সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকট: হোসেনপুরের ঘটনা কি কেবলই এক বিচিত্র প্রেম-কাহিনি?

সম্পাদকীয় :
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে সম্প্রতি যে অনাকাক্সিক্ষত ও অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটে গেলো, তা’ সাধারণ কোনো সংবাদের শিরোনাম হয়েই থেমে থাকার মতো বিষয় নয়। প্রবাস ফেরত বরের গাড়ি থেকে নববধূকে সাবেক প্রেমিকের ছিনতাই করার ঘটনাটি আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক চরম নৈতিক অবক্ষয়, প্রতারণা ও সামাজিক সঙ্কটের দিকেই আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। প্রথম দর্শনে এটি কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রের রোমাঞ্চকর দৃশ্য মনে হতে পারে, তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এ ঘটনার মধ্যদিয়ে প্রকাশ পেয়েছে সম্পর্কের জটিলতা, প্রবাসীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং সর্বোপরি বিয়ের মতো এক পবিত্র বন্ধনকে নিয়ে একধরণের তামাশা।

সংবাদসূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া প্রবাসী তরুণ শাহীন মিয়া প্রথাগত নিয়মে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নববধূকে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরছিলেন। কিন্তু মাঝপথে গাড়ির গতি রোধ করে তাকে ছিনতাই করে নিয়ে গেলো সৌদী প্রবাসী অপর এক তরুণ সাইফুল। পরবর্তীতে গ্রামবাসীরা তাদের আটকে রাখলে বেরিয়ে এলো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাবেক প্রেমিকের দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের প্রেমের সুবাদে তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন ঐ তরুণী। অথচ পরবর্তীতে বিদেশে থাকা প্রেমিকের সাথে সম্পর্কের ইতি না টেনে বা তাকে না জানিয়েই তিনি আর এক মালয়েশিয়া প্রবাসীকে বিয়ে করে ফেললেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েই ছিনতাইয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছিলো প্রেমিক সাইফুল। পরিণামে, নতুন জীবন শুরু করার আগেই বিয়ের মাত্র একদিনের মাথায় নববধূকে ডিভোর্স বা তালাক দিতে বাধ্য হলেন প্রবাসী শাহীন মিয়া।

এ পুরো ঘটনার মধ্যদিয়ে আমাদের সামাজিক কাঠামোর যে ভঙ্গুর রূপ ফুটে উঠলো, তা’ সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশ্ন জাগে, আমাদের যুবসমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? ভালোবাসা বা সম্পর্কের নাম দিয়ে কীভাবে একের পর এক মানুষ প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছে? একজন প্রবাসী মানুষ বছরের পর বছর বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ পাঠাচ্ছেন দেশের মানুষের বা প্রিয়জনের জন্যে। সেই উপার্জিত টাকা যখন কোনো প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়, তখন তা’ কেবল এক ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং তা’ তার বিশ্বাস ও জীবনকে তছনছ করে দেয়।

ঘটনাটির ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানে কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি। একদিকে তরুণীর বিরুদ্ধে উঠেছে অর্থনৈতিক প্রতারণা ও ভালোবাসার নামে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ। আবার অন্যদিকে প্রেমিক সাইফুল আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিয়ের গাড়ি থেকে বধূকে ছিনতাই করার মতো চরম অপরাধমূলক কাজ করলো। সে যদি প্রতারিত হয়েই থাকতো, তবে তার জন্যে আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিলো, কোনো উপযুক্ত সামাজিক সমাধানের পথ খোঁজার সুযোগ ছিলো। কিন্তু সে তা’ না করে যে পথ বেছে নিয়েছিলো, তা’ কেবল পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুললো। বর শাহীন মিয়া, যিনি হয়তো অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন একটি সুন্দর সংসার গড়ার জন্যে, তাকে বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন এক সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হতে হলো যে তিনি শেষপর্যন্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন।

এ ঘটনাটি সমাজে ছড়িয়ে থাকা একাধিক সঙ্কটকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রথমত, আমাদের গ্রামীণ সমাজে বা সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থায় প্রবাসীদের অবস্থান ও তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা। দ্বিতীয়ত, যুবসমাজের একাংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এক চরম নৈতিক শূন্যতা, যেখানে প্রতিশ্রুতি বা সম্পর্কের মূল্য অর্থের কাছে বিকিয়ে যায়। তৃতীয়ত, আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা।

আজকের সমাজে আমরা যদি চোখ মেলে তাকাই, তবে দেখতে পাবোÑ এমন ঘটনা কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের চোখে পড়ছে এমন সব ঘটনার খবর, যা’ আমাদের হতবাক করে দিচ্ছে। কখনো বিয়ের রাতে বরকে ছেড়ে কনে চলে যাচ্ছে, কখনো আবার বিয়ের আগের সম্পর্কের কারণে ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক পরিবার। এসবের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সঠিক নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার একধরণের মানসিকতা কাজ করছে।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, এটি একেবারেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়, দু’জনের অভ্যন্তরীণ লেনদেন বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন রাজপথে এসে সাধারণ মানুষের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যখন একটি বিয়ের অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায় এবং আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন তা’ আর কোনো ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। তা’ তখন সামাজিক সমস্যার রূপ নেয়।

এ ঘটনার পর এলাকাবাসী নববধূকে তার বাবার নিকট সোপর্দ করেছে এবং স্বামী তাকে ডিভোর্স দিয়েছে। এটি হয়তো আপাত দৃষ্টিতে একটি ঘটনার তাৎক্ষণিক সমাধান বা সমাপ্তি। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা কি এর থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছি? আমরা কি ভেবে দেখেছি, এ ধরনের মানসিকতা যদি ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বিয়ের মতো সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো মর্যাদা কি অবশিষ্ট থাকবে? প্রবাসীরা কি দেশে ফিরে নিশ্চিন্তে কোনো সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল আবেগ বা ক্ষোভ দিয়ে সমাজের কোনো জটিলতার সমাধান হতে পারে না। কোনো তরুণ যদি অন্য কারো কাছ থেকে কোটি বা লক্ষ টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়, তার উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত। ঠিক তেমনি, কেউ যেন নিজের ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে ছিনতাই বা সহিংসতার পথ বেছে না নেয়, সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক বোধ জাগ্রত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে যাতে সম্পর্কের পবিত্রতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বজায় থাকে।

হোসেনপুরের এ ঘটনাটি যেন আমাদের সামাজিক বিবেককে এক ঝাঁকুনি দিয়ে গেলো। আমরা যেন কেবল চটকদার সংবাদের মতো এ ঘটনাটি পড়ে ভুলে না যাই। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা উপার্জনের নিরাপত্তা, সম্পর্কের বিশ্বস্ততা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটা আমাদের সমাজের জন্যে কতোটা জরুরি, এ ঘটনাটি তারই এক মর্মান্তিক স্মারক হয়ে থাকলো। সমাজকে এ ধরণের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হলে পরিবারের অভিভাবক থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনÑ সবাইকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রবাসীকে বা অন্য কাউকেও এভাবে প্রতারণা ও সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার শিকার হতে না হয়।

প্রকাশিত :  ‍রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy