গুগল থেকে মাইক্রোসফটে নীলফামারীর সোহান: চাঁদপুরের তরুণরাও কি পারবে আইটি বিশ্ব জয় করতে?

সাব-হেডলাইন: প্রত্যন্ত ডোমার থেকে রেডমন্ডের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার গল্প এবং চাঁদপুরের আইটি শিক্ষার্থীদের জন্য রোডম্যাপ

মিজানুর রহমান রানা :

বাংলাদেশের মানচিত্রে নীলফামারীর ডোমার একটি ছোট্ট উপজেলা শহর। আর বিশ্বের মানচিত্রে মাইক্রোসফটের হেডকোয়ার্টার রেডমন্ড এক বিশাল সাম্রাজ্য। এই দুই প্রান্তের দূরত্ব প্রায় বারো হাজার কিলোমিটার। কিন্তু সেই দূরত্বকে কোড, অধ্যবসায় আর স্বপ্ন দিয়ে জয় করেছেন ডোমারেরই এক ছেলে – আল নাসিরুল্লাহ সিদ্দিকী সোহান।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন গুগলে টানা ৩ বছর ৯ মাস সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার তিনি যোগ দিয়েছেন বিশ্বের আরেক প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। আজ বুধবার, ২৬ আগস্ট সকালে নিজের ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমি মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

একটি স্ট্যাটাস, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে ১৪ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। আর এই গল্পটাই এখন চাঁদপুরের হাজারো আইটি শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। প্রশ্ন হলো – চাঁদপুরের ছেলেরাও কি হতে পারে সোহানের মতো?

যে পথে হেঁটেছেন সোহান
সোহান ডোমার পৌর শহরের পল্টনপাড়া এলাকার সাবেক ভূমি কর্মকর্তা হামিদার রহমান ও গৃহিণী উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা দম্পতির ছোট ছেলে। অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। কোনো টেক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ছিল না কোনো মামা-চাচার রেফারেন্স।

তার শিক্ষাজীবন শুরু ডোমার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। ২০১১ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর রংপুর সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি। দুটোতেই অসাধারণ ফলাফল। কিন্তু আসল টার্নিং পয়েন্ট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগে চান্স পাওয়া। ২০১৮ সালে সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেই অনেকের মতো তিনি বিদেশে যাওয়ার জন্য হা-হুতাশ করেননি। বরং দেশের মাটিতেই নিজেকে তৈরি করেছেন। প্রথমে দেশীয় সফটওয়্যার কোম্পানি ‘অরবিটেকস’-এ ১১ মাস এবং পরে ‘স্যামসাং বাংলাদেশ আরঅ্যান্ডডি’-তে প্রায় এক বছর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। এই দুটি চাকরিই তাকে ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড কোডিং, টিম ওয়ার্ক এবং প্রোডাকশন লেভেলের কাজ শিখিয়েছে।

২০২০ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে পাড়ি জমান। ভর্তি হন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ডর্টমুন্ড-এ, ডেটা সায়েন্সে স্নাতকোত্তরে। জার্মানিতে পড়া অবস্থাতেই তিনি গুগলের গ্লোবাল হায়ারিং প্রসেসে আবেদন করেন। গুগলের ইন্টারভিউ মানেই ৫ থেকে ৭ ধাপের কঠিন ডেটা স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম, সিস্টেম ডিজাইন এবং বিহেভিওরাল রাউন্ড। সব ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি পোল্যান্ডের ওয়ারশতে অবস্থিত গুগলের অফিসে ‘সাইট রিলায়েবিলিটি ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে যোগ দেন।

গুগলে প্রায় চার বছরের কাছাকাছি সময়ে তিনি কাজ করেছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ব্যবহার করা সার্ভিসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। আর সেখান থেকেই সরাসরি অফার পান মাইক্রোসফটে।

এই পুরো যাত্রায় তার বড় ভাই শাহেদ শাহরিয়ারের ভূমিকা ছিল অসামান্য। শাহেদ নিজেও বর্তমানে গুগলের আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন অফিসে কর্মরত। সোহান নিজেই বলেছেন, ভাইয়ের দিকনির্দেশনাই তাকে এই পথে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। অর্থাৎ, একটি পরিবারে একটি সফল উদাহরণ কীভাবে আরেকজনকে তৈরি করে, সোহান তার প্রমাণ।

চাঁদপুরের চিত্রটা কী?
এবার আসি আমাদের চাঁদপুরে। চাঁদপুরে এখন আইটির এক নীরব বিপ্লব চলছে।

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই, আইআইটির মতো বিভাগ চালু হয়েছে। চাঁদপুর সরকারি পলিটেকনিক, পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর সরকারি কলেজের আইসিটি বিভাগ এবং বেসরকারি শতাধিক আইটি ট্রেনিং সেন্টারে প্রতিদিন হাজারো তরুণ প্রোগ্রামিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক্স, ডেটা সায়েন্স শিখছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চাঁদপুরে নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি।

কিন্তু সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো – আমরা আটকে আছি ২০ ডলারের লোগো ডিজাইন আর ৫০ ডলারের ওয়েবসাইটে। আমাদের স্বপ্নটা সোহানের মতো বড় হচ্ছে না। আমরা ভাবছি, গুগল-মাইক্রোসফট আমাদের জন্য নয়। এই ধারণাটাই ভুল।

চাঁদপুরের একজন শিক্ষার্থীর যা আছে, সোহানেরও তাই ছিল – একটি ল্যাপটপ, ইন্টারনেট এবং ইউটিউব। পার্থক্য শুধু মাইন্ডসেটে (মানসিকতায়)।

চাঁদপুরের শিক্ষার্থীরা কীভাবে সোহান হবে? – একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ
দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের তথ্যপ্রযুক্তি পাতার পাঠকদের জন্য সোহানের জীবন থেকে আমরা ৫টি বাস্তবসম্মত পাঠ তৈরি করেছি:

১. ভিত্তি মজবুত করতে হবে: মুখস্থ নয়, বুঝে পড়া
সোহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই থেকে পাস করেছেন। কিন্তু ডিগ্রিই সব নয়। তিনি ডেটা স্ট্রাকচার, অ্যালগরিদম, অপারেটিং সিস্টেম – এই কোর বিষয়গুলো গভীরভাবে শিখেছেন। চাঁদপুরের শিক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ – পাইথন বা জাভাস্ক্রিপ্ট ফ্রেমওয়ার্ক শেখার আগে C, C++ দিয়ে লজিক ক্লিয়ার করুন। LeetCode, Codeforces-এ নিয়মিত ২-৩ ঘণ্টা সমস্যা সমাধান করুন। এটাই গুগল-মাইক্রোসফটের প্রথম সিঁড়ি।

২. দেশীয় কোম্পানিতে কাজকে ছোট করে দেখবেন না
সোহান সরাসরি গুগলে যাননি। তিনি অরবিটেকস এবং স্যামসাং বাংলাদেশে কাজ করেছেন। চাঁদপুরের অনেক তরুণই ঢাকার ভালো কোম্পানিতে ৩০ হাজার টাকার চাকরিকে ছোট মনে করে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আটকে থাকেন। কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রি এক্সপেরিয়েন্সই আপনার সিভিকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যাবে।

৩. ইংরেজি এবং কমিউনিকেশন
গুগল বা মাইক্রোসফট শুধু কোড দেখে না, তারা দেখে আপনি কীভাবে ভাবেন এবং তা কীভাবে বুঝিয়ে বলেন। সোহানকে ৭টি ইন্টারভিউ রাউন্ডে নিজের চিন্তাভাবনা ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। তাই আজ থেকেই ইংরেজিতে টেক ব্লগ পড়া, ইংরেজিতে নিজের প্রজেক্ট প্রেজেন্ট করার অভ্যাস করুন।

৪. একজন মেন্টর খুঁজুন – শাহেদের মতো
সোহানের জীবনে তার বড় ভাই শাহেদ ছিলেন মেন্টর। চাঁদপুরের প্রত্যেক তরুণের একজন মেন্টর দরকার। সেটা হতে পারে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিনিয়র, হতে পারে ঢাকায় কর্মরত কোনো বড় ভাই, অথবা লিংকডইনে পরিচিত কোনো ইঞ্জিনিয়ার। লজ্জা না করে নক করুন, গাইডলাইন চান।

৫. উচ্চশিক্ষাকে সেতু হিসেবে ব্যবহার করুন
সোহান জার্মানিকে ব্যবহার করেছেন সেতু হিসেবে। ইউরোপে গিয়ে তিনি গ্লোবাল জব মার্কেটের কাছাকাছি গেছেন। চাঁদপুরের শিক্ষার্থীদের জন্য জার্মানি, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়ার মতো দেশে কম খরচে বা স্কলারশিপে ডেটা সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স একটি চমৎকার সুযোগ হতে পারে।

শেষ কথা
সোহানের গল্প কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটি একটি বাস্তব প্রমাণ যে, বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বিশ্ব জয় করা সম্ভব। নীলফামারী পারলে চাঁদপুর কেন পারবে না?

আজ ডোমারের পল্টনপাড়ায় মিষ্টি বিতরণ হচ্ছে। আমরা চাই, আগামী দুই বছর পর চাঁদপুরের বাবুরহাট, হাজীগঞ্জ, কচুয়া বা মতলবের কোনো ঘরেও এমন মিষ্টি বিতরণ হবে – কারণ সেই ঘরের ছেলেটিও মাইক্রোসফট বা গুগলে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছে।

চাঁদপুরের তরুণদের প্রতি আমাদের আহ্বান – ফেসবুকে সময় নষ্ট না করে আজই একটি গিটহাব অ্যাকাউন্ট খুলুন, লিংকডইন প্রোফাইল সাজান, আর কোড লেখা শুরু করুন। আপনার পরবর্তী লাইন কোডই হয়তো আপনাকে নিয়ে যাবে রেডমন্ডে।

কারণ, প্রযুক্তির দুনিয়ায় কোনো জেলার কোটা নেই। আছে শুধু মেধা, পরিশ্রম আর সাহসের মূল্যায়ন।

প্রকাশিত :  ‍বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy