

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় সবসময়ই বিতর্কিত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এক অভূতপূর্ব প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে। তাঁর দর্শন ছিল দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তাঁর আমলে দারিদ্র্য বেড়েছে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, আর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থেকে গেছে। এই ব্যর্থতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার ব্যর্থতা।
১. প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
– প্রত্যাশা: গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণ আশা করেছিল দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার।
– বাস্তবতা: অর্থনৈতিক সূচক নিম্নমুখী, বিনিয়োগ কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে, এবং প্রায় ৩০ লাখ নতুন দরিদ্র সৃষ্টি হয়েছে।
– প্রতিশ্রুতি: স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অবাধ নির্বাচন।
– ফলাফল: একটি নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।

২. অর্থনৈতিক ব্যর্থতা
– বেসরকারি বিনিয়োগ: জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
– সরকারি বিনিয়োগ: এডিপি বাস্তবায়ন ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
– ব্যাংক খাত: খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে সর্বোচ্চ, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ।
– ঋণের বোঝা: ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ রেখে বিদায়।
– মূল্যস্ফীতি বনাম মজুরি: মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম, ফলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস।
৩. রিজার্ভ রাজনীতি
ড. ইউনূস বিদায়ী ভাষণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, রিজার্ভ কোনো লক্ষ্য নয়, বরং একটি উপকরণ। রিজার্ভ বাড়ানো হয়েছে আমদানি সংকোচন, শিল্প উৎপাদন কমানো এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে। অর্থাৎ, রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে ছিল জনগণের ক্ষতি।
৪. দুর্নীতি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুবিধা
– উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ।
– গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ছাড় ও বিশেষ সুবিধা।
– শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ।
– স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, জনমনে সন্দেহ।
৫. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার
– প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি।
– সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমে আগুন, ভিন্নমত দমন।
– বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ধর্মীয় ঘৃণা ছড়ানো, ভাস্কর্য বিনষ্ট।
– গণতন্ত্র সুসংহত করার পরিবর্তে ভয় ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি।
৬. “তিন শূন্য” দর্শনের ব্যর্থতা
ড. ইউনূস বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছেন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণ। কিন্তু তাঁর আমলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দুটোই বেড়েছে। ফলে তাঁর দর্শন বাস্তবে পরিণত হয়নি। প্রশ্ন হলো, তিনি আবারও কি বিশ্বকে এই দর্শনের প্রতি মনোযোগী হতে আহ্বান জানাতে পারবেন?
৭. শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
– ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান: রাষ্ট্রীয় সংস্কার কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর নির্ভরশীল।
– স্বচ্ছতা: দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার টেকসই হয় না।
– জনসম্পৃক্ততা: জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
– অর্থনৈতিক বাস্তবতা: রিজার্ভ নয়, উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের জন্য একটি হারানো সুযোগ। দারিদ্র্য বিমোচনের দর্শন বাস্তবায়িত হয়নি, বরং দারিদ্র্য বেড়েছে। তাঁর ব্যর্থতা আমাদের শেখায়—ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে টেকসই পথে নিয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে এই শিক্ষা মনে রাখতে হবে, যাতে আর কোনো অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা ভঙ্গ না করে।
প্রকাশিত : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.












