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

সম্পাদকীয়:

প্রিয় সময়ে ‘ সুন্দরগঞ্জে স্কুলছাত্রীকে পরিকল্পিত অপহরণ, অতঃপর পৈশাচিক’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের বিস্মিত করেছে। করেছে হতবাক ও নীরবে ঝরেছে চোখের জল। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে যা’ ঘটলো, তা’ কেবল একটা অপহরণের ঘটনা নয়; এটা আমাদের সমাজের সবচেয়ে কালো, সবচেয়ে পচা অংশটার নগ্ন রূপ। মাত্র ১৩ বছরের একটা মেধাবী স্কুলছাত্রীকে ৬ মাস একুশ দিন ধরে বন্দি করে রাখা হলো শুধুমাত্র এ কারণে যে, তার নামে কিছু জমিজমা আছে। চাচা-চাচী, ফুফা-ফুফাতো ভাই, জ্যাঠা-জ্যাঠাতো ভাই-যাদের কাছে সে নিরাপত্তা আশা করার কথা, তারাই মিলে পরিকল্পনা করলো তার জীবন শেষ করে দেয়ার। এর চেয়ে লজ্জাজনক, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কী হতে পারে?

অপহরণের পর যা’ করা হলো, তা’ পৈশাচিক শব্দটাকেও ম্লান করে দেয়। মেয়েটাকে বারবার ধর্ষণ করা হলো, গর্ভবতী করা হলো, ভয় দেখিয়ে জোর করে কাগজে সই করানো হলো, ভুয়া ভিডিও বানিয়ে তাকে দিয়েই বলানো হলো “আমি নিজেই গিয়েছি”। আর সবচেয়ে মর্মান্তিক-এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছে তার নিজের রক্তের আত্মীয়রাই। যে চাচা তাকে কোলে নিয়ে বড় করেছে বলে দাবি করে, সেই চাচাই তার সম্পত্তির জন্যে তাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হলো। এটা কেবল অপরাধ নয়, এটা বিশ্বাসের, আত্মীয়তার, মানবতার চরম অপমান।

আমরা প্রায়ই বলি “সমাজ ভেঙে পড়ছে”। কিন্তু সুন্দরগঞ্জের এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে-সমাজ ভাঙেনি; বরং তার অনেকাংশই আগে থেকেই পচে গেছে। যেখানে একটা মেয়ের শ্লীলতাহানি করা হচ্ছে শুধু কয়েক বিঘা জমির জন্যে, সেখানে মানুষের আর মানুষ বলে কিছু থাকে না। সেখানে থাকে কেবল লোভ, কেবল পাশবিকতা। পুলিশ অবশেষে মেয়েটাকে উদ্ধার করেছে-এটা স্বস্তির। কিন্তু এরপর কী?

অপহরণকারী চক্র এখনো হুমকি দিচ্ছে, মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, ষড়যন্ত্র করছে। মেয়েটা এখনো নিরাপত্তার অভাবে ভয়ে ভয়ে আছে। তার গর্ভে যে সন্তান, সে সন্তানের ভবিষ্যৎ কী? তার লেখাপড়া, তার স্বপ্ন – সবই তো শেষ করে দেয়া হলো। প্রশ্ন হলো, এ মেয়েটার জীবন ফিরিয়ে দেবে কে? আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই-এ মামলার দ্রæত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার হোক, অপহৃতা ও তার পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, অপরাধীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি হোক।

এ তেরো বছরের মেয়েটা বলেছে, “আমি লেখাপড়া করে মানুষের সেবা করতে চেয়েছিলাম।” তার সেই স্বপ্ন আর ফিরবে না হয়তো। কিন্তু অন্তত আমরা এতোটা করতে পারি-তার জীবন যারা নষ্ট করেছে, তাদের যেন আর কোনোদিন মুখ দেখাতে না হয় এ সমাজে-এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তো আশা করতেই পারি।

০২ ডিসেম্বর ২০২৫

You might like