এক টাকার মানুষ : ক্ষুদীরাম দাস

(এ গল্পটি চাঁদপুরের সন্তান কবি ও সাংবাদিক কবির হোসেন মিজিকে উৎগ করা হলো।)

কবিরদের ঘরটা সাধারণ টিনের, বর্ষায় টপ টপ করে পানি পড়ে। দেয়ালে ফাঁকফোকর দিয়ে শীতকালে ঠাÐা হাওয়া ঢুকে যায়। ভাইয়েরা সবাই আলাদা সংসার গড়েছে, কেবল কবির তার মাকে নিয়ে আলাদা থাকে। দিনমজুরী করে যা’ আয় করে, তাই দিয়েই সংসার চলে। সকালবেলা খালি পেটে কাজের খোঁজে বের হয়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে ক্লান্ত শরীরে। কখনো দু’টো দিন একটানা কাজ না পেলে ঘরে চুলা জ্বলে না। তবুও কবির চেষ্টা করে মাকে কষ্ট না দিয়ে মুখে হাসি ফোটাতে। মায়ের ছেঁড়া শাড়ি দেখে কবিরের মনটা হু হু করে কেঁদে উঠে।

একদিন বাজার থেকে শাড়ি হাতে ফিরেই সে হাসি মুখে বলে ওঠে, Ñ“মা, আজ কিন্তু তোর জন্যে শাড়ি এনেছি?”
মা মলিন মুখে হাসেন,
Ñ“আহারে বাপ, তুই নিজের জন্যে কিছু কিনলি না?”
কবির মাথা নিচু করে বলে,
Ñ“আমার কী দরকার মা? তোর জন্যে আনতে পারছি, সেটাই আমার শান্তি।”
কিন্তু মা-ই বোঝেন, ছেলের কষ্টটা কতো গভীর। রাতের অন্ধকারে কবির যখন কাগজ-কলম নিয়ে বসে, তখন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অজস্র দুঃশ্চিন্তা। মায়ের চিকিৎসা করাতে পারবে তো? কাল যদি কাজ না মেলে, তবে ভাতের হাঁড়ি চড়বে কি না?

মা মাঝে মাঝে ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,
Ñ“কবির, তুই লেখালিখি করিস, মন ভালো থাকে। কিন্তু খালি হাতে কাগজে কি সংসার চলে?”

কবির মায়ের হাত চেপে ধরে উত্তর দেয়,
Ñ“মা, আমি যদি না লিখি, তবে আমি বাঁচবো কেমন করে? কাজ তো করবোই, কিন্তু লেখাটা আমার শ্বাসের মতো।”

টিনের ঘরের ভেতর অল্প আলোয় মা-ছেলের মুখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। দারিদ্র্য যেন প্রতিদিনের সঙ্গী, তবুও ভালোবাসার বন্ধনে তারা অটুট।

কবিরের দুঃখ এ যে, সে মাকে আরাম দিতে পারে না। অন্য ভাইদের মতো পাকা ঘর বানাতে পারে না, সোনার গয়না কিনে দিতে পারে না। বাজারে মায়ের চোখ যখন দুধ বা ফলের দিকে স্থির হয়ে যায়, আর কবির কেবল তাকিয়েই থাকেÑওটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট।

তবু সে ভেঙে পড়ে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবে,
“আমি যদি সারাজীবন দিনমজুরও হই, মাকে হাসিমুখে রাখবো। আমার দুঃখ মনের ভেতরেই থাকুক, মায়ের মুখে যেন না আসে।”

কবিরের ঘর তাই দুঃখে ভরা, অথচ ভালোবাসায় আলোকিত। কারণ তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, মায়ের মমতা আর নিজের সততা।

গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলে কবির। ধুলোয় তার গায়ের জামা মলিন হয়ে গেছে, পায়ের স্যান্ডেল প্রায় ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তিÑযেন ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ভুবন। এভাবে দিন চলে, হৃদয়ে স্বপ্ন নিয়েই বেড়ে উঠে।

কবির ছোটবেলা থেকেই বুঝে গিয়েছিলো, তার সংসারে বই-খাতা কেনার সামর্থ্য নেই। স্কুলে যাওয়া মানে ছিলো বিলাসিতা। সংসারের অভাব আর কাজের তাগিদে লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। তবু অক্ষরের প্রতি তার টান এতো গভীর ছিলো যে, সে প্রায়ই গোপনে পুরোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়াতো। হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা, ছেঁড়া মলাটÑএসবই ছিলো তার স্বপ্নের জানালা।

একদিন দোকানদার মুচকি হেসে বললো,
Ñ“আবার এসেছিস কবির? টাকা তো নেই তোর কাছে।”
কবির হেসে উত্তর দিল,
Ñ“টাকা নেই বটে, কিন্তু বইয়ের গন্ধটা একটু নিতে তো দোষ নেই।”
দোকানদার মাথা নেড়ে বললো,
Ñ“আহা রে ছেলেটা, তোর চোখের ক্ষুধা দেখি কেবল অক্ষরের জন্যে। থাক, বসে পড়। এ পুরোনো গল্পের বইটা উল্টে-পাল্টে দেখ।”

কবির বই হাতে তুলে নিয়ে যেন অন্য জগতে চলে যেতো।

লেখালেখির শুরু।

কিছুটা লেখাপড়া জানা হয়ে গেলে কবির খাতা-কলম জোগাড় করলো। প্রথমে লিখতো নিজের মনের কথা। পরে আশেপাশের মানুষের গল্প, দুঃখ-সুখ, হাসি-কান্না। তার ভাষা ছিলো সহজ, কিন্তু শব্দগুলো যেন বুকের ভেতর থেকে উঠে আসতো।

একবার প্রতিবেশী করিম চাচা বললেন,
Ñ“এই কবির, আবার কী লিখছিস? ধান কাটার সময়টাতে কলম নিয়ে বসে থাকিস? কাজকর্ম করবি না?”

কবির মৃদু হেসে উত্তর দিলো,
Ñ“চাচা, ধান কাটার হাতও দরকার, আর মানুষের মনের কথা লেখার হাতও দরকার। আমি শুধু শব্দে ধান কাটতে চাই।”

চাচা বিরক্ত মুখে বললেন,
Ñ“শব্দে পেট ভরে নাকি? লিখে লিখে তোকে কেউ ভাত খাওয়াবে?”

এসব কথা কবির প্রায়ই শুনতো। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সকলে তাকে ‘অলস’ আর ‘খেয়ালি’ বলে আখ্যা দিতো। কিন্তু তার ভিতরে ছিলো এক অটল বিশ্বাসÑজীবনের আসল মূল্য টাকা নয়, সততা আর ভালোবাসা।

তাই সে নিজেকে মনে মনে বলতোÑ“আমি এক টাকার মানুষ। আমার কাছে টাকার মূল্য এক টাকারও কম। কিন্তু আমার লেখা, আমার সততাই হবে আমার আসল সম্পদ।”

এক রাতে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে কবির লিখল একটি গল্পÑ‘ছেড়াকাঁথা’। এটা চাঁদপুর কণ্ঠের বিভাগীয় পাতার প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু। মনের মধ্যে উঁকি দিতে লাগলো। আর গল্প লিখতে বসে গেলো। গল্পে ছিলো এক গরিব পরিবারের কাহিনী, যেখানে পুরোনো ছেঁড়া কাঁথা দিয়েও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে।

সে গল্পটি নিয়ে গেলো বিভাগীয় সম্পাদকের বাসায়। তিনি গল্টটি গ্রহণ করলেন এবং গল্পটি পড়ে সন্তোষ্ট হলেন। কয়েক সপ্তাহ পরেই খবর এলÑগল্পটি ছাপা হয়েছে শনিবারের বিভাগীয় পাঠকফোরামে!

কবির বিশ্বাসই করতে পারছিল না। সে দৌড়ে গিয়ে দোয়াগঞ্জল থেকে পত্রিকাটা কিনলো। নিজের নাম দেখে তার চোখ ভিজে উঠলো।

সন্ধ্যায় তিশা, পাশের বাড়ির মেয়ে, বলল,
Ñ“শুনেছি তোর গল্প ছাপা হয়েছে! তাই নাকি?”

কবির মৃদু হেসে বলল,
Ñ“হ্যাঁ, তিশা। আমার গল্পটা, ছেড়াকাঁথা।”

তিশা বিস্ময়ে তাকাল,
Ñ“আরে বাহ! তোকে তো আমরা ভেবেছিলাম শুধু দিবাস্বপ্ন দেখা ছেলে। অথচ তুই তো সত্যি লিখতে জানিস!”

কবির চোখ নামিয়ে বললো,
Ñ“লেখাটা আমার শখ নয়, তিশা। এটা আমার শ্বাসের মতো।”

‘ছেড়াকাঁথা’ এতো জনপ্রিয় হলো যে, পাঠকেরা কবিরকে বিভাগীয় সম্পাদক ফোনে অভিনন্দন জানালো।

একদিন সাহিত্য পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক কবিরকে ফোন দিলেন,
Ñ“কবির ভাই, আপনার গল্প আমাদের পাঠকরা দারুণ পছন্দ করেছে। প্রতিযোগিতায়ও আপনি প্রথম হয়েছেন। আরো গল্প লিখবেন আমাদের জন্যে?”

কবির কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বললো,
Ñ“দাদা, আমি তো গ্রামের এক অচেনা ছেলে। আপনি আমাকে সুযোগ দিলেন, এ ঋণ কোনোদিন ভুলব না।”

সম্পাদক হেসে বললেন,
Ñ“ঋণ নয় কবির ভাই, এটা আপনার যোগ্যতার স্বীকৃতি। লিখতে থাকুন। আপনি বড় হবেন, ভালো লেখক হতে পারবেন। আপনার মূল্য বেড়ে যাবে।”

কবির আবেগে ভেসে উত্তর দিলো,
Ñ“আমার মূল্য হয়তো এখন যেমন এক টাকা, আমি যতোই বড় হই না কেনো, তখনো এক টাকাই থাকবো।”

কবিরের এ নম্রতা যেন কখনো হারায়নি।”

যারা আগে তাকে ‘অলস’ বলত, তারাই এখন তার গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়। একদিন এক আত্মীয় এসে বললো,
Ñ“কবির, আমাদের তোকে ভুল বোঝা হয়েছিলো। তুই সত্যিই প্রতিভাবান।”

কবির শুধু হেসে উত্তর দিলো,
Ñ“মানুষের দৃষ্টিই বদলায়, আমি তো আগের মতোই আছি।”

তিশা মজা করে বললো,
Ñ“তুই এক টাকার মানুষ, তাই তো?”
কবির হেসে মাথা নেড়ে বললো,
Ñ“হ্যাঁ, তিশা, এক টাকার মানুষ। কিন্তু ভালোবাসার দামে হয়তো একশ কোটি।”

দিনগুলো বদলাতে লাগলো। কবিরের লেখা একের পর এক পত্রিকায় ছাপা হতে থাকলো। বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা তার কাছে বই লেখার প্রস্তাব নিয়ে এলো। সে সাংবাদিকতাও শুরু করলো। তার কলমে উঠে আসতো গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-সুখ, মাটির গন্ধ, নদীর স্রোত, ক্ষেতের শ্রমিকদের ঘাম।

প্রকাশক একদিন বললেন,
Ñ“কবির সাহেব, আপনার লেখা মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। আমরা চাই, আপনি উপন্যাস লিখুন।”

কবির হাসলেন,
Ñ“উপন্যাস লিখবো অবশ্যই, তবে মানুষের কথা ভুলে গেলে আর লেখা লেখা থাকে না। আমি চাই আমার প্রতিটি শব্দ মানুষের পাশে দাঁড়াক।”

এখন কবিরের হাতে টাকা আছে, সংসার চালানোর মতো স্বচ্ছলতা এসেছে; তবুও সে বদলায়নি। পুরোনো কুঁড়েঘরেই রয়ে গেছে। তার ছেঁড়া বইগুলোও আগের জায়গাতেই রাখা আছে।

একদিন তিশা মজা করে জিজ্ঞেস করলো,
Ñ“এখন তো চাইলে দালানকোঠা করতে পারিস। তুই কেনো এখানেই পড়ে আছিস?”

কবির জানালার বাইরে তাকিয়ে বললো,
Ñ“এ কুঁড়েঘরেই আমি লিখতে শিখেছি। এ ছেঁড়া বইয়ের গন্ধে আমি মানুষ হয়েছি। আমি তো এখানেই স্বস্তি পাই। আমি এক টাকার মানুষ, তিশাÑআমার লোভ নেই।”

তিশা চুপ করে তার দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবলো, এ মানুষটা সত্যিই অদ্ভুত। এক টাকার মানুষ হয়েও সবার হৃদয়ে অমূল্য হয়ে গেছে।

আজ কবির পরিচিত লেখক ও সাংবাদিক। তার লেখা পড়তে মানুষ মুখিয়ে থাকে। কিন্তু তার কাছে খ্যাতি বা অর্থের গুরুত্ব নেই। সে জানে, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ বা প্রতিপত্তি নয়Ñবরং নিজের সততা আর কাজ দিয়ে মানুষের মন জয় করা।

রাতের নীরবতায় প্রদীপের আলোয় বসে সে আবারো লিখতে শুরু করে। তার চোখে ভেসে ওঠে মাটির মানুষ, নদীর ঢেউ, ক্ষেতের ধুলো।

সে মৃদু স্বরে নিজেকেই বলে ওঠে,
Ñ“আমি এক টাকার মানুষ। হয়তো এ কারণেই মানুষের হৃদয়ে আমি অমূল্য। আমি ভুলিনি এখনো সেই বিভাগীয় সম্পাদককে। যে ম্যাসেজ পাঠায়, ‘-এগিয়ে যাও কবির ভাই, এগিয়ে যাও।’

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ডট কম

You might like

About the Author: priyoshomoy