সম্পাদকীয় : স্কুল কেন তালাবদ্ধ?

সম্পাদকীয়
কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত যাত্রাপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন ‘ঝুনকার চর’। জল-হাওয়ার প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই চরের মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর একমাত্র অবলম্বন ‘খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

তবে সাম্প্রতিক এক ঘটনা চরের এই একমাত্র প্রদীপটিকেও নিভিয়ে দেওয়ার শামিল। সোমবার দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সকাল থেকে প্রাতঃরাশ সেরে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে দেখতে পায় ভবনে ঝুলছে তালা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেও কোনো শিক্ষকের দেখা মেলেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হতাশ, ক্ষুব্ধ ও ধৈর্যহারা হয়ে অবুঝ শিশুরা শ্রেণিকক্ষের দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করে এবং উচ্চকণ্ঠে নিজেদের অধিকারের জন্যে সোচ্চার হয়। একটি স্বাধীন দেশের দ্বীপাঞ্চলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এমন করুণ চিত্র দেখে আমরা চরম স্তম্ভিত ও ব্যথিত। প্রশ্ন ওঠে, যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে চরের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হওয়ার কথা ছিলো, সেটি কেন তালাবদ্ধ থাকবে?

প্রদত্ত সংবাদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৮০ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক নিয়োজিত থাকলেও শিক্ষকদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অবহেলার কারণে পাঠদান ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শিক্ষকেরা নিজেদের সুবিধামতো দিন ভাগ করে সপ্তাহে দু-এক দিন হাজিরা দিতেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন তো একেবারেই উপস্থিত হতেন না। বিদ্যালয়ে হাজিরার রেজিস্টার খাতা পর্যন্ত না থাকা এ কথা প্রমাণ করে যে, সেখানে মনিটরিং ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার কতটা চূড়ান্ত অভাব ছিলো। সোমবার বিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয়নি। তালাবদ্ধ থাকার ফলে সরকার নির্ধারিত ‘মিড ডে মিল’ থেকেও বঞ্চিত হতে হলো চরের অনাহারী শিশুদের। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই স্তরের অনিয়ম ও স্বৈরাচারী মনোভাব কেবল চরের শিশুদের শিক্ষা জীবন ধ্বংস করছে না, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় শিক্ষা অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি করছে।

চরের ভৌগোলিক অবস্থান ও এখানকার মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষাই তাদের এই দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র চাবিকাঠি। অথচ সেই একমাত্র পথটিতে যখন চরম অবহেলার তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়, তখন চরের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পরীক্ষা শুরুর আগের দিন দিকনির্দেশনা নিতে এসে চোখের জলে অবুঝ শিশুরা যখন বলে, “এভাবে অবহেলায় আমাদের পড়ালেখা আর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে”, তখন সেটি পুরো সমাজের জন্যেও এক বড় লজ্জা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষকেরা রাষ্ট্রের কাছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বেতনভোগী কর্মী। তাঁদের এই স্বেচ্ছাচারিতা কেবল চাকরিবিধির লঙ্ঘন নয়, শিশুদের মৌলিক অধিকার হরণের এক ভয়াবহ অপরাধ।

আমরা জানতে পেরেছি, ২০১৬ সালে পুরোনো প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে শুরু করে। এর আগে স্থানীয়রা ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এমনকি দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্তে এসে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো অজানা বা অদৃশ্য কারণে অপরাধী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি! কর্তৃপক্ষের এই ধরনের ঢিলেঢালা মনোভাব ও উদাসীনতার কারণেই আজ শিক্ষকেরা এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠার সাহস পেয়েছে এবং পরীক্ষার আগের দিন গোটা স্কুল তালাবদ্ধ রাখার মতো দুঃসাহস দেখালো। যদি সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজকের দিনে কোমলমতি শিশুদের দরজার তালা ভাঙার চেষ্টার মতো হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে হতো না।

সৌভাগ্যবশত, ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর জেলা প্রশাসন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দ্রুত তৎপর হয়েছেন। অভিযুক্ত সব শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক অর্ণপূর্ণা দেবনাথ কেবল এই স্কুলে নয়, বরং সমগ্র জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মনিটরিং বাড়ানোর ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, কেবল শোকজ নোটিশ বা কাগুজে নির্দেশনার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

প্রথমত, অভিযুক্ত প্রতিটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। চরের শিশুরা প্রান্তিক বা দুর্গম এলাকায় বাস করে বলে তাদের সঙ্গে এই ধরনের অবহেলা ও অন্যায় আচরণকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। যে শিক্ষকেরা চরে অবস্থান করতে বা দায়িত্ব পালন করতে অনিচ্ছুক, তাঁদের বদলে সৎ, সদিচ্ছাসম্পন্ন ও প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষকদের সেখানে পদায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মনিটরিং ব্যবস্থা আমূল সংস্কার করতে হবে। যেহেতু চরাঞ্চলগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই সেখানে আকস্মিক পরিদর্শন (ঝঁৎঢ়ৎরংব ওহংঢ়বপঃরড়হ) ও বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চরের স্থানীয় অভিভাবক, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে শক্তিশালী ‘বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি’ (ঝগঈ) গঠন করে তাঁদের হাতে নিয়মিত তদারকির ক্ষমতা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো স্থানে তদন্ত শেষে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কর্মকর্তা কেন ব্যবস্থা নেননি, সেটিরও সঠিক কৈফিয়ত তলব করা উচিত। শিক্ষা বিভাগের কোনো স্তরে যেন কোনো অদৃশ্য কারণ বা তোষামোদের সুযোগ না থাকে।

শিক্ষাই চরের শিশুদের একমাত্র মুক্তির হাতিয়ার। সেই আশার প্রদীপকে যদি কতিপয় অসাধু শিক্ষকের দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক আলস্যের কারণে নিভিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা পুরো কুড়িগ্রাম জেলা তথা সারা দেশের শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। ‘ঝুনকার চর’-এর শিশুদের চোখের জল ও দরজার তালা ভাঙার এই প্রতীকী আকুতি যেন কর্তৃপক্ষের বন্ধ কান ও চোখ খুলে দেয়। আমরা আশা করবো, প্রশাসন দ্রুততম সময়ে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করে খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। চরের কোনো স্কোলেই যেন ভবিষ্যতে আর এমন তালা ঝুলতে না দেখে আমাদের শিশুরাÑ এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর জোরালো প্রত্যাশা।

 

প্রকাশিত :  ‍শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy