

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :
চাঁদপুরের ঘাটে ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা ভেড়ে। রুপালি ইলিশের ঝলকানিতে ভরে যায় আড়ত। এই দৃশ্য শুধু চাঁদপুরের নয়, এই দৃশ্য পুরো বাংলাদেশের গর্বের। কিন্তু এই গর্ব আর সুনামকেই এখন হাতিয়ার বানিয়েছে একদল প্রতারক। তারা থাকে অন্য জেলায়, কখনো নড়াইলে, কখনো যশোরে, কখনো গাজীপুরে। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা পাতা খোলে চাঁদপুরের ইলিশের নামে। লোভনীয় ছবি, জলের দরে দাম, বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। আর এই ফাঁদে পা দিয়েই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন দেশের হাজারো সাধারণ মানুষ।

কীভাবে পাতা হয় এই ফাঁদ?
গত কয়েক মাসে চাঁদপুর জেলা পুলিশের কাছে এমন শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর চিত্র।
প্রথম ধাপে প্রতারক চক্র সামাজিক মাধ্যমে একাধিক পাতা ও ভুয়া পরিচয় তৈরি করে। নাম দেয় – চাঁদপুরের আসল ইলিশ, পদ্মার রুপালি ইলিশ ঘরে বসে, চাঁদপুর থেকে সরাসরি ইলিশ। সেই পাতায় তারা চাঁদপুরের আড়তের আসল ছবি, জেলেদের মাছ ধরার ভিডিও চুরি করে আপলোড করে।
দ্বিতীয় ধাপে তারা টাকা দিয়ে সেই বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেয়। আপনি যখন মুঠোফোনে ইলিশ লিখে খোঁজ করেন, তখনই আপনার সামনে চলে আসে তাদের বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের নিচে থাকে শত শত ভুয়া মন্তব্য। যেমন – ভাই মাছ পেয়েছি, খুব ভালো, আবার নেব। এই মন্তব্যগুলো তাদেরই লোকজন ভুয়া পরিচয় দিয়ে লিখে রাখে। সাধারণ মানুষ ভাবে, এত মানুষ যখন ভালো বলছে, তাহলে নিশ্চয়ই আসল।
তৃতীয় ধাপে আসল প্রতারণা। ক্রেতা যখন যোগাযোগ করেন, তখন বলা হয়, পদ্মার বড় ইলিশ, এক কেজি ওজনের পাঁচটি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তবে আগে অর্ধেক টাকা পাঠাতে হবে। অনেকে পুরো টাকাই অগ্রিম পাঠিয়ে দেন। কেউ কেউ কুরিয়ারের খরচসহ পাঠান। টাকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই নম্বর বন্ধ, সেই পাতা উধাও। কারো কারো ক্ষেত্রে আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। টাকা পাওয়ার পর পচা মাছ বা অন্য সস্তা মাছ পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা খাওয়ার অযোগ্য।
সম্প্রতি চাঁদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এই চক্রের নয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে সর্বশেষ তিনজনকে ধরা হয়েছে নড়াইল থেকে। তারা নড়াইলে বসেই চাঁদপুরের নামে এই কারবার চালাত। তাদের কাছ থেকে আটটি মুঠোফোন, বহু ভুয়া সিম এবং টাকা লেনদেনের হিসাব উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্র শুধু ইলিশ নয়, মধু, খেজুরের গুড়, আমসহ বিভিন্ন মৌসুমি পণ্যের নামেও একইভাবে প্রতারণা করে আসছে। এমনকি অনলাইনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়েও তারা মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
শুধু ইলিশ নয়, প্রতারণার নতুন নতুন রূপ
এই ইলিশ প্রতারণা আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র। তথ্যপ্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, প্রতারণার ধরনও তত বদলাচ্ছে।
আগে প্রতারকরা সরাসরি টাকা চাইত। এখন তারা নতুন কৌশল নিয়েছে। যেমন – ভুয়া লিংক পাঠানো। আপনাকে বলা হবে, ইলিশের অর্ডার নিশ্চিত করতে এই লিংকে ক্লিক করুন। আপনি ক্লিক করলেই আপনার মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে তাদের হাতে। আপনার বিকাশ বা নগদের গোপন নম্বর, ব্যাংকের তথ্য সব চুরি হয়ে যাবে। একে বলা হয় তথ্য চুরির ফাঁদ।
আরেকটি নতুন ফাঁদ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নকল কণ্ঠস্বর ও ভিডিও। আপনার পরিচিত কারো কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করে বলা হবে, আমি বিপদে পড়েছি, টাকা পাঠাও। অনেকেই বুঝতে না পেরে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
এছাড়া ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, লটারি জেতার মিথ্যা বার্তা, সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় গোপন করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া – এসব এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
সরকার কী করছে? আসছে বড় পরিবর্তন
এই বাড়তে থাকা অপরাধ ঠেকাতে সরকার এবার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কয়েকটি নতুন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
প্রথম এবং সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো বিশেষ তথ্যপ্রযুক্তি পুলিশ দল গঠন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছেন, শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশে এই বিশেষ দল কাজ করবে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা পর্যন্ত এর শাখা সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে চাঁদপুরে বসেও কেউ প্রতারিত হলে তাকে আর ঢাকায় দৌড়াতে হবে না। নিজ জেলাতেই অভিযোগ জানাতে পারবেন। এই দলের জন্য ইতিমধ্যে গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় উদ্যোগ হলো তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো। অপরাধীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পুলিশকেও আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এজন্য দেশজুড়ে ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষার গবেষণাগার বা ফরেনসিক ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখায় уже একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার কাজ করছে। সিআইডি জানিয়েছে, চলতি বছরেই আরও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে এই ধরনের গবেষণাগার চালু করা হবে। এখানে মুঠোফোন, কম্পিউটার থেকে মুছে ফেলা তথ্যও উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
তৃতীয় উদ্যোগ হলো প্রশিক্ষণ। তথ্যপ্রযুক্তি অপরাধ দমনে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নতুন নতুন পাঠ্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে। ফরেনসিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ে এখন নিয়মিতভাবে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাতে পুলিশ সদস্যরা হালনাগাদ কৌশল জানতে পারেন।
চতুর্থ উদ্যোগ হলো আইন সংস্কার। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পাস হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইনকে আরও যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, সামাজিক মাধ্যমে মানহানি, ভয় দেখানো, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ক্ষতিকর ছবি ও ভিডিও বানানোর মতো নতুন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, এই আইনে চারটি অপরাধকে জামিন অযোগ্য রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো – গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, কম্পিউটার ব্যবস্থার ক্ষতি সাধন, সাইবার সন্ত্রাসবাদ এবং হ্যাকিং।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের বাইরে বসে কেউ অপরাধ করলেও তাকে ধরা যায়।
সাধারণ মানুষের করণীয় – কীভাবে বাঁচবেন এই ফাঁদ থেকে?
আইন ও পুলিশ তাদের কাজ করবে, কিন্তু নিজেদের সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। মনে রাখবেন, প্রতারকরা আপনার লোভ ও সরলতাকেই পুঁজি করে। তাই কিছু বিষয় মেনে চলুন।
১. লোভনীয় দাম দেখলেই সন্দেহ করুন: পদ্মার এক কেজি ওজনের আসল ইলিশ কখনোই জলের দরে বিক্রি হয় না। যদি কেউ অর্ধেক দামে দেওয়ার কথা বলে, বুঝবেন সেখানেই ফাঁদ। আসল বিক্রেতা কখনোই অস্বাভাবিক কম দামে দেবে না।
২. অগ্রিম টাকা দেবেন না: কোনো অবস্থাতেই আগে পুরো টাকা বা অগ্রিম টাকা পাঠাবেন না। প্রয়োজনে ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, তা জিজ্ঞাসা করুন। যারা আগে টাকা চায়, তাদের এড়িয়ে চলুন।
৩. পাতার বয়স ও পরিচয় যাচাই করুন: যে পাতা থেকে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, সেই পাতাটি কবে খোলা হয়েছে দেখুন। যদি দেখেন এক মাস আগে খোলা, তাহলে সন্দেহ করুন। তাদের ঠিকানা, ফোন নম্বর, ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না, তা যাচাই করুন। প্রয়োজনে ভিডিও কলে আড়ত দেখতে চান।
৪. ভুয়া মন্তব্যে বিভ্রান্ত হবেন না: শুধু মন্তব্য দেখে বিশ্বাস করবেন না। অনেক মন্তব্যই টাকা দিয়ে লেখানো বা ভুয়া পরিচয় থেকে করা। পরিচিত ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে কিনুন। চাঁদপুরের পরিচিত আড়তদার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সরাসরি কিনলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
৫. অচেনা লিংকে ক্লিক করবেন না: কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে ভালোভাবে দেখে নিন। ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কখনোই লিংকে ক্লিক করে তথ্য দিতে বলে না। সন্দেহজনক বার্তা পেলে সঙ্গে মুছে ফেলুন।
৬. ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখুন: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, ব্যাংকের গোপন নম্বর, বিকাশের পিন নম্বর কাউকে দেবেন না।
৭. প্রতারিত হলে দ্রুত অভিযোগ জানান: যদি প্রতারিত হয়ে যান, তাহলে দেরি না করে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করুন। এছাড়া পুলিশের সাইবার সাপোর্ট উইমেন, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে পারেন। আপনার অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে লেনদেনের ছবি, কথোপকথনের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করে রাখুন।
চাঁদপুরের ইলিশ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অহংকার। এই অহংকারকে পুঁজি করে যারা প্রতারণা করছে, তারা শুধু একজন ক্রেতাকে ঠকাচ্ছে না, তারা চাঁদপুরের হাজারো সৎ ব্যবসায়ী ও জেলের রুটি-রুজিতে আঘাত করছে। তাই এই প্রতারক চক্রকে রুখতে হলে পুলিশের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। মনে রাখবেন, সস্তার লোভে পড়ে রুপালি ইলিশ কিনতে গিয়ে যেন আপনার কষ্টের টাকা রুপালি ফাঁদে আটকে না যায়। সচেতন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














