আওয়ামী রোষানলে বিপন্ন সাংবাদিকতা

হেলাল উদ্দিন :

গত প্রায় ৩৮ বছর জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতায় জড়িত। কোন ধরনের বিতর্ক বা রাজনীতি আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। শতভাগ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে বারবার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের রোষানলে পড়েছি। একাধিক মিথ্যা মামলায় কারাবাস করতে হয়েছে। অন্যায়ভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। কর্মস্থল দৈনিক যুগান্তর থেকে দুইবার চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। গুম অপহরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক মামলায় আটক করে ক্রসফায়ারের চক্রান্তও ছিল। এক পর্যায়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার সহায়তায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এক সপ্তাহের জন্যে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে।

আমি জানি না আমার অপরাধ কি। আওয়ামী লীগের দলবাজ সাংবাদিক ছিলাম না। অন্যায়ের সাথে আপোষ করিনি। সততার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিবের রোষানলে পড়ার অর্থ প্রধানমন্ত্রীর রোষানলে পড়া। কিন্তু কেন? সেই হিসাব মেলাতে পারছি না। কেন আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে যমুনা গ্রুপের মত একটি শিল্পগ্রুপকে তছনছ করা হলো? যমুনা গ্রুপের ব্যবসাকে বারবার আঘাত করা হলো।

যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখে এই হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা এগিয়ে আসেন নি। উল্টো আমার এবং যমুনা গ্রুপের ওপর মুখ্যসচিবের আক্রোশ অনেক বেড়ে যায়। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় তার মুখ্য সচিব আমাকে এবং যমুনা গ্রুপকে চরম হয়রানি করেছে। কোন অপরাধ না করেও আমাকে মিথ্যা মামলায় ১৭ দিন কারাবাস করতে হয়েছে।

এরআগে তৎকালীন আইন সচিব মন্তব্য করেছিলেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আইনমন্ত্রী ছাড়া আপনাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু আমি মাথা নত করিনি। কারাগারে গিয়েছি। প্রথমে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার।কয়েকদিন পরেই কারাগার পরে ফাঁসি এবং দুর্ধর্ষ আসামিদের জন্য বরাদ্দ কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে আমাকে বন্দি রাখা হয়েছে।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে পরিচয় হয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সাথে। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী আমাকে বুকে জড়িয়ে চুমু খেয়েছিলেন। অনেক সাহস দিয়েছিলেন।

মজার অভিজ্ঞতা হচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম এবং ইমন এর সাথে পরিচয়। সুইডেন আসলাম এবং ইমন আমার সাথে দেখা করে তাদের প্রতি অবিচারের কথা জানায়। অভিযোগ করে কিছু ক্রাইম রিপোর্টারের অপপ্রচারের তারা সন্ত্রাসী হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল-সুপার ছিলেন তখন চাঁদপুরের। জেল সুপার কেন আমাকে তার বাসায় নিয়ে আপ্যায়ন করেছেন, নিজ খামারের গরুর দুধ খাওয়ালেন এ জন্যে তাকে শাস্তি দেয়া হলো। উচ্চ আদালতে আমার যাতে জামিন না হয় সব চেষ্টাই করা হলো। কিন্তু আমি ছিলাম ধৈর্যশীল। জানতাম অন্ধকারের পর আলো আসবেই। আজ সেই আলো দেখতে পাচ্ছি। স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ আমি এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছি। কারণ আমাকে যারা অন্যায় ভাবে হয়রানি করেছে তারা সবাই কারাগারে।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত সাংবাদিক হিসেবে আমি চরমভাবে নিগৃহীত হয়েছি। দলবাজি ইউনিয়নবাজি করিনি। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অপরাধ না করেও অসংখ্য মামলায় প্রতিমাসেই কয়েকবার হাজিরা দিতে হয়েছে আদালতে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন ছিলাম তখন ভিআইপি সেলে থাকা বিএনপির শীর্ষ নেতারা আমাকে সাহস দিতেন। কারাবন্দি বিডিআর জওয়ানরা আমাকে সহায়তা করতেন। কারাবন্দি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং ভাইস-চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু প্রতিদিন নিজ হাতে রুটি, আলুভাজি আর ডিম সেদ্ধ করে পাঠাতেন। যাতে নাস্তায় কোন সমস্যা না হয়। বিএনপির নেতারা ভাল কিছু রান্না হলেই আমাকে পাঠাতেন। জেল সুপার এবং জেলার তাদের বাসা থেকে খাবার পাঠাতেন। সাজা প্রাপ্ত বিডিআর সদস্যরা এ সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে।

কেরানীগঞ্জ কারাগারে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ (সাবেক সেনাপ্রধানের ছোট ভাই) আমাকে সব সময় তাঁর টেলিফোন ব্যবহার করতে দিয়েছে। খোঁজখবর নিয়েছে। আপ্যায়ন করেছে। কারণ সন্ত্রাসী জোসেফ ছিলেন চাঁদপুরের। আমাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করত।

জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বিএনপি নেতা, সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু এবং ভাবী রান্না করা খাবার নিয়ে যুগান্তরে আমার অফিসে আসলেন। খোঁজখবর নিলেন। বুলু ভাই যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এলে আমার রুমে আসতেন। তার মত মানবিক বোধসম্পন্ন উদার রাজনৈতিক নেতা আমি খুবই কম দেখেছি।

শেখ হাসিনার মূখ্য সচিব নজিবুর রহমান এবং ডিজিএফআইয়ের চাপে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমাকে দুই বার চাকুরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হন। একবার অব্যাহতি দিয়ে ৩ মাস পরই পদোন্নতি দিয়ে যুগান্তরে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর নতুন আঙ্গিকে যুগান্তর অনলাইন আমাকে দিয়ে মান উপযোগী করে যুগান্তর এসে উদ্বোধন করলেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অনলাইনের এডিটর বানালেন। এমন বিরল সৌভাগ্য ক’জন সাংবাদিকের ভাগ্যে আছে?

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সিনিয়র সাংবাদিক সরকারের রোষানলে পড়ে চাকুরি থেকে অব্যাহতি পেলেন। অথচ আওয়ামী লীগের দলবাজ সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো আমার পাশে দাঁড়ায়নি। উল্টো জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ বাতিল করেছে।

আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মরহুম নুরুল ইসলাম বাবুলের প্রতি।যিনি একজন অভিভাবক হিসেবে আমাকে বুকে আগলে রক্ষা করেছিলেন। নিজের ব্যবসায়িক ক্ষতি উপেক্ষা করে একজন সিনিয়র সাংবাদিক এর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবুল ভাই পাশে না থাকলে আজ হয়তো আমি জীবিত থাকতাম না।

মিথ্যা হয়রানীমূলক একাধিক মামলায় আমি যখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি তখন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল নিজের শেল্টারে আমাকে আশ্রয় দিলেন। নিরাপদ রাখার চেষ্টা করলেন। হয়রানি যখন চরমে তখন এগিয়ে আসলো রুপায়ন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আলী আকবর খান রতন। তিনি আমাকে বড় ভাই বলে ডাকতেন। আমাকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি রূপায়নের নিরাপদ বিশেষ শেপ হাউজে রাখলেন। আবার জেলে যখন গেলাম তখন দুই দিন পরই রূপায়নের আলী আকবর খান রতন জেলখানায় আমার সঙ্গী।

যুগান্তর থেকে চাকুরি হারানোর পর আমাকে সবাই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিল। আমাকে সার্বক্ষণিক অনুসরন করা হতো। আমি তখন ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোডে বসবাস করতাম। একদিন রাতে হাটছি। হঠাৎ একটি মাইক্রো পাশে থামলো। আমাকে অপহরন করার চেষ্টা হলো। দৌড়ে অল্পের জন্যে বেচে গেলাম। ধানমন্ডি থানায় জিডি করলাম।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটওয়ারির পরামর্শ সহায়তায় একদিনের নোটিশে আমাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। (সেই কাহিনী আগেই জানিয়েছি)।

আমি জানলাম নির্বাচনকালীন অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে শেখ হাসিনার মূখ্য সচিব বর্তমানে কারাগারে আটক নজিবুর রহমান এবং ক্ষমতাধর সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান আমাকে অপহরন, গুম বা ক্রশফায়ার দিয়ে হত্যার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি পুলিশের তৎকালীন আইজি যদি আমাকে শেল্টার না দিতেন, বিদেশ পালিয়ে যাওয়ায় সহায়তা না করতেন তাহলে হয়তো আমারও ভাগ্যে ছিল গুমঘর বা আয়না ঘর। অথবা ক্রশফায়ার। অথবা সাজানো মাদক মামলার আসামী হয়ে কারাবাস।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। শেখ হাসিনার বন্ধু, চাঁদপুর-৪ আসনে সাবেক এমপি বিতর্কিত সাংবাদিক নেতা শফিকুর রহমান আমার প্রতি চরম অবিচার করলেন। তখন তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম সিনিয়র সহ সভাপতি। নজিবুর রহমান আমাকে হলুদ সাংবাদিক বানিয়ে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং আমাকে আসামী করে রমনা থানায় অভিযোগ করলেন। এরপর শফিকুর রহমানকে ডেকে এনে চাপ দিলেন জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে যেন আমাকে বাদ দেয়া হয়। শেষ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মাওলানা শফিকুর রহমান আমার একই এলাকার, অতি পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠজন হওয়া সত্বেও মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের প্ররোচনায় অন্যায় ভাবে প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ বাতিল করলেন।

এই শফিকুর রহমান চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল হাদিস বিষয়ে (ডিগ্রী) লাভ করেন। কিন্তু তিনি মাওলানা পদবী ঘৃণা করতেন। ২০১৮ ও ২০২৪ এর বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি পুনরায় নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এক জনসভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে শফিকুর সম্পর্কে, বলেন, ‘সাংবাদিক শফিক আমার সহপাঠী ও বন্ধু। তার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। তাকে আমি ডেকে নিয়ে এই (চাঁদপুর-৪) আসন থেকে মনোনয়ন দিয়েছি।’

দলবাজ সুবিধাভোগী সাংবাদিক হিসেবে শফিকুর রহমান এমপি হয়েছেন। সৈরাচারের দোসর হিসেবে বেসরকারি সিটিজেন টেলিভিশনের মালিক হয়েছেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য হয়েছেন। সরকারি সুবিধায় বনানীর মত ভিআইপি এলাকায় প্লট বাগিয়ে দশতলা বাড়ি বানিয়েছেন।

এই শফিকুর চাঁদপুরের নির্বাচনী এলাকায় সবসময় জনবিচ্ছিন্ন থাকায় ও অপেশাদার বক্তব্যের কারণে নিজ এলাকায় বরাবরই ব্যাপক সমালোচিত। পাশাপাশি তার অনুপস্থিতিতে তার নেতাকর্মীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাদক ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করায় বহুবার তিনি দেশজুড়ে সমালোচিত হয়েছেন।

Ex Editor. Economic & Online at the Daily Jugantor. Fruits Valley Agro-এ Owner

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

You might like