

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :
সাংবাদিক আকিব চাঁদপুর টাইমস এর প্রতিষ্ঠাতা। এ ছাড়া বহু মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বিগত দুই যুগ ধরে সৎ, নিষ্ঠাবান সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিক সমাজে তার ভূমিকা বিরল ও অতূলনীয়। কিন্তু চাঁদপুর পৌরসভা কার্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিব। অভিযোগ উঠেছে, তথ্য সংগ্রহের সময় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, মারধর করা হয় এবং তার পেশাগত কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কী ঘটেছিল সেদিন
প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মী সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ১১টার দিকে মোসাদ্দেক আল আকিব চাঁদপুর পৌরসভার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে কার্যালয়ে যান। তিনি পৌরসভার প্রকৌশল শাখার কয়েকটি ফাইল ও বরাদ্দ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চান। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর আওতায় তিনি লিখিত আবেদনও জমা দেন বলে দাবি করেন।
আকিবের সহকর্মী সাংবাদিক ফরিদ আহমেদ জানান, “আকিব ভাই তথ্য চাওয়ার পরপরই কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে ঘিরে ধরে। প্রথমে তারা মৌখিকভাবে বাধা দেয়, এরপর ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে কিল-ঘুষি মারা হয় এবং তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে আছড়ে ভেঙে ফেলা হয়।”
হামলার সময় আকিব তার মোবাইলে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করছিলেন বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিও ধারণ করায় হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার পরপরই পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারী তাকে উদ্ধার করে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
আহত সাংবাদিকের বর্তমান অবস্থা
চাঁদপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সুমনা আক্তার জানান, “রোগীর মাথায় ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ডান হাতের কব্জিতে ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করি।”
বর্তমানে ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন আকিব। তার পরিবার জানিয়েছে, মাথায় আঘাতের কারণে তার মাঝে মাঝে বমি হচ্ছে এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন। চিকিৎসকরা ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে আকিবের ভাই মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভাইয়ের অবস্থা এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। ডাক্তার বলেছে, মাথার সিটিস্ক্যান রিপোর্ট আসার পর বোঝা যাবে ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে কিনা। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
কী তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন আকিব
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ চলছিল। অভিযোগ, কার্যাদেশে যে স্পেসিফিকেশন ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।
আকিব গত দুই সপ্তাহ ধরে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করছিলেন। তিনি প্রকল্পের দরপত্র, ব্যয় বিবরণী এবং পরিদর্শন প্রতিবেদনের কপি সংগ্রহের জন্য তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন। ঘটনার দিন তিনি সেই আবেদনের অগ্রগতি জানতে পৌরসভায় গিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার একজন কর্মচারী বলেন, “আকিব ভাই প্রকল্পের ফাইল চাওয়ায় স্যাররা বিরক্ত হয়েছিলেন। এর আগেও কয়েকজন সাংবাদিক এই ফাইল চেয়েছিল, কিন্তু তাদের দেওয়া হয়নি।”
পুলিশ ও প্রশাসন কী বলছে
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনার দিন রাতেই আকিবের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ওসি বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য পৌরসভায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। ফুটেজ পেলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত চলছে।”
তবে ঘটনার তিন দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ নিয়ে সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক বলেন, “সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। পৌর মেয়রের সাথে কথা হয়েছে। তিনি তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দোষীদের ছাড় দেওয়া হবে না।”
পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
চাঁদপুর পৌরসভার প্রশাসক এরশাদ উদ্দিনের কাছে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে পৌরসভার সচিব বলেন, “ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম না। পরে শুনেছি একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আমরা নিজেরাও বিষয়টি তদন্ত করছি। সাংবাদিক আকিবের সাথে যা হয়েছে তা কাম্য নয়।”
তবে তথ্য না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “তথ্য অধিকার আইনের নিয়ম মেনে আবেদন করলে আমরা অবশ্যই তথ্য দিই। হয়তো প্রক্রিয়াগত কিছুটা দেরি হয়েছে।”
সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা মঙ্গলবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। প্রেসক্লাব সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, “তথ্য সংগ্রহ করা সাংবাদিকের পেশাগত অধিকার। এভাবে হামলা করে কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিচ্ছি। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসক এর সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফজলুল কবির বলেন, “তথ্য অধিকার আইন থাকার পরও সাংবাদিকরা তথ্য পেতে হামলার শিকার হচ্ছেন। এটি আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
আগেও হামলার শিকার হয়েছেন আকিব
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মোসাদ্দেক আল আকিব এর আগেও পেশাগত কারণে হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন। ২০২৩ সালে চাঁদপুরে নদী দখল নিয়ে রিপোর্ট করায় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তিনি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, চাঁদপুরে গত এক বছরে সাংবাদিকদের ওপর এ নিয়ে চারটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্নীতি ও অনিয়মের রিপোর্ট করতে গিয়ে তারা বাধার মুখে পড়েন।
*তথ্য অধিকার আইন ও বাস্তবতা
তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী, নির্ধারিত ফরমে আবেদনের ২০ কার্যদিবসের মধ্যে কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য। তথ্য না দিলে বা বাধা দিলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার বিধান আছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির তথ্য অধিকার বিষয়ক সমন্বয়কারী শাহজাদা আকবর বলেন, “আইন থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ নেই। সরকারি দপ্তরগুলো এখনো তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। সাংবাদিক আকিবের ঘটনা তারই প্রমাণ।”
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতা সেই সাংবিধানিক অধিকার চর্চারই অংশ। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, এটি মুক্ত গণমাধ্যম ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর আঘাত।
মোসাদ্দেক আল আকিবের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আহত সাংবাদিকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন সবার দাবি। নয়তো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ তথ্য গোপনের সংস্কৃতিই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
প্রকাশিত : বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.















