

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, প্রিয় সময় :
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা ছিল আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। সুদান কৌশল ঠিক করলেন আন্দোলনকে এমনভাবে সাজানোর, যাতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কিন্তু প্রভাবশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

নেপালের সম্প্রতিক ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক মুহূর্ত বিরল যেখাে দুদিনের মধ্যে একটি ক্ষমতাশালী সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। যে বিক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পতন হয়েছে তার নেপথ্যে ছিলেন এক তরুণ সমাজকর্মী—সুদান গুরুং। তার নেতৃত্বে ‘জেনারেশন জেড’-এর আন্দোলন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সুশাসনের অভাবের বিরুদ্ধে এক সর্বজনীন বিক্ষোভে পরিণত হয়।
৩৬ বছর বয়সী সুদানের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে। ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে তিনি সন্তান হারান। সেই শোক তাকে ঠেলে দেয় সমাজসেবায়, এবং তিনি গড়ে তোলেন “হামি নেপাল” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রথমদিকে এই সংগঠন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও সহায়তা প্রদান করলেও, ধীরে ধীরে এটি তরুণদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা ছিল আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। সুদান কৌশল ঠিক করলেন আন্দোলনকে এমনভাবে সাজানোর, যাতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ কিন্তু প্রভাবশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
আন্দোলন সংগঠনে সুদানের প্রথম ধাপ ছিল ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গঠন। নিষেধাজ্ঞার মাঝেও তিনি বিকল্প মেসেজিং অ্যাপ, ভিপিএন, এবং মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে বার্তা ছড়ালেন। হামি নেপালের স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর ফোন কল, হ্যান্ডবিল ও পোস্টারের মাধ্যমে বিক্ষোভের সময়, স্থান ও নিরাপত্তা নির্দেশনা জানিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় ধাপে নিলেন প্রতীকী প্রতিবাদের কৌশল। তিনি তরুণদের স্কুল ইউনিফর্ম পরে, হাতে বই নিয়ে রাস্তায় নামতে আহ্বান জানালেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এই চিত্র ভাইরাল হয়, যা আন্দোলনের প্রতি বিশ্বজনমতের সহানুভূতি তৈরি করে।
তৃতীয় ধাপ ছিল ক্ষেত্র সমন্বয়। সুদান প্রতিটি শহরে স্থানীয় সমন্বয়ক নিয়োগ দেন, যারা ভিড় পরিচালনা, মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, এবং পুলিশি বাধা সামলানোর পরিকল্পনা করতেন। হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাখা হয়, যাতে আহতরা দ্রুত সহায়তা পান।
চতুর্থ ধাপে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুনরায় চালুর দাবির পাশাপাশি তিনি সরাসরি সরকারের পদত্যাগের আহ্বান জানান। এই সংগঠিত, সুপরিকল্পিত আন্দোলন দুই দিনের মধ্যেই সরকারকে চরম চাপে ফেলে। রাজধানী থেকে প্রাদেশিক শহর—সবখানে তরুণদের বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক মহলের নজর, এবং জনসমর্থনের ঢেউ—সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সরকার পতনের পর সুদান গুরুং আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বার্তায় বলেন—এটি শুধু একটি দাবির জয় নয়, বরং নেপালের জন্য নতুন এক সূচনা। তিনি সবাইকে শান্ত থাকতে, সহিংসতা এড়াতে এবং অর্জিত সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে রূপ দিতে আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এখনই সময় নেপালকে দুর্নীতি ও অকার্যকারিতার পথ থেকে সরিয়ে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার পথে নিয়ে যাওয়ার।
মঙ্গলবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
নেপালে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আলোচনায় কে এই তরুণ নেতা?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর আন্দোলনরত জেন জি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ। তিনি সবার কাছে ‘বালেন শাহ’ নামেই পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরই মধ্যে তাকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী করার দাবিও ছড়িয়ে পড়েছে।
কে এই বালেন্দ্র শাহ?
বালেন্দ্র শাহর জন্ম ১৯৯০ সালের ২৭ এপ্রিল। তিনি পেশায় একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার, একই সঙ্গে র্যাপার, গীতিকার, কবি ও রাজনীতিক। ২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন বালেন্দ্র শাহ, যা নেপালের ইতিহাসে প্রথম।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নেপালের হিপহপ ঘরানার সংগীতশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ২০১৩ সালে ইউটিউব সিরিজ ‘র বার্জ’–এ অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকারে যোগ দেন এবং দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
মেয়র হিসেবে অবদান
মেয়র হওয়ার পর থেকেই বালেন্দ্র শাহ বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসেন। যেমন-
* সিটি কাউন্সিলের সভা সরাসরি সম্প্রচার শুরু করেন।
* অবৈধ স্থাপনা ভাঙার উদ্যোগ নেন, যদিও এ নিয়ে আদালত ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
* কাঠমান্ডুর ময়লা-আবর্জনা সংকট সমাধানে সরাসরি বেসরকারি সংস্থাকে কাজে লাগান।
* নদী দখলমুক্ত করার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
বিক্ষোভে সমর্থন
জেন জি আন্দোলনের শুরু থেকেই তরুণ প্রজন্মের পাশে ছিলেন বালেন্দ্র শাহ। প্রধানমন্ত্রী ওলির পদত্যাগের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় বিক্ষোভকারীদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
মেয়র বলেন, প্রিয় জেন জি, সরকারের পদত্যাগের দাবি পূরণ হয়েছে। এখন সংযত হওয়ার সময়। দেশের সম্পদ নষ্ট হওয়া মানে আমাদেরই ক্ষতি। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব নেপালের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠন করা।
তিনি আরও জানান, সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা আছে। তবে তা কেবল পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরই হতে পারে।
কেন আলোচনায়?
ওলির পদত্যাগের পর দেশজুড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীন তরুণ প্রজন্ম এখন বিকল্প নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বালেন্দ্র শাহকে সামনে আনছে। তার জনপ্রিয়তা, সাহসী পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে উঠে আসা পরিচয় তাকে এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত নাম বানিয়েছে।













