কাঁটাতারের ওপারে

ক্ষুদীরাম দাস

এক.
দিগন্তজোড়া বিস্তীর্ণ মেঠো পথ। তার একপাশে ঘন সুপারি আর আমগাছের ছায়াঘেরা ছোট গ্রাম ‘নুরপুর’, যা বাংলাদেশের মানচিত্রে এঁকে দেয়া শেষ সীমান্ত। আর মাঝখানের খাঁকি রঙের পিলারের ওপাশে ভারতের অংশের গ্রামের নাম ‘কালাপুর’। এই দুই জনপদের মাঝে কোনো বিশাল পর্বত বা উত্তাল নদী নেই, কিন্তু যা আছে তা এক অদৃশ্য দেয়াল—উঁচু উঁচু বাঁশের স্তম্ভে বাঁধা কাঁটাতারের প্রাচীর। সূর্যাস্তের আলো যখন কাঁটাতারের তীক্স্ণ লোহার মাথায় পড়ে, তখন রক্তাভ দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রান্তরজুড়ে।

নুরপুর গ্রামের তরুণ সোলেমান কাঁটাতারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না, কিন্তু ওর চোখে এক ধরনের গভীর বিষাদ লেগে থাকে। সোলেমানের বাবা আবদুর রহমান শেখ একসময় এই দুই গাঁয়ের সীমানা অবাধে পার হতেন। তখন কাঁটাতারের এই বিভাজক ছিল না। দেশভাগের বহু বছর পর যখন পুরো সীমানাজুড়ে ওই চাবুকের মতো লোহার তারগুলো পেঁচিয়ে দেয়া হলো, তখন কেবল জমি ভাগ হয়নি, ভাগ হয়ে গিয়েছিল শত শত পরিবারের রক্ত ও মেহেরবানি।

সোলেমানের দৃষ্টি কাঁটাতারের ঠিক ওপারে একটা ছায়ানিবিড় বাঁশঝাড়ের দিকে। সেখান থেকে প্রতিদিন শেষ বিকেলে এক বৃদ্ধা এসে দাঁড়ান। জীর্ণ এক সুতি শাড়ি পরনে, চেহারায় বয়সের অজস্র বলিরেখা। উনি সোলেমানের দাদি—রাবেয়া বেগম। কালাপুর গ্রামে উনি রয়ে গেছেন সোলেমানের বড় চাচা জহিরুলের সাথে।

দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ এড়িয়ে প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্যে হলেও তারা এভাবে মুখোমুখি দাঁড়ায়। সোলেমান সীমান্তরেখার কাছাকাছি গিয়ে নীচু গলায় ডাকল, “দাদি, তুমি কেমন আছ?”

ওপার থেকে কাঁপাকাঁপা গলায় রাবেয়া বেগম উত্তর দিলেন, “আছি রে ভাই সোলেমান। তোর বাপ কেমন আছে? ওনার শরীরটা কি খুব খারাপ?”

সোলেমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আব্বা তো ভালো নেই দাদি। বিকেলের দিকে জ্বর আসে, আর কাশতে কাশতে বুকটা প্রায় ফেটে যায়। ওনার একটাই কথা—মৃত্যুর আগে কি তোমায় আর একবার চোখ মেলে দেখতে পাবেন না?”

রাবেয়া বেগম তাঁর শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছলেন। কাঁটাতারের দুই ধারে কত নীরব কান্না জমে আছে, তার হিসেব কোনো আন্তর্জাতিক মানচিত্রে থাকে না। রাবেয়া বেগম বললেন, “আমি যে কত দিন তোদের মুখ দেখি না সোলেমান! একটু কাছে থেকে তোদের মাথাটা ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আল্লাহ কি আমাদের এই দুর্ভোগ কোনো দিন শেষ করবেন না?”

সোলেমান চারপাশটা একবার দেখে নিল। বিএসএফের টহল গাড়িটা দূরে এক ধুলা উড়িয়ে চলে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশের সীমানায় বিজিবির এক জোয়ান সতর্ক নজর রাখছে। সোলেমান কাঁটাতারের এক হাত দূর থেকে বলল, “আল্লাহ ভরসা দাদি। আম্মা আজকে তোমার জন্যে পিঠা বানিয়ে পাঠাতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা তো এই তার পার করে তোমাকে দিতে পারবো না। এই কষ্টটা বড্ড বেশি যন্ত্রণা দেয়।”

রাবেয়া বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে কাঁটাতারের দিকে হাত বাড়ালেন, কিন্তু স্পর্শ করতে পারলেন না। তীব্র ধারালো লোহার কাঁটা যেন স্পষ্ট বলে দেয়—পার হওয়া নিষেধ। উনি ধীরে ধীরে বললেন, “সোলেমান, তুই তোর আব্বাকে বলিস, আমি প্রতিটা মোনাজাতে ওনার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ যেন ওনাকে সুস্থ করে দেন।”

দুই.
সোলেমান বাড়িতে ফিরে এসে দেখে আবদুর রহমান শেখ ঘরের দাওয়ায় বসা। ওনার বয়স ষাট পার হয়েছে, হাড়গিলগিলে শরীর, বুকের হাপর ওঠানামা করছে। সর্দি-কাশির সাথে এক কঠিন মরণব্যাধি যেন ওনাকে তিলে তিলে গ্রাস করছে। নুরপুর গ্রামের স্থানীয় ডাক্তার বলেছেন, শহরাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে ভালো চিকিৎসা না করালে ওনাকে বাঁচানো কঠিন। কিন্তু সংসারের যা অবস্থা, তাতে প্রতিদিনের অন্নসংস্থান করাই যেখানে সংকট, সেখানে শহরে নিয়ে চিকিৎসা করানো তো অনেক দূরের বিষয়।

বাড়ির এক কোণে রুকাইয়া উনুনে ছাই চাপা দিচ্ছিল। সোলেমানের ছোট বোন, বয়স উনিশ। রুকাইয়ার পড়ালেখার খুব শখ ছিল, কিন্তু পারিবারিক অভাব আর সীমান্তের এই অনিশ্চিত জীবনের কারণে বেশিদূর এগোনো সম্ভব হয়নি।

সোলেমান এসে দাওয়ায় বসতেই আবদুর রহমান শেখ জিজ্ঞেস করলেন, “তোর দাদিকে দেখেছিলে সোলেমান? উনি কি ভালো আছেন?”

সোলেমান আব্বার পাশে বসে আলতো করে হাত চেপে ধরে বলল, “হাঁ আব্বা, দাদি ভালো আছেন। তোমার শরীরের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। অতো চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আবদুর রহমান শেখ এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, “কী করে ঠিক হবে রে বাপ? আমার দিন তো ফুরিয়ে এলো। দাদির সাথে আমার দেখা হয়েছিল আজ থেকে বারো বছর আগে, যখন কাঁটাতারের এই বেড়া ছিল না, শুধু সীমানা পিলার ছিল। তখন অবাধে যাওয়া-আসা করা যেত। কালাপুর আর নুরপুর যেন একই গ্রামের দুটো পাড়া ছিল। আমরা একসঙ্গে ইদের নামাজ পড়তাম, শবে বরাতের রাতে মিষ্টি আর পিঠা বিলি করতাম। অথচ আজকে একটা লোহার জালে আমাদের পুরো জীবন আটকে গেছে।”

রুকাইয়া এসে পাশে দাঁড়াল। বলল, “আব্বা, তুমি অত কথা বলো না, তোমার শরীর আরো খারাপ করবে। একটু গরম পানি আর তুলসী পাতার রস খেয়ে নাও।”

সোলেমান চিন্তিত মুখে উঠে গিয়ে নিজের ঘরে গেল। ওদের এই সংসারটা বড্ড ছোট। মাত্র দুটো মাটির ঘর, মাথার ওপর পুরনো টিনের চাল। প্রতিমাসে চাল-ডালের হিসেব মিলাতে সোলেমানকে কালঘাম ফেলতে হয়। গ্রামে খেতমজুরের কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে চারজনের পেট চালানো অসম্ভব হয়ে উঠছে। তার ওপর আব্বার এই অসুখ এক চরম সংকট নিয়ে এসেছে।

সোলেমানের মা মরিয়ম বেগম রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এসে সোলেমানের পাশে বসলেন। মায়ের মুখটাও বিষাদে ছেয়ে আছে। মরিয়ম বললেন, “সোলেমান, তোর আব্বার যা অবস্থা, কালকে ওকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু হাতে তো একটা টাকাও নেই। কী করবি বল তো?”

সোলেমান বলল, “আমি জানি না আম্মা। জহিরুল চাচা যদি ওপার থেকে কিছুটা সাহায্য করতে পারতেন, তবে খুব ভালো হতো। কিন্তু টাকা তো আর কাঁটাতারের ওপর দিয়ে ছুঁড়ে মারা যায় না।”

সোলেমানের মাথায় এক চিন্তা এলো। সীমান্ত এলাকায় এক অদ্ভুত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সরাসরি যাতায়াত বন্ধ হলেও কিছু স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে গোপনে বার্তা কিংবা জরুরি প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা হয়, যদিও তা অত্যন্ত বিপদজনক। বিএসএফ আর বিজিবির কড়া নজরে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ মানেই সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে জেল কিংবা গুলি।

তিন.
কালাপুর গ্রামে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে ওপারের ছোট্ট মসজিদটি থেকে। কালাপুরের মসজিদে যখন মোয়াজ্জিন আজান দেন, সেই সুর বাতাস ভেসে নুরপুর গ্রামের লোকজনের কানেও এসে পৌঁছায়। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির কোনো পার্থক্য নেই; ফারাক শুধু দুটি দেশের পাসপোর্টের রঙে আর মাঝখানের নিষ্ঠুর লোহার তারে।

রাবেয়া বেগম লাঠি ভর দিয়ে ঘরে ফিরে এলেন। জহিরুল তখন কুপি জ্বালিয়ে ঘরের কোণে বসে ছিল। জহিরুল কালাপুর বাজারের এক চালের দোকানে দিনমজুরের কাজ করে। জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্েযর সাথে লড়াই করে।

মা ঘরে ঢুকতেই জহিরুল বলল, “মা, ছোট ভাইয়ের খবর কিছু জানলে? সোলেমান কী বলল?”

রাবেয়া বেগম আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বললেন, “রহমানের শরীর নাকি বড্ড খারাপ। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। ওনার বড্ড ইচ্ছে আমাদের দেখার। জহিরুল, কিছু কি করা যায় না রে? আমরা কি একবার গিয়ে ওনাকে দেখে আসতে পারি না?”

জহিরুল মাথা নিচু করে রইল। বলল, “মা, তুমি তো জানো সীমান্ত পার হওয়া কতটা সংকটজনক। গতমাসেও তো ওপারের একজন ভুল করে সীমানা পার হতে গিয়ে বিএসএফের হাতে ধরা পড়ল। তারপর পুলিশি ঝামেলা, জেলখাটা—কত কী! বৈধ উপায়ে ভিসা-পাসপোর্ট বানিয়ে যেতে হলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। আমাদের কাছে তো অতো টাকা নেই।”

রাবেয়া বেগম কেঁদে ফেললেন, “তাহলে কি আমার ছেলেটা চোখের সামনে শেষ হয়ে যাবে, আর আমি এই ওপারে বসে বসে শুধু খবর শুনবো? আল্লা রে! তোর দয়ায় এই পৃথিবী সৃষ্টি, অথচ মানুষের বানানো খাঁচায় আটকে আমরা মরছি।”

জহিরুল নিজের পকেট থেকে কয়েকটা দুমড়ানো-মুচরানো নোট বের করে দেখল। মাত্র কয়েকশো টাকা জমেছে। এই টাকায় নিজের সংসার চালানোই কঠিন, ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠানো তো এক অলীক স্বপ্ন। জহিরুল ভাবল, ওপার থেকে কীভাবে সাহায্য পৌঁছানো যায়? কাঁটাতারের কাছাকাছি কিছু লোক থাকে, যারা চোরাচালানের সাথে যুক্ত। কিন্তু সোলেমান আর জহিরুল কখনোই সেই বেআইনি পথে পা বাড়ায়নি। তারা সৎভাবে বাঁচতে চায়, অহংকার বা লোভ তাদের স্পর্শ করেনি। কিন্তু ভালোবাসার টানে, রক্তের টানে আজকে কি তবে নীতি শিথিল করতে হবে?

চার.
সোলেমান রাতে ঘুমোতে পারছিল না। মাটির ঘরে শুয়ে শুয়ে সে শুধু আব্বার কফ ফেলার বিষম শব্দ শুনছিল। আব্বার অবস্থা ক্রমেই আশঙ্কাজনক হচ্ছে। নুরপুরের ডাক্তার পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে ভালো কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে না নিলে পরিণতি হবে মারাত্মক।

পরদিন সকালে সোলেমান হাটে গেল। নুরপুরের হাট বসে সীমান্ত ঘেঁষে। সেখানে নানা ধরনের মানুষের সমাগম হয়। হাটের এক কোণে বিড়িতে টান দিচ্ছিল সালাম ভাই। সালাম সীমান্তে ছোটখাটো জিনিস আনা-নেয়ার কাজ করে। সীমান্ত এলাকার অনেকেই তাকে চেনে।

সোলেমান সালামের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ধীরকণ্ঠে বলল, “সালাম ভাই, আমার একটা খুব জরুরি কথা ছিল।”

সালাম চোখ তুলে তাকালো, “কী রে সোলেমান? তোকে অত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? তোর আব্বার শরীর কেমন?”

“ভালো না সালাম ভাই। আব্বাকে শহরে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমার কাছে তো পর্যাপ্ত টাকা নেই। ওপারের জহিরুল চাচা হয়তো কিছুটা টাকা দিতে চান, কিন্তু ওই টাকা এপারে আনবো কীভাবে? তুমি কি কোনো উপায় করতে পারবে?”

সালাম একগাল ধোঁয়া ছেড়ে সোলেমানের দিকে তাকালো। একটু ভেবে বলল, “দেখ সোলেমান, কাঁটাতার টপকে টাকা আদান-প্রদান করা এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ইদানীং বিএসএফ আর বিজিবি দুটো পক্ষই ভীষণ কড়া। ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সারারাত নজরদারি করে। তবে… একটা রাস্তা আছে।”

“কী রাস্তা সালাম ভাই? তুমি যা বলবে আমি করতে রাজি। আমার আব্বাকে বাঁচাতে হবে।” সোলেমানের গলায় আকুতি ঝরে পড়ল।

সালাম নীচু গলায় বলল, “আজ রাতে কালাপুর সীমান্তের কাছাকাছি জহিরুল চাচাকে আসতে বলিস। সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে এক জোড়া বড় তেঁতুল গাছ আছে, দেখেছিস তো? ওই তেঁতুল গাছের নিচে এক বিশেষ জায়গায় কোনো সীমান্তরক্ষী সহজে নজর দিতে পারে না। ওখানে যদি উনি কোনো পলিথিনে পেঁচিয়ে টাকাটা রেখে যান, তুই রাতের অন্ধকারে গিয়ে সেটা তুলে নিয়ে আসতে পারবি। কিন্তু মনে রাখিস, একটু এদিক-ওদিক হলে বিএসএফের গুলি ছুড়তে এক মুহূর্ত সময় লাগবে না।”

সোলেমানের বুকটা কেঁপে উঠল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন কাজ কি করা ঠিক হবে? কিন্তু ঘরে আব্বার মৃত্যুর সাথে লড়াই করার দৃশ্য মনে পড়তেই সোলেমানের ভেতরে ভয়ের জায়গায় এক দুর্ভেদ্য জেদ চেপে বসল। সে বলল, “ঠিক আছে সালাম ভাই। আমি চাচাকে খবর পাঠাচ্ছি।”

সোলেমান বিকেলে আবার সীমান্তে গেল। ঠিক সময়মতো রাবেয়া বেগম আর জহিরুল চাচা ওপারে এসে দাঁড়িয়েছেন। সংকেতে সংকেতে, নীচু গলায় কথা হলো। সোলেমান বিস্তারিত বলল।

জহিরুল চাচা বললেন, “সোলেমান, আমি আমার জমানো কিছু টাকা আর ঘরের একটা সোনার আংটি বিক্রি করে কিছুটা টাকা যোগাড় করেছি। তুই চিন্তা কোরো না, আজ রাত বারোটার দিকে আমি ওই তেঁতুল গাছের গোড়ায় গিয়ে পলিথিনের প্যাকেটটা ফেলে রাখবো। তুই সাবধানে নিবি।”

সোলেমান বলল, “চাচা, আপনিও সাবধানে আসবেন। কোনো আলো জ্বালবেন না। বিএসএফের টহল গাড়ি প্রতি আধঘণ্টা পর পর ওদিক দিয়ে যায়।”

পাঁচ.
রাত এগারোটা। পুরো নুরপুর গ্রাম গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেছে। আকাশ মেঘলা, তারার আলোটুকুও আজ অনুপস্থিত। হাওয়ায় এক ধরনের হিমশীতল নীরবতা। সোলেমান একটি কালো চাদর মুড়ি দিয়ে মাটির ঘর থেকে নিঃশব্দে বের হলো।

মরিয়ম বেগম আর রুকাইয়া তখন আবদুর রহমান শেখের পাশে বসে মাথায় পানি ঢালছেন। আব্বার অবস্থা আরো খারাপের দিকে। শ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। সোলেমানের মনে হলো, সে আজ কোনো অন্যায় করতে যাচ্ছে না, সে যাচ্ছে তার বাবার জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করতে।

সোলেমান মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলল। প্রতিটা পদক্ষেপে শুকনো পাতা মচমচ করে উঠতেই ও থমকে দাঁড়াচ্ছিল। নিশুতি রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সোলেমান মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়ল। কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের সার্চলাইটের তীব্র আলো ঘন ঘন শূন্যরেখা অতিক্রম করে যাচ্ছে। আলোর বৃত্তটি যখনই পার হয়ে যায়, চারপাশ আবার নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যায়।

সোলেমান হামাগুড়ি দিয়ে তেঁতুল গাছের দিকে এগোতে লাগল। হৃদপিণ্ডটা যেন বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছে। শরীরে ঠাণ্ডা ঘাম জমছে। ও জানে, সীমান্ত এলাকায় সামান্য অসাবধানতাও ডেকে আনতে পারে অকালমৃত্যু।

ঠিক এমন সময় ওপার থেকে এক হালকা ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে তেঁতুল গাছের গোড়ায় এসে দাঁড়াল। জহিরুল চাচা!

জহিরুল চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে পকেটের পলিথিনের পোটলাটি নিচু হয়ে মাটির একটি গর্তের মতো জায়গায় রেখে দিলেন। তারপর বিএসএফের সার্চলাইটের আলো আসার আগেই দ্রুত পেছনে সরে গেলেন।

সোলেমান মাটির সাথে মিশে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল। ওপার থেকে আলোটা ঘুরে আসার পর মুহূর্তের মধ্যে সোলেমান হাত বাড়িয়ে দিল। পলিথিনের প্যাকেটটি হাতে আসতেই সে শক্ত করে চেপে ধরল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই বিএসএফের একটি টহল দল ওই রুটে এসে হাজির হলো!

“কৌন হ্যায় ওহা? হ্যাল্ট!”—ওপার থেকে এক কঠোর আওয়াজ ভেসে এলো। সাথে সাথে সার্চলাইটের প্রখর আলো এসে পড়ল ঠিক সোলেমানের ওপর।

সোলেমানের বুকের ভেতর রক্ত হিম হয়ে গেল। সে কোনো কিছু না ভেবে দ্রুত উল্টো দিকে দৌড় দিতে শুরু করল।

“ঠো কো! পাকড়ো—!”

ওপার থেকে একটা গর্জন ভেসে এলো, আর সাথে সাথে একটি বন্দুকের গুলির প্রচণ্ড শব্দে রাত্রির নীরবতা চুরমার হয়ে গেল—ঠাঁই!

সোলেমান কোনোক্রমে মাটির এক নিচু নালায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। গুলিটা ওনার মাথার ঠিক উপর দিয়ে গিয়ে এক সুপারি গাছে গিয়ে লাগল। বিজিবির ক্যাম্প থেকেও বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেল। সীমান্তজুড়ে যেন এক তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল!

সোলেমান মাটির নালা ধরে কোনোমতে ঘাসে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল। হাত-পা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরা আছে ওপারের জহিরুল চাচার পাঠানো সেই ছোট পলিথিনের প্যাকেটটা। এই সামান্য কিছু টাকা আর ভালোবাসা পার হয়ে এসেছে এক রাষ্ট্রীয় সীমানা, এক নিষ্ঠুর কাঁটাতার।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর যখন গোলমাল কিছুটা থামল এবং বিএসএফের সার্চলাইটের আলো অন্যদিকে ঘুরে গেল, সোলেমান ভেজা মাটির ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের গ্রামের সীমানায় ফিরে এলো।

ছয়.
ভোরের প্রথম আলো যখন ফুটে উঠছে, সোলেমান তখন ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় নিজের ঘরে ফিরে এল। জামাকাপড় কাদা-মাটিতে মাখামাখি, কপালে কাঁটাতারের কষ লেগে কিছুটা ছড়ে যাওয়ার দাগ। কিন্তু ওনার হাত দুটো এখনো সেই পলিথিনের পোটলাটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে।

মরিয়ম বেগম আর রুকাইয়া ঘরেই কান্নাকাটি করছিলেন। সোলেমানকে অক্ষত দেখে মরিয়ম সোলেমানকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন, “সোলেমান! তুই কোথায় ছিলি রে বাপ? অত গুলির শব্দ শুনলাম, আমরা তো ভেবেছিলাম তুই…”

সোলেমান এক হালকা হাসি হেসে পোটলাটা মায়ের হাতে দিল। “আম্মা, চাচা এই টাকা পাঠিয়েছেন। দাদিও কিছু টাকা দিয়েছেন নিজের জমানো। আর একটা সোনার আংটিও আছে। আব্বাকে বাঁচাতে হবে। আমি কোনো অন্যায় করিনি আম্মা, শুধু ভালোবাসা নিয়ে এসেছি।”

আবদুর রহমান শেখ খাটে শুয়ে পিটপিট করে তাকাচ্ছিলেন। উনি সোলেমানের রক্তমাখা কপাল আর কাঁদা মাখা শার্টের দিকে তাকিয়ে দুর্বল গলায় বললেন, “সোলেমান, তুই… তুই নিজের জীবন বিপন্ন করেছিস আমার জন্য?”

সোলেমান আব্বার পাশে গিয়ে বসল। ওনার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “আব্বা, তোমার জীবনের চেয়ে এই কাঁটাতার আর সার্চলাইট বড় হতে পারে না। আমরা তো শুধু ভালো থাকতে চাই। আমরা মানুষ, আমাদের কেন এই বন্দিদশা?”

বেলা বাড়ার সাথে সাথে সোলেমান গ্রামের এক পরিচিত লোকের অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আবদুর রহমান শেখকে জেলা সদরের বড় হাসপাতালে নিয়ে গেল।

হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা জানালেন, আর কিছুটা দেরি হলে হয়তো আবদুর রহমান শেখকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে উঠত। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় উনি আস্তে আস্তে বিপদমুক্ত হতে লাগলেন। ওনার ফুসফুসের ইনফেকশন কমতে শুরু করল।

কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর আবদুর রহমান শেখ কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

সাত.
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আবদুর রহমান শেখের প্রথম দাবি ছিল—তাঁকে সীমান্তে নিয়ে যেতে হবে। তিনি তাঁর মা রাবেয়া বেগমকে দেখতে চান।

বিকেলের সোনাঝরা আলোয় আবার সেই নুরপুর আর কালাপুর গ্রামের সীমান্তে জড়ো হলো দুটি পরিবার। এবার শুধু সোলেমান আর রাবেয়া বেগম নন; একদিকে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুর রহমান শেখ, পাশে মরিয়ম বেগম ও রুকাইয়া। আর কাঁটাতারের ঠিক ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন জহিরুল চাচা, ওনার স্ত্রী এবং বার্ধক্যে ঝুঁকে পড়া দাদি রাবেয়া বেগম।

সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে আবদুর রহমান শেখ চোখ মেললেন তাঁর মায়ের দিকে। কত বছর পর দুই ভাই, মা ও ছেলের এই দেখা! মাঝখানে শুধু ওই জং ধরা লোহার কাঁটাতারের বেড়া।

রাবেয়া বেগম কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন, “রহমান! তোর শরীর এখন কেমন আছে রে বাবা?”

আবদুর রহমান শেখ চোখের পানি আটকে রাখতে পারলেন না। উনি কাঁটাতারের একদম কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন। বললেন, “মা, আমি ভালো আছি। আপনার দোয়ায় আর আমার সোলেমানের সাহসে আমি বেঁচে গেছি। মা, আমি কি আপনাকে একটু ছুঁতে পারবো না?”

জহিরুল ওপার থেকে বলল, “ভাই, আমরা হয়তো কোনো দিন এই তার পার হতে পারবো না। রাষ্ট্র আমাদের আলাদা করে দিয়েছে, কিন্তু এই ভালোবাসার বাঁধন তো কাটার ক্ষমতা কোনো কাঁটাতারের নেই।”

সোলেমান এগিয়ে গিয়ে বলল, “চাচা, ঠিক বলেছেন। রাজনীতি বা সীমান্ত আমাদের জমি ভাগ করতে পারে, কিন্তু আমাদের রক্তের সম্পর্ককে ভাগ করার শক্তি কারো নেই। কাঁটাতারের ওপারে আপনারা আছেন, এপারে আমরা। কিন্তু আমাদের হৃদয় তো একই জায়গায় স্পন্দিত হয়।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ওপার থেকে বিএসএফের এক জোয়ান আর এপার থেকে বিজিবির এক হাবিলদার টহল দিতে দিতে এগিয়ে এলেন। দুই পরিবারের এই কান্না আর আবেগ দেখে তাঁরাও যেন কিছুটা থমকে দাঁড়ালেন।

বিজিবির জোয়ানটি আলতো করে সোলেমানের কাঁধে হাত রেখে নিচু গলায় বললেন, “বেশিক্ষণ থেকো না ভাই। নিয়ম তো নিয়মই, আমরাও বাধ্য। তবে তোমাদের এই ভালোবাসা দেখে সত্যি বুকটা ভরে গেল।”

জোয়ানের এই মন্তব্যে কোনো হিংসা ছিল না, ছিল এক প্রচ্ছন্ন অনুভূতি।

রাবেয়া বেগম তাঁর আঁচল থেকে এক টুকরো শুকনো মিষ্টান্ন বের করলেন, যা উনি নিজে হাতে বানিয়েছিলেন। উনি কাঁটাতারের একদম উঁচুতে এক ফাঁকা জায়গায় সেটা রেখে বললেন, “সোলেমান, এই পিঠাটা তোর জন্য। নিয়ে নে রে বাপ।”

সোলেমান ওপরের দিকে হাত বাড়িয়ে সেই মিষ্টিটা তুলে নিল। যেন কাঁটাতার ভেঙে নেমে এল ভালোবাসার এক অমলিন ঝর্ণাধারা।

রুকাইয়া ওপার থেকে দাঁড়িয়ে থাকা তার কাজিনদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। সূর্যটা তখন কালাপুর আর নুরপুর গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে ডুবছে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম আলোর খেলা।

আবদুর রহমান শেখ মায়ের চরণ স্পর্শ করার মতো করে মাটির ওপর হাত রাখলেন। রাবেয়া বেগমও ওপার থেকে মাটিতে হাত রাখলেন। মাটি তো এক, মাটি তো দুই দেশে বিভক্ত নয়। কাঁটাতার শুধু বাতাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মাটির গভীরে দুই দেশের শিকড় যে মিলেমিশে একাকার!

সোলেমান আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালো। একঝাঁক পাখি কাঁটাতারের ওপর দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই এপার থেকে ওপারে উড়ে চলে গেল। তাদের কোনো পাসপোর্ট লাগে না, তাদের কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না, তাদের থামানোর মতো কোনো কাঁটাতার এখনো আবিষ্কার হয়নি।

সোলেমান মনে মনে ভাবল—একদিন হয়তো মানুষের মন থেকেও এই কৃত্রিম বিভেদের দেয়াল মুছে যাবে। আর যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন এই কাঁটাতারের ওপার থেকে ভালোবাসার চিঠি আর প্রার্থনা এভাবেই উঁকি দিয়ে যাবে অবিরাম।

আট.
রাত নামছে নুরপুর গ্রামে। ঘরে ঢুকে সোলেমান আব্বাকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। আবদুর রহমান শেখের মুখে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে মাকে অন্ততঃ এক পলক দেখতে পাওয়ার তৃপ্তি ওনার চোখে-মুখে স্পষ্ট।

রুকাইয়া ঘরের কোণে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল। মরিয়ম বেগম সোলেমানের মাথায় হাত রেখে বললেন, “সোলেমান, তুই আজ আমাদের পরিবারকে রক্ষা করেছিস। কিন্তু আর কখনো ওই কাঁটাতারের কাছে জীবনের ঝুঁকি নিতে যাস না বাপ।”

সোলেমান মুচকি হেসে বলল, “আম্মা, জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের রক্তের সম্পর্কটাকে ধরে রাখা। কাঁটাতার আমাদের আটকে রাখতে পারে, কিন্তু আমাদের আত্মাকে আলাদা করতে পারবে না।”

নুরপুর গ্রামের বাইরে তখন নিশুতি রাতের বাতাস বইছে। দূরে কাঁটাতারের ওপর আছড়ে পড়ছে হাওয়া। সেই হাওয়ায় কোনো সীমান্ত নেই, কোনো পাসপোর্ট নেই। ওপার থেকে ভেসে আসছে কালাপুর গ্রামের মেঠো সুবাস, আর এপার থেকে বয়ে যাচ্ছে এক নদীর চিরন্তন প্রবাহ। কাঁটাতারের ওপারে বেঁচে থাকা প্রিয় মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে নুরপুরের প্রতিটি ঘর, নতুন এক ভোরের আশায়—যে ভোরের আলো এপার আর ওপার—দুটি জগৎকেই সমভাবে আলোকিত করে তোলে।

মানুষের তৈরি সীমান্ত কেবল মানচিত্রেই আঁকা থাকে, কিন্তু হৃদয়ের সীমান্তে কোনো প্রাচীর তোলা সম্ভব নয়। নুরপুর আর কালাপুরের গল্পটি কেবল সোলেমান আর রাবেয়া বেগমের গল্প নয়; এটি কাঁটাতারের দুই ধারে বন্দি থাকা হাজারো বিচ্ছিন্নের এক চিরন্তন আত্মকথা, যেখানে প্রেম, দায়িত্ব এবং আত্মিক বন্ধন জয়ী হয় সকল বাধার ওপারে।

 

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy