

মৃত্যুর পর কী ঘটে—এটি এমন এক প্রশ্ন যা বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন এবং সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পেয়েছে। সংক্ষেপে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরি:

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
- মৃত্যুকে বিজ্ঞানীরা একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার পরও কিছু সময় মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ থাকতে পারে।
- সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় (Near-Death Experience) আশপাশের ঘটনা মনে রাখতে পেরেছেন। অর্থাৎ সচেতনতা হঠাৎ শেষ হয়ে যায় না, বরং ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়।
- প্রাণী পরীক্ষায়ও দেখা গেছে, মৃত্যুর পর কিছু সময় মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক সংকেত দেখা যায়, যা হয়তো শরীর থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে কেউ কেউ অনুমান করেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি (ইসলাম উদাহরণ)
- ইসলামে মৃত্যু মানে সমাপ্তি নয়, বরং এক নতুন জীবনের সূচনা।
- বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যুর পর মানুষ বরযখে প্রবেশ করে, যেখানে আত্মা কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করে।
- পরকালেই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে—সৎকর্মীরা পুরস্কৃত হবে, অসৎকর্মীরা শাস্তি পাবে।
সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
- অনেক সংস্কৃতিতে মৃত্যু হলো আত্মার অন্য জগতে যাত্রা। কেউ মনে করেন আত্মা পুনর্জন্ম নেয়, কেউ বলেন এটি চিরস্থায়ী মুক্তি বা শাস্তির দিকে যায়।
- দর্শনে মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক হলো—চেতনা কি শরীরের বাইরে টিকে থাকে, নাকি শরীরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?
মূলত, মৃত্যুর পর কী ঘটে তা নিয়ে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই। ধর্ম ও দর্শন মানুষকে আশা, ন্যায়বিচার ও অর্থ দেয়, আর বিজ্ঞান মৃত্যুর মুহূর্তে শরীর ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করে।
কোরআন ও হাদিসে মৃত্যুর পর কী ঘটে তা খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক জীবন থেকে অন্য জীবনে উত্তরণ। সংক্ষেপে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরি:
কোরআনের আলোকে
– প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে
_“কُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ”_ — প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫)
– মৃত্যু নির্ধারিত সময়েই হবে
_“وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُّؤَجَّلًا”_ — কোনো প্রাণ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মারা যায় না; নির্দিষ্ট সময়েই মৃত্যু ঘটে। (সূরা আন-নিসা ৪:৭৮)
– মৃত্যুর পর মানুষ বরযখে অবস্থান করে, যেখানে সে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। (সূরা মু’মিনুন ২৩:১০০)
হাদিসের আলোকে
– রাসূল ﷺ বলেছেন: “কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ। যদি কেউ এতে মুক্তি পায়, তবে পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে। আর যদি এতে মুক্তি না পায়, তবে পরবর্তী ধাপগুলো আরও কঠিন হবে।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬০)
– মৃত্যুর পর ফেরেশতারা আত্মা গ্রহণ করে। মুমিনের আত্মা শান্তির সঙ্গে বের হয়, আর কাফেরের আত্মা কষ্টের সঙ্গে বের হয়। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
– কবরের প্রশ্নোত্তর: মুনকার ও নাকীর ফেরেশতা এসে জিজ্ঞাসা করবে—তোমার রব কে, তোমার দ্বীন কী, তোমার নবী কে। সঠিক উত্তর দিলে কবর প্রশস্ত হবে, ভুল উত্তর দিলে শাস্তি শুরু হবে।
পরকালীন ধাপসমূহ
1. বরযখ — মৃত্যুর পর কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষার স্থান।
2. হাশর — কিয়ামতের দিন সবাইকে একত্র করা হবে।
3. মিযান — আমল পরিমাপের পাল্লা।
4. সিরাত — জাহান্নামের উপর সেতু, যা পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে।
5. জান্নাত বা জাহান্নাম — চূড়ান্ত গন্তব্য, চিরস্থায়ী সুখ বা শাস্তি।
কোরআন ও হাদিসে মৃত্যু হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সমাপ্তি এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা। মুমিনদের জন্য এটি আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাতের সুখের পথ, আর কাফের ও পাপীদের জন্য জাহান্নামের শাস্তির সূচনা।
প্রকাশিত : রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.













