

ক্ষুদীরাম দাস
শীতের সন্ধ্যা। শহরের জনারণ্যে তখন নিয়ন আলোর মাতাল করা ঝলকানি, রাস্তার ধারে ধারে আলো-ঝলমলে সাইনবোর্ড আর গলিপথে উঁকি দেয়া রঙিন বাতিগুলো শহরটাকে যেন এক অদ্ভুত কোলাহলমুখর স্বপ্নরাজ্যে পরিণত করেছে। এ শীতের মধ্যে আকাশ ভেঙে ঝুপ করে নেমে আসা বৃষ্টিতে মুহূর্তেই ধুলো, ধোঁয়া আর দিনের ক্লান্তি ধুয়ে মিশে গেল কাদাজলে। ভিজে বাতাসে অচেনা সুবাস, গাড়ির হর্ন, ভেজা পোশাকের গন্ধ আর মানুষের তাড়াহুড়ো মিলেমিশে যেন এক বিস্ময়কর দৃশ্যের জন্ম দিলো। ছাতা হাতে ছুটে চলা লোকজন, ফুটপাতের ফাঁকে জমে থাকা পানি লাফিয়ে পেরোনো কিশোররা আর ভেজা কুকুরের কুÐলী পাকিয়ে বসে থাকা ছবি শহরের ব্যস্ততাকে এক অন্যরকম চেহারা দিলো। এমন এক সন্ধ্যায় আমি আর ড্যানিয়েল বসে আছি শহরের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত এক দামি রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়ালের পাশে। বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা কাঁচে টুপটাপ আছড়ে পড়ছে, ভেতরে চলছে নরম আলো আর হালকা সংগীতের মায়া। চারপাশে বসে আছে নানা বয়সী অতিথি, কেউ নীরবে খাচ্ছে, কেউবা নিচু স্বরে আলাপ করছে।

সামনে আমার টেবিলে সাজানো রয়েছে থরে থরে বিলাসবহুল খাবারÑগরম গরম স্যুপ থেকে 시작 করে রঙিন সালাদ, সুগন্ধি বিরিয়ানি, সাথে ঝলসানো মাংসের প্লেট। সবকিছুতেই এক ধরনের কৃত্রিম চাকচিক্যের ছোঁয়া, যা’ আমাকে একইসঙ্গে আকর্ষণও করছে আবার খানিকটা অস্বস্তিও দিচ্ছে। খাওয়ার শেষ মুহূর্তে হাতে এল বিল, মোট দাম দাঁড়ালো হাজার বারোশো টাকা। সংখ্যাটা দেখে আমি অবাক হলাম না; বরং যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম এমন কিছুর জন্যে। অভ্যাসবশত মানিব্যাগ খুলে একগাদা নোটের ভিড় থেকে একটা একশো টাকার নোট আলাদা করলাম।
সেটাই ওয়েটার জেমসের দিকে বাড়িয়ে দিলাম। লম্বাটে গড়নের ছেলেটা মাথা নিচু করে একটুখানি কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে নিলো ঠোঁটে, যেন সেটা তার নিয়মিত ভদ্রতার অংশ। তারপর ধীরে ধীরে টেবিল থেকে সরে গেলো। আমি তাকিয়ে রইলাম তার চলে যাওয়ার পেছনের দিকে, মনে মনে ভাবলামÑএ টিপস পেয়ে সে হয়তো ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি হয়েছে। অন্তত আমি তাই ভেবে সান্ত¡না পেলাম; যদিও হয়তো বাস্তবে তার অনুভ‚তি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
হঠাৎ মনটা কেমন যেন ছটফট করে উঠলো। কেন এ একশো টাকা দিলাম? সত্যিই কি দরকার ছিলো? যেন অজান্তেই ভেতরে ভেতরে একধরনের অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করলো। একশো টাকার নোটটা জেমসের হাতে তুলে দেয়ার মুহূর্তটায় মনে হয়েছিলো আমি কিছু একটা বড়সড় কাজ করে ফেলেছি। অথচ এখন বসে বসে ভাবছি, আসলে কি কোনো মানে আছে এ দেয়ার মধ্যে? এ একশো টাকা তার কতোটা প্রয়োজন? হয়তো এটা তার দিনের শেষে পাওয়া বহু টিপসের একটি অংশমাত্র। সম্ভবত এ রাতেই সে আরো দশজন গ্রাহকের কাছ থেকে টিপস পাবে। আমার দেয়া টাকার পরিমাণ হয়তো তার কাছে গড়ে পাওয়া যেকোনো টাকার মতোই তুচ্ছ মনে হবে। একশো টাকাÑআমার কাছে অল্প হলেও তার কাছে হয়তো কিছুই নয়; কিংবা আবার উল্টোটাও হতে পারে। তার এ বাড়তি আয়ের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।
কে জানে, হয়তো তার মাসিক বেতনই যথেষ্ট ভালো; অথবা পরিবার থেকে অন্য কোনো আর্থিক সহায়তা সে পায়। একশো টাকার ভরসায় তো কোনো সংসার চলে না। হতে পারে, এ সামান্য অর্থ তার জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আনে না। সে হয়তো এ টাকাটা পকেটে রেখেই ভুলে যাবে; কিংবা দিনশেষে চা-সিগারেট খেয়ে শেষ করবে। আবার এটাও তো হতে পারে যে তার জীবনের গল্প একেবারেই আলাদা। হয়তো এ অর্থ না পেলেও তার পরিবার অনাহারে থাকবে না; হয়তো তার সন্তানদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হবে না। তার জীবনযাত্রা হয়তো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে টিপসের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অথচ আমি, অভ্যাসের বশে, যেন একধরনের আত্মতৃপ্তি অর্জনের জন্যে নোটটা তুলে দিলাম। তবুও ভেতরে ভেতরে একটা দ্বিধা কাজ করছেÑআমি কি সত্যিই তাকে সাহায্য করলাম, নাকি শুধু নিজের ভালো লাগার জন্যে একটা প্রদর্শনীমূলক কাজ করে ফেললাম? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, অথচ এর কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।
হঠাৎ মনে পড়লো সেই রিকশাওয়ালা জনের কথা। দুপুরের ঝাঁঝালো রোদে ঘাম ঝরতে ঝরতে তিনি আমাকে গন্তব্যে নামিয়ে দিয়েছিলেন। মুখের ভেতর শুকনো ক্লান্তি, চোখেমুখে শ্রমের রেখা, আর গায়ে জড়ানো পুরোনো মলিন শার্ট যেন দিনের পর দিনের সংগ্রামের গল্প বলছিলো। ভাড়া চাইতে গিয়েও তিনি ইতস্তত করছিলেন, যেন ভয় পাচ্ছেন আমি রেগে যাবো কি না, অথবা হয়তো ভাবছিলেন ঠিকমতো ভাড়া দেবো কি না। তার কণ্ঠে তখনো লাজুক এক ধরনের ভদ্রতাÑ”স্যার, ভাড়া যদি…” আমি ভাড়ার চেয়ে দশ টাকা বেশি দিয়েছিলাম। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে উঠেছিলো, আর সে বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা। তার চোখজোড়া যেন হঠাৎ করেই আলোকিত হয়ে উঠলো। ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মতো আনন্দ যেন এক মুহূর্তে ভেসে এলো চোখের পাতায়। সেই চোখে আমি দেখেছিলাম এক অব্যক্ত তৃপ্তি, যেন পৃথিবীর সমস্ত কষ্টের মাঝেও কিছু মুহূর্ত মানুষকে নতুন করে বাঁচার শক্তি জোগায়। তারপর মনে পড়লো, আমি সেদিন তাকে একশো টাকা দিয়েছিলাম। টাকাটা হাতে নিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন, যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কণ্ঠে বিস্ময় মিশ্রিত কৃতজ্ঞতার সুরÑ”স্যার, এত টাকা!” এ তিনটি শব্দ যেন চারপাশের শব্দকে মুহূর্তে মুছে দিল। আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম, তার চোখে জল এসে গিয়েছিলো। হয়তো সে চোখের জল লুকোতে চেষ্টা করেছিলো; কিন্তু আমি তাতে ভিজে উঠেছিলাম। সেদিনের সেই দৃশ্য আমার হৃদয়ে এক অমোচনীয় ছাপ ফেলে দিয়েছিলো। জনের চোখের কোণে জমে ওঠা জল, সেই কণ্ঠের কম্পন আর তার অগাধ কৃতজ্ঞতা আমাকে নতুন করে শিখিয়েছিলোÑসত্যিকারের টিপস কাকে বলে। টাকাটা যতোটুকু মূল্যবান ছিলো, তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ছিলো তার চোখজোড়া ভরা সেই অব্যক্ত আনন্দ আর এক বুক তৃপ্তি। সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, অর্থের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে গ্রহণকারীর অনুভীতির ওপর, আর সেই অনুভ‚তিই মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়।
হঠাৎ করেই মনে পড়লো সেলুনের সেই কর্মচারী রেবেকার কথা। কয়েক সপ্তাহ আগের কথাÑএকটা ছোট্ট সেলুনে চুল কাটাতে গিয়েছিলাম। অল্প বয়সী মেয়ে, চুলে কাঁচি চালাতে চালাতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছিলো। কাজ শেষে আমি অভ্যাসবশত পকেট থেকে বিশ টাকা বের করে তাকে টিপস দিলাম। সে মুখ বাঁকিয়ে সামান্য হেসে “ধন্যবাদ” বলল বটে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিলো না, ছিল না কোনো উচ্ছ¡াস। মনে হচ্ছিল, সে যেন শিখে নেয়া যান্ত্রিক সৌজন্যটাই কেবল ফিরিয়ে দিলো। তার চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে অনাগ্রহ, আর সেদিনের সেই শুকনো কৃত্রিম হাসি এখনো যেন আমার মনের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি করে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বিশ টাকার তেমন কোনো মূল্যই তার কাছে নেই, কিংবা হয়তো এত মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিন এমন কিছু টিপস পেয়ে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আজ এই বৃষ্টির রাতে শহরের পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই সেই স্মৃতি মাথায় ভেসে উঠলো। রাস্তার দুই পাশে নিয়ন বাতির ঝলকানি, কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমে ছোট ছোট নালা তৈরি করেছে। ছাতার নিচে লোকজন দ্রæত হেঁটে যাচ্ছে, কেউবা রিকশায় বসে বৃষ্টির ছাঁট এড়িয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছে। এমন ভেজা অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল এক ক্ষুদ্র দৃশ্যÑএকটা ছোট মেয়ে ফুটপাতের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছে। তার হাতে গোনা দু-একটা ফুল, যেগুলো ইতিমধ্যেই ভিজে চুপচুপে হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছিল, সেই ফুলগুলো হয়তো আর কারও আগ্রহই জাগাতে পারবে না। তবু সে দাঁড়িয়ে আছে, আশা-ভরসায়। বৃষ্টিতে ভিজে তার পরনের ছেঁড়া জামাটা আরও ভারি হয়ে গেছে, গায়ে লেগে ঠান্ডা কাঁপুনি ধরাচ্ছে।
ছোট্ট হাতের আঙুলগুলো ফুলের ডাঁটা আঁকড়ে ধরে আছে শক্ত করে, যেন সেটাই তার একমাত্র ভরসা। তার নাম বেথানিÑকে জানে, হয়তো কোনো এক ক্রেতার মুখে শোনা। বয়স হবে আট-নয় বছরের বেশি নয়। চোখ-মুখে স্পষ্ট ক্লান্তি আর অব্যক্ত হতাশা, তবু ভেতরে ভেতরে সে যেন একটা অদৃশ্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ভিজে চুল কপালে লেপ্টে আছে, ঠোঁট কাঁপছে শীত আর ক্লান্তিতে। তবু তার দৃষ্টি ক্রমাগত পথচারীদের দিকে ছুটে যাচ্ছে, হয়তো আশা করছে কেউ একজন অন্তত তার কাছ থেকে একটা ফুল কিনবে। সেই চোখে আমি দেখতে পেলাম না রেবেকার মতো কৃত্রিম শূন্যতা, বরং এক তীব্র বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ছাপÑযেন প্রতিটি ফুল বিক্রি করাই তার কাছে শুধু ব্যবসা নয়, বরং জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার উপায়।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভিজে কাদামাখা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট মেয়েটার চোখে যেন ভর করেছিল এক অদৃশ্য প্রশ্নÑকেউ কি সত্যিই তার কাছ থেকে ফুল কিনবে? আমি বিনা দ্বিধায় তার হাত থেকে ভেজা ফুলগুলো নিয়ে নিলাম। ফুলগুলো ইতিমধ্যেই কুঁকড়ে গেছে, সুগন্ধ হারিয়েছে, তবু সেই মুহূর্তে আমার কাছে তারা হয়ে উঠল সবচেয়ে সুন্দর উপহার।
ফুলগুলো হাতে নিয়ে আমি নরম গলায় বললাম, “এই নাও, এই বিশ টাকা।”
আমার কথাটা শুনে সে প্রথমে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। তার ভেজা মুখে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল অন্য কিছুÑঅভ্যন্তরীণ আবেগ, বিস্ময় আর এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা। সে কিছুই বলতে পারল না, ঠোঁট কাঁপছিলো, কিন্তু শব্দ বেরোল না। শুধু তার চোখজোড়া ভরে উঠল টলমল করা জলে। মনে হচ্ছিলো, এক মুহূর্তে তার সমস্ত অব্যক্ত যন্ত্রণা যেন সেই চোখ দিয়ে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। হয়তো এই বিশ টাকাতেই আজ রাতে তার ছোট্ট পরিবারের খাবার জুটবে। হয়তো একটা গরম ভাত, ডালের হাড়ি কিংবা শাক-সবজি কিনে নেওয়া যাবে। আবার এটাও হতে পারে, এই টাকায় সে তার ছোটভাইয়ের জন্যে একটা বিস্কুটের প্যাকেট কিনবে, আর সেই বিস্কুট হাতে পেয়ে ভাইটা হাসিমুখে তার দিকে তাকাবে। হয়তো মায়ের জন্যে ওষুধ কেনার টাকাই ছিলো না, আজ এ টাকাটা সেই শূন্যতা পূরণ করবে। আমি বুঝতে পারলাম, এ সামান্য বিশ টাকা তার কাছে কতোটা অমূল্য। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির জন্যে এটা কোনো সাধারণ টিপস নয়। এটা ছিলো তার ভিজে যাওয়া জীবনের ভেতরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা এক টুকরো আশার আলো। আমার হাতে ধরা নোটটা যেন তার কাছে রূপ নিলো এক বুক ভালোবাসা, এক অনাবিল মানবিকতার চিহ্ন। তার কণ্ঠে কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি; কিন্তু তার সেই টলমল করা চোখই যেন আমাকে বারবার বলে যাচ্ছিলোÑসত্যিকারের দান বা সাহায্য কখনো টাকার অঙ্কে মাপা যায় না, সেটি মাপা যায় শুধু হৃদয়ের উষ্ণতায়।
দামি রেস্টুরেন্ট বা সেলুনে টিপস দেওয়ার অভিজ্ঞতা আর এ ছোট্ট মেয়েটির মুখে হাসি ফোটানোর অনুভ‚তির মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একদিকে টিপস হলো এক ধরনের সামাজিক রীতিÑযান্ত্রিক সৌজন্যের মতো, যা’ আমরা অভ্যাসবশত পালন করি। রেস্টুরেন্টে খাবারশেষে ওয়েটারকে, বা সেলুনে চুল কাটার পর কর্মচারীকে টিপস দেয়ার সময় আমাদের ভেতরে খুব বেশি কোনো আবেগ কাজ করে না। মনে হয় এটাই নিয়ম, এটা করতেই হবে। কিন্তু অন্যদিকে, সেই ছোট্ট মেয়েটির হাতে দেয়া সামান্য বিশ টাকাÑসেটা শুধু একটি নোট নয়; বরং তার জীবনের কোনো একটি অভাব মেটানোর হাতিয়ার, তার ক্লান্ত মুখে ফুটে ওঠা স্বস্তির হাসির কারণ। এ দুই অনুভ‚তির ভেতর পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট যে, একটিকে মনে হয় কৃত্রিম নিয়ম, আর অন্যটিকে মনে হয় নিখাদ মানবিকতা। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক টিপস দেয়ার সংস্কৃতিতে আটকে যাচ্ছি, যেখানে আসল মানুষদের কথা ভুলে যাচ্ছি। টিপস হয়ে উঠেছে এক ধরনের সামাজিক মানদÐÑযেন না দিলে লজ্জা, দিলে সম্মান। অথচ যাদের সত্যিই সেই অর্থের প্রয়োজন, যাদের এক মুঠো চাল বা এক টুকরো রুটি জোগাড় করাটাই প্রতিদিনের সংগ্রাম, তাদের দিকে আমরা তাকাই না। সমাজ আমাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, দামি রেস্টুরেন্টের বিলের পাশে শতকরা পাঁচ-দশ ভাগ টিপস দিতে আমরা দ্বিধা করি না; কিন্তু কোনো রাস্তার ভিখিরিকে বা অসহায় মানুষকে সামান্য সাহায্য করতেও আমাদের বুক কাঁপে। যেন মানবিকতার জায়গায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি আনুষ্ঠানিকতায়। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে টিপস দিতে আমাদের একবারও ভাবতে হয় না; কিন্তু দান করতে গিয়ে হাজার বার ভাবতে হয়। রেস্টুরেন্টের ওয়েটার টিপস পেলে সেটি আমরা সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করি; কিন্তু কোনো অনাহারী শিশুকে খাবার কিনে দেয়ার আগে মনে মনে হাজার যুক্তি খুঁজে আনিÑসে কি আসলেই অভাবী, না কি ভিখিরি সাজছে? সে কি সত্যিই টাকার প্রয়োজনীয় জায়গায় ব্যয় করবে, না অন্য কোনো পথে নষ্ট করবে? এ দ্ব›দ্ব আমাদের মানবিকতাকে গোপনে ক্ষয় করছে। আসলে টিপস দেয়ার সংস্কৃতির আড়ালে আমরা ধীরে ধীরে মানবিক দান বা সাহায্যের মূল চেতনাটাকেই ভুলে যাচ্ছি। যেখানে টিপস শুধু সৌজন্য, দান সেখানে জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শক্তি। আর এ দুইয়ের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্যÑসেটাই হয়তো আমাদের চোখের সামনেই থেকে যাচ্ছে অদেখা।
আজ এ রাতে আমি টিপস দিতে শিখলাম না, আমি ভালোবাসা দিতে শিখলাম। এতদিন ধরে টিপসকে মনে করতাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যমÑরেস্টুরেন্টের ওয়েটার, সেলুনের কর্মচারী কিংবা কোনো সেবাদাতাকে সামান্য টাকা দিয়ে মনে করতাম দায়িত্ব শেষ। কিন্তু আজ বুঝলাম, টিপস কেবল টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ একটি প্রথা, এর ভেতরে নেই হৃদয়ের উষ্ণতা। ভালোবাসা দেওয়ার মধ্যে আছে এমন এক গভীরতা, যা’ কেবল গ্রহণকারীর জীবনকেই বদলায় না, দাতার আত্মাকেও অন্যরকম আনন্দে ভরে দেয়। আজ রাতে সেই ছোট্ট মেয়েটির চোখে আমি দেখেছি মানবিকতার আসল রূপÑযেখানে কোনো সৌজন্যের ভান নেই, নেই কৃত্রিমতা; আছে শুধু এক নিখাদ আবেগের ঝলক।
আজ থেকে আমি আর সমাজের বাঁধা নিয়ম মেনে চলা “ভদ্র” মানুষের ভিড়ে থাকতে চাই না। কারণ আমি দেখেছি, সেই ভদ্রতা অনেক সময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের মুখোশ, যার ভেতরে থাকে উদাসীনতা আর শূন্যতা। আমি বরং চাই, অভদ্রদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে অভদ্রতাই বেচতে, যদি তাতে সামান্য ভালোবাসা কেনা যায়। কারণ মানুষ যখন কেবল নিয়ম মানার জন্য টাকা দেয়, তখন সেটা টিপস হয়; আর যখন ভালোবাসা থেকে কিছু দেয়, তখন সেটা হয়ে ওঠে দানÑযার প্রভাব টাকার সীমার বাইরে গিয়ে হৃদয়ে পৌঁছায়।
আমি উপলব্ধি করলাম, ভালোবাসার কোনো দাম হয় না। ভালোবাসা এক অমূল্য সম্পদ, যাকে টাকায় কেনা যায় না, টাকায় মাপা যায় না। দামি খাবার খেয়ে ওয়েটারকে দেয়া টিপসের কোনো স্মৃতি আমার মনে থাকে না, কিন্তু ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা ভিজে চুপচুপে ছোট্ট মেয়েটির চোখের টলমল জল আমার অন্তরে আজীবন গেঁথে থাকবে। এ অনুভ‚তিই প্রমাণ করে, ভালোবাসা মানুষকে ভেতর থেকে সমৃদ্ধ করে, আর তার বিনিময়ে পাওয়া হাসি বা কৃতজ্ঞতা জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়ে ওঠে।
আজ থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, ভালোবাসাই হবে আমার আসল লেনদেন। সমাজের তৈরি কৃত্রিম শিষ্টাচারের আড়ালে আমি আর নিজেকে লুকাতে চাই না। যদি অভদ্র বলা হয়, তবু আমি চাই সেই অভদ্রতার ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হৃদয়ের সমস্ত মমতা। কারণ, ভালোবাসা বিতরণ করাই আসল সভ্যতা, আর সেই ভালোবাসার কোনো দাম হয় নাÑএটা কেবল হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়িয়ে যায়।
শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫













