

তথ্যপ্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :
ঠিক এমন সময় নতুন এক গবেষণা সে ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক কেলভিন লর এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর দাবির পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জনবল কমানোর প্রকৃত কারণ আড়াল করতেই এআইয়ের ‘অজুহাত’ দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। খবর নিক্কেই এশিয়া।

অধ্যাপক কেলভিন বিষয়টিকে ‘এআই-ওয়াশিং’ বলে অভিহিত করেছেন। এখন সাধারণ কারণে কর্মী ছাঁটাই হলেও সেটির দায় চাপানো হচ্ছে এআইয়ের ওপর। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী পীযূষ গুপ্তের একটি বক্তব্য বেশ আলোচনায় আসে। তিনি বলেন, এআইয়ের প্রভাবে তিন বছরে ব্যাংকটি থেকে চার হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হবে।
এশিয়ার মধ্যে এআইয়ের কারণে বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের প্রমাণ হিসেবে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে ডিবিএস ব্যাংক রয়টার্সকে জানিয়েছে, চার হাজার পদ মূলত প্রকল্প শেষ হওয়া অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক পদ ছিল, স্থায়ী কর্মীদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি। উল্টো ব্যাংকটি হাজারখানেক এআই-সংক্রান্ত নতুন পদ তৈরি করছে এবং ১৩ হাজার কর্মীকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ব্যাংকটি রেকর্ড ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার নিট মুনাফা করেছে। একই চিত্র দেখা গেছে ভারতের আইটি খাতেও। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত টিসিএস, ইনফোসিস এবং উইপ্রোর মতো বড় কোম্পানিগুলোয় উল্লেখযোগ্য হারে কর্মী কমেছে। টিসিএসে ১৩ হাজার ইনফোসিসে ২৬ হাজার এবং উইপ্রোয় প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। বাইরে থেকে এ ছাঁটাইকে এআইয়ের প্রভাব মনে করা হলেও কোম্পানিগুলো ভিন্ন দাবি করেছে। টিসিএস ও ইনফোসিসের প্রধান নির্বাহীরা জানান, মূলত কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত নিয়োগ এবং পরে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলেই দপ্তরে সমন্বয় করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংও ২০২৪ সালে বিদেশের কিছু বিভাগে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই করেছে। তবে এ জনবল ছাঁটাই অটোমেশন বা এআইয়ের কারণে নয়, বরং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার কারণে হয়েছে।
কোম্পানিসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনভিডিয়ার জন্য হাই-ব্যান্ডউইডথ মেমোরি চিপ তৈরির দৌড়ে স্যামসাং এসকে হাইনিক্সের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল।
অধ্যাপক কেলভিন লর মতে, অনেক সময় কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রকৃত কারণ আড়াল করতে কোম্পানি এআইকে একটি সহজ ব্যাখ্যা বা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, ব্যবসার কৌশল বদলানো বা লোকসান হওয়ার মতো কারণে যেসব পরিবর্তন আগেও স্বাভাবিকভাবে ঘটত, সেগুলোকেই এখন এআইয়ের কারণে ঘটেছে বলে তুলে ধরা হচ্ছে।
এআইয়ের প্রভাবে আসলেই কি চাকরি হারাবে যুবকরা?
এআই চাকরির বাজার পুরোপুরি ধ্বংস করবে—এমন প্রমাণ এখনো নেই। বরং এআই কিছু খাতে চাকরি কমালেও নতুন দক্ষতার সুযোগ তৈরি করছে, বিশেষ করে ডেটা, সফটওয়্যার, এআই ব্যবস্থাপনা ও সৃজনশীল কাজে। মূল ঝুঁকি বেশি এন্ট্রি-লেভেল ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ক্ষেত্রে।
আইয়ের প্রভাব: চাকরি হারানো বনাম নতুন সুযোগ
– প্রভাবিত খাত: ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, প্রোগ্রামিংয়ের কিছু অংশ, রুটিন অফিস কাজ।
– নতুন সুযোগ: এআই ডেভেলপমেন্ট, মডেল ট্রেনিং, এআই নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীল কনটেন্ট, ডেটা বিশ্লেষণ।
– প্রবণতা: এআইকে অজুহাত করে ছাঁটাইয়ের খবর থাকলেও বাস্তবে অনেক কোম্পানি এআই-সংক্রান্ত নতুন পদ তৈরি করছে এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
সম্ভাব্য ঝুঁকি
– এন্ট্রি-লেভেল নিয়োগ কমতে পারে, ফলে তরুণ চাকরি প্রার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে।
– দক্ষতা বৈষম্য: যারা এআই-সম্পর্কিত দক্ষতা অর্জন করবে তারা এগিয়ে থাকবে, অন্যরা পিছিয়ে পড়তে পারে।
– অর্থনৈতিক চাপ: কিছু কোম্পানি এআইকে ছাঁটাইয়ের অজুহাত বানাচ্ছে, যা কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
করণীয়
– নতুন দক্ষতা অর্জন: ডেটা বিশ্লেষণ, এআই টুল ব্যবহার, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, সৃজনশীল কাজ।
– পুনঃপ্রশিক্ষণ : অনেক কোম্পানি কর্মীদের এআই-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—এগুলো কাজে লাগানো উচিত।
– বাজার বোঝা: এআই সব চাকরি ধ্বংস করবে না, বরং কাজের ধরন বদলাবে।
এআই চাকরি কমাচ্ছে, তবে একইসাথে নতুন সুযোগও তৈরি করছে। যারা সময়মতো দক্ষতা বদলাতে পারবে, তারা চাকরির বাজারে টিকে থাকবে।
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬ খ্রি.
















