

মিজানুর রহমান রানা :
মানব জিনোমের রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো মানব জিনোমের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র প্রকাশিত হলেও, সেই “জীবনের বই” পড়া এবং বোঝা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। গুগল ডিপমাইন্ডের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল “আলফাজিনোম” সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আলফাজিনোম কী?
আলফাজিনোম একটি ডিপ লার্নিং মডেল, যা মানব ডিএনএর জটিল গঠন ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এটি বিশেষভাবে “নন-কোডিং” ডিএনএ অংশগুলোর কার্যকলাপ বুঝতে সাহায্য করে, যেগুলো আগে “জাঙ্ক ডিএনএ” হিসেবে বিবেচিত হতো। এই অংশগুলোই কোষে জেনেটিক তথ্যের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বহু রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ভ্যারিয়েন্ট ধারণ করে।
মানব জিনোমের ব্যাকরণ
মানব ডিএনএ তিন বিলিয়ন নিউক্লিওটাইড জোড়া নিয়ে গঠিত, যা A, T, C ও G অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এর মাত্র ২% অংশ প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা বহন করে, যা শরীর গঠন ও পরিচালনার মূল উপাদান। বাকি ৯৮% অংশ দীর্ঘদিন ধরে রহস্যাবৃত ছিল। বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করেন, এই অংশগুলো অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো কাজ করে—জিনের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে।
রোগ নির্ণয়ে সম্ভাব্য বিপ্লব
আলফাজিনোমের সাহায্যে গবেষকেরা এখন কঠিন জেনেটিক রোগগুলোর মূল কারণ বিশ্লেষণ করতে পারবেন। এটি এমন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো আগে নজর এড়িয়ে যেত। ফলে:
নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশ সম্ভব হবে।
রোগের পূর্বাভাস দেওয়া সহজ হবে।
ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা (Personalized Medicine) বাস্তবায়ন করা যাবে।
গবেষণার অগ্রগতি
গুগল ডিপমাইন্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট পুশমিত কোহলি বলেন, “আমাদের কাছে লেখা আছে”—অর্থাৎ ডিএনএর ক্রম জানা থাকলেও, তার ব্যাকরণ বোঝা ছিল গবেষণার পরবর্তী সীমান্ত। আলফাজিনোম সেই সীমান্তে প্রবেশ করেছে। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই টুলের কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়েছে।
বাইরের গবেষকদের প্রতিক্রিয়া
বহু গবেষক আলফাজিনোমকে “একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এটি:
জেনেটিক রোগ অনুকরণ করে পরীক্ষা করার সুযোগ দেবে।
জিনোমের অজানা অংশে কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।
জিনোমিক গবেষণার গতিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
আলফাজিনোমের মাধ্যমে:
ক্যান্সার, অটোইমিউন রোগ, স্নায়বিক রোগ ইত্যাদির জেনেটিক ভিত্তি আরও গভীরভাবে বোঝা যাবে।
ডিজিটাল বায়োপসি এবং জেনেটিক স্ক্রিনিং আরও নির্ভুল হবে।
নতুন ওষুধ আবিষ্কার ও জিন থেরাপি উন্নত হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা
যদিও আলফাজিনোমের সম্ভাবনা বিপুল, তবু কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:
ডেটার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
নন-কোডিং ডিএনএ সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও নীতিমালার প্রয়োগ জরুরি।
আলফাজিনোম মানব জিনোমের রহস্য উন্মোচনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এটি শুধু গবেষণার গতিকে ত্বরান্বিত করবে না, বরং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটাবে। ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞান এই ধরনের এআই টুলের উপর অনেকাংশেই নির্ভর করবে।
প্রকাশিত : বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.













