৯০ বছরের অঙ্ক ৮৮ ঘণ্টায় কাত AI-এর কাছে, তবু চিন্তায় গণিত দুনিয়া!

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

৯০ বছরের কঠিন অঙ্কে AI-এর সাফল্যের দাবি! মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এই সমাধান করে তাক লাগিয়েছে OpenAI-এর একটি নতুন মডেল। কিন্তু গবেষকদের কপালে কেন চিন্তার ভাঁজ?

একটি জটিল অঙ্ক। যার হিসেব মেলাতে গিয়ে প্রায় ৯০ বছর ধরে মাথার চুল ছিঁড়ছেন বিশ্বের তাবড় গণিতবিদ। হাভার্ড থেকে অক্সফোর্ড সর্বত্র চলেছে এর সমাধানের চেষ্টা। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স। এমনকী সারা বিশ্বের গণিতবিদদের কাছে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ ডলারের ‘Millennium Prize’। কিন্ত তাতেও মেলেনি চূড়ান্ত সমাধান। এই জটিল সমীকরণটি হলো ‘Navier–Stokes existence and smoothness problem’।

কী করেছে OpenAI?

কিন্তু এ বার এই জটিল অঙ্কের সমাধান তুড়ি মেরে বের করে ফেলেছে AI। OpenAI-এর একটি নতুন মডেল মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় ৯০ বছরের পুরোনো জটিল অঙ্কের সমাধান করেছে বলে দাবি করা হয়েছে সংস্থার তরফে। কোন মডেল, তা এখনও OpenAI-এর তরফে জানানো না হলেও সংস্থার GPT-6 Astra এই অঙ্কের সমাধান করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

OpenAI আরও জানিয়েছে, তাদের এই AI সিস্টেম মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করেছে এই জটিল ‘Navier–Stokes’ সমীকরণ। ২০০০ সালে ‘Clay Mathematics Institute’ বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন গণিতের সাতটি সমস্যাকে ‘Millennium Prize Problems’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। আর তার মধ্যেই অন্যতম হলো এই ‘Navier–Stokes’ সমীকরণ। শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরষ্কার প্রাপ্ত লেডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রজতশুভ্র হাজরা এই বলেন, ‘এই সমীকরণ শুধু গণিত নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক’।

তবে কেন AI-এর এই কর্মকাণ্ড নিয়ে এত হইচই, তা বোঝার আগে সহজ করে বুঝে নিতে হবে কী এই ‘Navier–Stokes’ সমীকরণ?

জল কী ভাবে প্রবাহিত হয়, বাতাস কী ভাবে চলে, নদীর স্রোত কী ভাবে বদলায়, পাইপের মধ্যে তরল কী ভাবে এগিয়ে যায় — অর্থাৎ তরল যে ভাবে কোনও একটি সরলরেখার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেই ধরন বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘Navier–Stokes equations’ ব্যবহার করেন। যেখানে তরলের গতি নির্ভর করে চাপ, ঘর্ষণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের উপর। আর এখানেই একটি সমীকরণ রয়েছে যা বোঝায়, কী ভাবে একটি ফ্লুইড কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ের মধ্যে এমন অবস্থায় পৌঁছতে পারে, যেখানে তরলের গতিবেগ গাণিতিক ভাবে অসীম অর্থাৎ ইনফিনিটি হয়।

কেন এই সমীকরণ এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই সমীকরণের মাধ্যমে আবহাওয়া, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রবাহ এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন সমস্যার মডেল তৈরি করা হয়। কিন্তু এই (থ্রি ডাইমেনসন) সমীকরণ সবসময় নির্ভুল ভাবে কাজ করে কি না, সেটি বোঝাই বড় প্রশ্ন।

আর এখানেই OpenAI-এর প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, তাদের সিস্টেম দেখিয়েছে কোন পদ্ধতিতে একটি তরলের গতিবেগ গাণিতিক ভাবে ইনফিনিটি হয়। তবে বিষয়টি এখনও গণিতবিদরা যাচাই করেনি। তাই এটি একেবারেই নির্ভুল, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

সংস্থার দাবি, ‘Navier–Stokes’ সমস্যা নিয়ে কাজ করেছে প্রায় ১০,০০০ AI এজেন্ট। প্রায় ৮৮ ঘণ্টা একটানা কাজের পরে গত ৫ সেপ্টেম্বর এই সমীকরণের সমাধান দেয় AI।

তাহলে কি ১০ লক্ষ ডলারের পুরস্কার পেয়ে গেল OpenAI?

না, সেটা নয়। আর এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। OpenAI জানিয়েছে, তারা এই সমাধান প্রাইজ়মানি জেতার জন্য করেনি। বরং তাদের AI প্ল্যাটফর্ম কতটা উন্নত এবং গবেষণার ক্ষেত্রে AI-এর কার্যকারিতা কতটা নির্ভুল হতে পারে, তা বোঝার জন্য এই প্রয়াস। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ইন্টেলিজেন্সকেও হার মানিয়েছে বলে দাবি OpenAI-এর। তবে এখানে ‘Lean’ প্রমাণ করাও একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

Lean কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

OpenAI জানিয়েছে, তাদের প্রমাণের একটি অংশ ‘Lean’ নামের প্রোগ্রামিং ভাষায় ‘formalize’ করা হয়েছে।

‘Lean’ হলো এমন একটি প্রোগামিং ল্যাঙ্গুয়েজ, যার সাহায্যে গাণিতিক প্রমাণকে কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। প্রমাণের নির্দিষ্ট ধাপগুলি সঠিক ভাবে লেখা থাকলে কম্পিউটার তা যাচাই করতে পারে।

তবে কোনও প্রমাণ Lean-এ লেখা বা যাচাই করা হয়েছে বলেই পুরো গবেষণাটি সত্যি প্রমাণিত হয়ে যায় না। সমস্যার সঠিক ব্যাখ্যা, প্রমাণের অর্থ, আদৌ কোনও নতুনত্ব রয়েছে কি না সেই গবেষণায়, সবটা দেখা হয়।

গণিতবিদদের মধ্যে কেন আলোচনা শুরু হয়েছে?

আর AI-এর এই দাবি নিয়ে গাণিতিক মহলে খুশির বদলে বরং উল্টোই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিশ্বের নামি গণিতজ্ঞদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। কারণ, AI যদি সত্যিই এমন কঠিন গাণিতিক সমস্যাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাধান করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে গবেষণার ধরন বদলে যেতে পারে।

আর এখানেই গণিতবিদদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠেছে। AI-এর তৈরি প্রমাণ মানুষ কতটা সহজে বুঝতে পারবে? একটি সমাধান পাওয়া এবং সেই সমাধানের পিছনে থাকা যুক্তি বোঝা—দুইয়ের মধ্যে কতটা পার্থক্য রয়েছে? AI যে সমাধান করছে, তা কি আদৌ যথাযথ বুঝে করা হয়েছে? নাকি পুরোটাই প্রোগামিংয়ের খেলা?

কী জানিয়েছেন গণিতবিদরা?

UCLA (University of California, Los Angeles)-এর গণিতবিদ ফিল্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত Terence Tao-ও, এ ধরনের AI প্রযুক্তি ব্যবহারে পড়াশোনা, গবেষণা বোঝার গুরুত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য কোনও সমস্যার সমাধান করার সময়ে যে পদ্ধতিতে তা করা হয়, তা এক ধরনের অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। AI কি সেটা দিতে পারছে? তাহলে কোথায় যাচ্ছে সেই ‘লার্নিং এক্সপিরিয়েন্স’?

এ ব্যাপারে খুব সহজে তিনি বুঝিয়েছেন, এটি খানিকটা যেন ডাইনিং টেবিলে কাঁচা মাংস প্লেটে সাজিয়ে রাখার মতো। তাতে কী মশলা দেওয়া হবে, কী ভাবে পরিবেশিত হবে, তা AI জানে না।

অন্যদিকে, American Mathematical Society, OpenAI-এর এই সমাধান করাকে বেশ পজেটিভ ভাবেই দেখছে।

কেন উদ্বেগ?

বিশ্বে এই নিয়ে একটা শোরগোল পড়ে গিয়েছে। অধ্যাপক রজতশুভ্র হাজরা এই জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রমাণটি যাচাই করা। AI-এর ক্ষমতা যতই বাড়ুক, গণিতের চূড়ান্ত স্বীকৃতির জন্য সঠিক যুক্তি, প্রমাণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা এখনও অপরিহার্য।

রজতশুভ্র বলেন, ‘AI দিয়ে সমাধান করা অঙ্ক যতই Lean সফ্টওয়্যারে ভেরিফাই করা হোক, সেটি ঠিক কী ভাবে হচ্ছে, তার বিশ্লেষণই বা কী এবং ভবিষ্যতে এটি কী ভাবে গবেষণার ক্ষেত্রে অ্যাপ্লাই করা হবে, তার তেমন কোনও সঠিক কোনও ব্যাখা পাওয়া যায়নি। AI খানিকটা অটোমেটিক ভাবে কাজ করছে। তা দ্রুত হলেও নির্ভুল হতে পারে না। পাশাপাশি সেটা খুবই যান্ত্রিক। সেখানে কোনও মোটিভেশন নেই, যা থেকে পরবর্তীতে তা ব্যবহার করা যেতে পারে।’

চাকরি যাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে ভয়?

এ বিষয়ে রজতশুভ্র বলেন, ‘এ ভাবে AI ব্যবহার করে একদিনে ২০টি গবেষণাপত্রও লেখা যেতে পারে। তবে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য যে পরিমাণ পরিকাঠামো বা হিউম্যান পাওয়ার প্রয়োজন, তা ভারত-সহ বিশ্বের সব দেশেই কম রয়েছে। আর ভারতের মতো দেশে এগুলি পরিচালানোর জন্য যে কঠোর নিয়ম দরকার, তারও যথেষ্ট অভাব। তাই অনিয়ন্ত্রিত ভাবে AI-এর ব্যবহার ভবিষ্যতে ফল হতে পারে ভয়ঙ্কর’।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরির ক্ষেত্রে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য এখনও অ্যাকাডেমিক পাবলিকেশন দরকার। সেক্ষেত্রে AI জেনারেটেড পেপার হলে তার স্বীকৃতি কতটা হবে, বা কারা তা যাচাই করবেন, কারাই বা চাকরি পাবেন, সে নিয়ে ভবিষ্যতে একটা সঙ্কট শীঘ্রই আসতে চলেছে’।

সমাধান কোথায়?

যে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে AI হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে চলেছে, তাতে এর সমাধান কোথায়? এই উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখন AI-এর অপব্যবহার করা খুবই সহজ। কিন্তু AI মানুষের জায়গা নেবে, তা প্রায় অসম্ভব। এটা খানিকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো। পুরোপুরি নির্ভুল তা কখনই বলা যায় না’।

তবে AI-এর এই ব্যবহারে ‘হিউম্যান ইন্টারভেনশন’রাখতেই হবে। পুরো সিস্টেমকে কখনওই অটোমেটেড করা যাবে না। পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রে হোক, বা যে কোনও পরিসরে হোক, সেখানে কঠোর নিয়মাবলি আনতে হবে এগুলির অপব্যবহার রুখতে। তবেই হয়তো মানুষের ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে AI-এর যান্ত্রির মেধার এক সঠিক সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। (সূত্র : এই সময় অনলাইন)

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি. শুক্রবার

You might like

About the Author: priyoshomoy