

সম্পাদকীয়
কুমিল্লা নগরীতে ১৮ মামলার আসামি মহরম আলীকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং আমাদের সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসা এক ভয়ঙ্কর ব্যাধির প্রতিচ্ছবি। গতকাল প্রিয় সময়ে প্রকাশিত ‘কুমিল্লা নগরীতে ১৮ মামলার আসামিকে কুপিয়ে হত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা মমাহত হয়েছি ও ব্যথিত হয়েছি। এ হত্যাকাণ্ড আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অপরাধের দুষ্টচক্র কীভাবে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়।

নিহত মহরম আলীর বিরুদ্ধে ১৮টি মামলার রেকর্ড ছিলো, যা’ তার অপরাধ জগতের সঙ্গে গভীর সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতগুলো মামলা থাকা সত্তে¡ও কেন তাকে প্রকাশ্যে এভাবে চলাফেরা করতে দেখা গেলো? কেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে বারবার বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হলো? এ হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, সমাজে যখন অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আইন ও জননিরাপত্তার প্রতি তাদের ভয় কমতে থাকে। ফলস্বরূপ, তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং সহিংসতা এক সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়।
এ ঘটনার পেছনে ‘পূর্ব শক্রতার জেরে’র যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা’ এক পুরনো ও পরিচিত চিত্র। অপরাধ জগতের ভেতরের কোন্দল প্রায়শই এরকম নির্মম হত্যাকাÐের জন্ম দেয়। কিন্তু এ কোন্দল কেবল অপরাধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। নিরপরাধ মানুষ জিম্মি হয়, জনসমক্ষে আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং পুরো সমাজ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মহরমের হত্যাকাণ্ড কেবল তার জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং তার অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রী ও দুই নাবালক সন্তানের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে দিয়েছে। একটি হত্যাকাÐের ফলে যে একটি পরিবার ভেঙে যায় এবং নতুন প্রজন্মের ওপর যে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা’ আমরা প্রায়শই উপেক্ষা করি।
এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শুধুমাত্র ঘটনার পর অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চালালেই হবে না। আমাদের আরো গভীরে যেতে হবে। যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই অপরাধীদের জন্ম দিচ্ছে এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, সেই মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে।
পাশাপাশি, সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি। যখন আইনের প্রতি সম্মান এবং জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়, তখন এমন সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। মহরমের হত্যাকাÐ একটি সতর্কবার্তা। এ বার্তা আমাদের সবাইকে শুনতে হবে এবং অপরাধের এই চক্র ভাঙার জন্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। না হলে, আজকের মহরমের জায়গায়, কাল অন্য কেউ হবে এবং অপরাধের এ বিষাক্ত সংস্কৃতি আমাদের পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলবে।
শেয়ার করুন







