শেখ হাসিনার সরকার গণমাধ্যমসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল

নিউজ ডেস্ক :

৪৩ বছর আগে বাংলাদেশের মাটিতে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। গণতন্ত্র ফেরাতে স্বৈরাচার শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে জনতার আন্দোলনে শামিল হন তিনি। স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অংশ নেওয়া সেই শেখ হাসিনাকেই কিনা গদি ছাড়তে হলো স্বৈরাচার ‘তকমা’ নিয়ে! গণতন্ত্রের জন্য জনতার কাতারে এসে দাঁড়ানো এই নেত্রী কীভাবে গণতন্ত্রকে সাজঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, এ এক বড় প্রশ্ন।

এই প্রশ্নের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে জাপানের টোকিওভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক নিবন্ধে। শনিবার (২৪ আগস্ট) প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন নিক্কেই এশিয়ার সিনিয়র স্টাফ রাইটার তরু তাকাহাশি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার গণমাধ্যমসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে জিম্মি ছিল প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়।

কিন্তু শেখ হাসিনা এই ধারায় হাঁটবেন, অনেকে কখনো তা বিশ্বাসই করতে পারেননি। এ ব্যাপারে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অরগানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইউমি মুরাইয়ামা নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন, তখন আমার কাছে মনে হয়নি তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করবেন।’

মাইউমি মুরাইয়ামা মনে করেন, ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতো আচরণ করতে শুরু করেন শেখ হাসিনা। তিনি দ্রুতই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অথচ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানের কারণেই মোটামুটি সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিলেন এই নেত্রী।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপের মধ্যেই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে নেয় শেখ হাসিনা সরকার। আর এর মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আসতে থাকে। আর শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন ‘একনায়কতন্ত্রের’ প্রতীক।

নিক্কেই এশিয়ার নিবন্ধ বলছে, বিএনপিকে দমাতে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মামলা দিয়ে কারাগারে বন্দী করা হয়। বিএনপির বহু নেতা-কর্মী মামলায় পড়ে কারাবন্দী হন। আর গুম করা হয় অনেককে। তৈরি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। তবে শুধু বিরোধী দলের উপর চড়াও হয়েই ক্ষান্ত হননি শেখ হাসিনা। তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘দেবতার মতো’ উপস্থাপন করতে থাকেন। সারা দেশে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে কেউই সরকারের কোনো সমালোচনাই করার সাহস পায়নি।

ক্ষমতার সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সেখানে সব ধরনের সুবিধায় এগিয়ে থাকতো ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বলা হয়ে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই চালাতো তারা। আর বিভিন্ন হলের সিট বরাদ্দে তাদের প্রভাব থাকত বিস্তর। তাদের দলীয় কোনো প্রোগ্রামে না গেলে হলে থাকতে দেওয়া হতো না। ছাত্ররা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামলেও তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভও ছিল।

নিজের সুবিধামতো বানানো নীতিতে ভিন্নমত পোষণকারী ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও বরখাস্ত করেছেন শেখ হাসিনা। এ তালিকায় রয়েছেন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, যিনি তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের সচিব ছিলেন এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হাসিনা তাঁর বিজ্ঞ উপদেষ্টাদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।’ শেষ পর্যন্ত, কেবল তাঁর বোন রেহানাই থেকে যান, যাকে হাসিনা বিশ্বাস করতেন বলে মনে করা হয়।

এ ব্যাপারে এক্সটারনাল ট্রেড অরগানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইউমি মুরাইয়ামা নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘ইয়েস-ম্যানরা ঘিরে ছিল শেখ হাসিনাকে। এই ইয়েস-ম্যানরা ঘিরে রাখার কারণেই মূলত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যুক্তি ও উপলব্ধি বুঝতে পারেননি হাসিনা।’ এই ইয়েস-ম্যান বলতে আসলে সহমত পোষণকারীদের বুঝিয়েছেন মুরাইয়ামা।

এই অসন্তুষ্টির মধ্যেই গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ঘুণাক্ষরেও কেউ কল্পনা করেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সত্যি হয়েছে এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে।

গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামান নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ করেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। এরপর সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতি ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়।

নিক্কেই এশিয়ার নিবন্ধে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সর্বজনগ্রাহ্য নির্দলীয় ব্যক্তি এবং তাঁর সততার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ‘গরীবের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্রঋণ ধারণার এই প্রবক্তাকে ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাবশত’ শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন হয়রানি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে হেনস্তা করেছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত করা হয় বিভিন্ন বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক ব্যাংক গভর্নর, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের দুজন প্রতিনিধিকে। তবে এই অন্তর্বর্তী সরকার কবে নাগাদ জাতীয় নির্বাচন দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নিক্কেই এশিয়ার নিবন্ধে সিনিয়র স্টাফ রাইটার তরু তাকাহাশি বলছেন, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ নাগরিক আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপিকে সমর্থন করেন। বাকিরা হয় অন্য দলকে সমর্থন দেয়, নতুবা কাউকেই সমর্থন দেয় না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন। শিগগির নির্বাচন দিলে বিএনপি হয়তো ক্ষমতায় যেতেও পারে। তাতে তারাও আওয়ামী লীগকে নির্মূলের পথেই হাঁটবে বলে মনে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘এতদিন যে দুই দলের রাজনীতি হয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিচ্ছে না। তবে যে কোনো তৃতীয় পক্ষের স্বল্প সময়ের মধ্যে উত্থান এবং জনগণকে একটি সত্যিকারের বিকল্প দল দেওয়াও কঠিন হবে।’

এক্ষেত্রে বড় একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করেন তরু তাকাহাশি। প্রশ্নটি হলো, সামরিক ও স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত এই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ কি শেখ হাসিনার একচেটিয়া শাসনামল থেকে কিছু শিখতে পারবে?

আর এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশের দিকেই। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশ জাপান রয়েছে। বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেয় দেশটি। এ ছাড়া আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাকিয়ে থাকবে ছোট্ট এই দেশের দিকে। এর বাইরে স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে যেসব দেশ চলছে, তাদের নজরও এখন বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশটির দিকে। (ইনডিপেনডেন্ট টিভি)

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০২৪

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শ্বেতীর সাদা দাগ দূর করার উপায়

You might like