

ক্ষুদীরাম দাস
সূর্য তখনো পুরোপুরি ওঠেনি, তবে সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব দিগন্তে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে আসছে ডেভিড। কাঁধে একটি ঝোলা, তাতে কয়েকটি বুনো ফুল আর একটি ছোট থলে, যার মধ্যে কিছু চাল ও তেল আছে। তার পরনে ছেঁড়া প্যান্ট আর গায়ে ময়লা শার্ট। চোখেমুখে বিষণœতার ছাপ। সে চলেছে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি জেমস সাহেবের বাড়ির দিকে। ডেভিডের স্ত্রী মেরী, গত দু’দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। সামান্য কিছু ওষুধ আর পথ্যের জন্যে তাকে হাত পাততে হয়েছে জেমস সাহেবের কাছে।

জেমস সাহেবের বাড়িটা গ্রামের সবার কাছেই একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। উঁচু পাঁচিল, বিশাল গেট, আর ভেতরে শান বাঁধানো পুকুর। তিনি গ্রামের মোড়ল, এক কথায় সর্বেসর্বা। তার কথার বাইরে কেউ কিছু করার সাহস পায় না। ডেভিড যখন গেটের সামনে পৌঁছালো-তখন জেমস সাহেব তার উঠোনে বসে ঢ়রঢ়ব টানছিলেন। তার পাশে তার একমাত্র ছেলে জন-বই হাতে বসে আছে। জন সবেমাত্র শহর থেকে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরেছে। তার চলন-বলনে শহুরে আভিজাত্য।
ডেভিডকে দেখে জেমস সাহেব কড়া গলায় বললেন, “কিরে ডেভিড, এতো সকালে কী মনে করে?”
ডেভিড কাঁচুমাচু হয়ে বললো, “স্যার, মেরীর জ্বরটা কমছে না। ওষুধ আর কিছু চালের জন্যে এসেছিলোাম।”
জেমস সাহেব গম্ভীর হলেন। “তোকে না বলেছিলোাম, কাল আসিস? তোর কাজের কোনো ঠিক নেই।”
ডেভিড অসহায়ভাবে বললো, “স্যার, কাল আসতাম। কিন্তু মেরী খুব অসুস্থ; তাই আর অপেক্ষা করতে পারলাম না।”
জেমস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “যা’, ভেতরে যা’। তোর বউকে দিয়ে দে। আর শোন্, এ ঋণ শোধ করতে হবে। কাল থেকেই আমার পুকুর পাড়ের আগাছা পরিষ্কারের কাজ শুরু করবি।”
ডেভিড কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে বললো, “ঠিক আছে স্যার। আপনার দয়া।”
ডেভিড ভেতরে চলে গেলো। জেমস সাহেব ঢ়রঢ়ব টানতে টানতে জনের দিকে তাকালেন। “দেখলি, এরা এমনই। এদের দিয়ে কাজ করানো মানেই ঝক্কি।”
জন কোনো কথা বললো না। সে শুধু তার বাবার মুখের দিকে তাকালো।
ডেভিড বাড়ি ফিরে মেরীকে ওষুধ আর চাল দিয়ে বললো, “স্যার আমাদের সাহায্য করেছেন।”
মেরী দুর্বল কণ্ঠে বললো, “ডেভিড, তুমি কেনো গেলে? আমি তো বলেছিলোাম, আমি সেরে উঠবো।”
ডেভিড তার কপালে হাত রেখে বললো, “তুমি এতো দুর্বল কেনো? আমি কী করে তোমাকে একা রাখি?”
মেরী স্বামীর দিকে তাকালো। তার চোখে জল। ডেভিড তাকে সান্ত¡না দিলো। “চিন্তা করো না। আমি সব ঠিক করে দেবো।”
ডেভিড জেমস সাহেবের কথামতো পরদিন সকালে তার পুকুর পাড়ে কাজ করতে গেলো। সে সারাদিন আগাছা পরিষ্কার করলো। জেমস সাহেব তাকে কিছু টাকা দিলেন। ডেভিড সেই টাকা দিয়ে মেরীর জন্যে কিছু ফল আর দুধ কিনলো।
এভাবেই ডেভিড জেমস সাহেবের কাছে ঋণী হয়ে পড়ল। যখনই মেরীর কোনো কিছু প্রয়োজন হতো, ডেভিড ছুটে যেতো জেমস সাহেবের কাছে। জেমস সাহেব তাকে কাজ দিতেন। আর সেই কাজের বিনিময়ে ডেভিড তার ঋণ শোধ করতো।
একদিন মেরী বললো, “ডেভিড, আমি তোমার ওপর নির্ভর করে থাকতে চাই না। আমি নিজে কিছু করতে চাই।”
ডেভিড হেসে বললো, “তুমি কী করবে? তুমি তো দুর্বল।”
মেরী বললো, “আমি কাঁথা গেলোাই করতে পারি। আমাদের গ্রামের অনেকে কাঁথা গেলোাই করে বিক্রি করে।”
ডেভিড মেরীর আগ্রহ দেখে খুশি হলো । সে বাজারে গিয়ে কিছু সুতো আর পুরনো শাড়ি কিনে আনলো। মেরী কাঁথা গেলোাই করা শুরু করলো। প্রথম প্রথম তার কাজ তেমন ভালো হলো না; কিন্তু ধীরে ধীরে তার হাত বসে গেলো। সে সুন্দর সুন্দর কাঁথা গেলোাই করতে লাগলো।
ডেভিড তার স্ত্রীর কাজ দেখে মুগ্ধ হলো । সে তার কাঁথাগুলো বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে শুরু করলো। প্রথমদিকে কেউ তার কাছ থেকে কিনতে চাইতো না। কিন্তু ডেভিড হাল ছাড়লো না। সে সবার কাছে তার স্ত্রীর কাজের প্রশংসা করতো। একসময় তার কাঁথাগুলো বিক্রি হতে শুরু করলো।
ডেভিড আর মেরীর জীবন পাল্টাতে শুরু করলো। তাদের হাতে টাকা আসতে লাগলো। তারা ধীরে ধীরে জেমস সাহেবের ঋণ শোধ করে দিলো।
একদিন ডেভিড জেমস সাহেবের কাছে গেলো। “স্যার, আপনার ঋণ শোধ হয়ে গেছে। আপনার দয়া।”
জেমস সাহেব অবাক হলেন। “তুই কি করে শোধ করলি? তোর তো কোনো কাজ নেই।”
ডেভিড বললো, “আমার স্ত্রী কাঁথা গেলোাই করে। তার কাঁথা বিক্রি করে আমরা টাকা জমিয়েছি।”
জেমস সাহেব ডেভিডের দিকে তাকালেন। তার চোখে এক ধরনের বিস্ময়। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “এ ডেভিড এতো কিছু করেছে? তার স্ত্রী তাকে এতো কিছু শিখিয়েছে?”
জেমস সাহেব দেখলেন, ডেভিড এখন আর আগের মতো কাঁচুমাচু নয়। তার মুখে আত্মবিশ্বাস। তার চোখে উজ্জ্বলতা। তিনি বুঝলেন, ডেভিড তার স্ত্রীর ভালোবাসায় ও কর্মের অনুপ্রেরণায় নতুন করে জীবন পেয়েছে।
একদিন জেমস সাহেবের ছেলে জন ডেভিডের বাড়িতে গেলো। সে মেরীর কাঁথা দেখতে চাইলো। মেরী জনকে কিছু কাঁথা দেখালো। জন কাঁথাগুলো দেখে অবাক হলো । “এ কাঁথাগুলো তুমি গেলোাই করেছ? এগুলো তো কোনো শিল্পীর হাতের কাজ।”
মেরী বললো, “আমি শুধু আমার স্বামীকে সাহায্য করার জন্যে এটা শুরু করেছিলোাম।”
জন বললো, “তুমি কি জানো, এ কাঁথাগুলো অনেক দামে বিক্রি হতে পারে? আমি শহরে কিছু দোকানদারের সাথে কথা বলবো। তারা তোমার কাঁথাগুলো কিনতে আগ্রহী হবে।”
মেরী জনের কথায় খুশি হলো । সে তার কাজ আরো ভালোভাবে করতে লাগলো।
ডেভিড আর মেরীর জীবন আরো ভালো হলো । তারা এখন গ্রামের সবার কাছেই পরিচিত। ডেভিড এখন আর শুধু জেমস সাহেবের কাছে কাজ করে না। সে নিজের জমিতে কাজ করে। তার ফসল ভালো হয়।
একদিন গ্রামের কয়েকজন মোড়ল ডেভিডের নামে জেমস সাহেবের কাছে অভিযোগ করলো। “স্যার, ডেভিড এখন আর আমাদের কথা শোনে না। সে তার স্ত্রীর কথায় চলে। সে নাকি স্ত্রৈণ।”
জেমস সাহেব তাদের দিকে তাকালেন। “তোমরা কী বলতে চাও?”
মোড়লরা বললো, “স্যার, ডেভিডের স্ত্রীর কথা শুনে সে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত। সে আমাদের কোনো কথা শোনে না।”
জেমস সাহেব তাদের কথা শুনে হাসলেন। “তোমরা কি জানো, ডেভিড এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে? সে এখন আর আমার কাছে ঋণী নয়।”
মোড়লরা অবাক হলো ।
জেমস সাহেব বললেন, “একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে কাজ করে, তখন সে দুর্বল নয়। সে শক্তিশালী। সে তার স্ত্রীর শক্তি দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করে। ডেভিড এখন আর আমার কাছে ঋণী নয়। সে এখন নিজের জীবনে সফল। আর তোমরা যারা স্ত্রৈণ বলে তাকে হেয় করছো, তোমরা নিজেরাই দুর্বল।”
মোড়লরা চুপ করে রইলোতাদের কোনো উত্তর ছিলো না।
জেমস সাহেব ডেভিডকে ডেকে আনলেন। “ডেভিড, তুই এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিস। তোর স্ত্রী তোকে সাহায্য করেছে। তুই এখন থেকে আর কোনো মোড়লের কথা শুনবি না। তুই শুধু তোর স্ত্রীর কথা শুনবি। কারণ, সে তোকে সঠিক পথে নিয়ে গেছে।”
ডেভিড জেমস সাহেবের কথায় অবাক হলো । সে জেমস সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ হলো ।
জন ফিরে এসে তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো, “বাবা, তুমি কেনো ডেভিডকে স্ত্রৈণ বলেছ?”
জেমস সাহেব বললেন, “স্ত্রৈণ মানে কী জানিস? যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন তাকে স্ত্রৈণ বলে। কিন্তু ডেভিড তার স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল নয়। সে তার স্ত্রীর সাথে কাজ করে। সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে। আর এ ভালোবাসা তাকে শক্তিশালী করেছে। স্ত্রৈণ হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটা একজন পুরুষের শক্তি।”
জন তার বাবার কথায় মুগ্ধ হলো । সে তার বাবাকে নতুন করে দেখলো।
ডেভিড আর মেরীর জীবন এখন আনন্দময়। তারা একসাথে কাজ করে, একসাথে থাকে। তাদের ভালোবাসা আরো গভীর হয়েছে।
একদিন ডেভিড মেরীকে বললো, “মেরী, তুমি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছো। তুমি আমাকে শিখিয়েছো, কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে বাঁচতে হয়।”
মেরী হাসলো। “তুমি আমাকে ভালোবাসা দিয়েছো। তুমি আমাকে শিখিয়েছো, কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, কীভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হয়।”
ডেভিড মেরীর হাত ধরলো। তারা একসাথে বসে রইলো। সূর্যের আলো তাদের ওপর ছড়িয়ে পড়লো। তাদের জীবন এখন আরো উজ্জ্বল।
ডেভিডের গল্পটা গ্রামের সবাই জানলো। সবাই বুঝলো, স্ত্রৈণ হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটা একজন পুরুষের শক্তি। যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তখন সে সফল হয়। সে নতুন করে জীবন পায়।
আর জেমস সাহেব? তিনি এখন আর কাউকে স্ত্রৈণ বলে হেয় করেন না। তিনি এখন সবার কাছে ডেভিডের গল্প বলেন। আর বলেন, “নারীকে সম্মান করো, নারীকে ভালোবাসো। কারণ, একজন নারী একজন পুরুষকে নতুন করে জীবন দিতে পারে।”
এভাবেই ডেভিড আর মেরীর গল্পটা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করলো। গ্রামের মানুষ বুঝলো, ভালোবাসা আর সম্মানই একজন মানুষকে সফল করে তোলে। স্ত্রৈণ হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটা একজন পুরুষের শ্রেষ্ঠ গুণ।
রোববার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫













