সম্পাদকীয়: সাংবাদিকের রক্তে তথ্যের অধিকার কতদূর নিরাপদ

চাঁদপুর পৌরসভা কার্যালয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিবের ওপর যে নৃশংস হামলা হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়। এটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এবং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—জনগণের জানার অধিকারের ওপর সরাসরি হামলা।

ঘটনার সারকথা
সোমবার সকাল ১১টায় আকিব ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার ড্রেন প্রকল্পের অনিয়মের তথ্য চাইতে পৌরসভায় যান। তথ্য অধিকার আইনে লিখিত আবেদনও জমা দেন। জবাবে তিনি পেলেন কিল-ঘুষি, ভাঙা মোবাইল, মাথায় আঘাত আর ডান হাতের ফ্র্যাকচার। এখন তিনি ঢাকায় ৭২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে। এ ব্যাপারে হামলার শিকার সাংবাদিক আকিব বলেন, ‘মূলত আমাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিলো, সেখানে আমারই সহকর্মী যাদের সাথে আমি কাজ করি, তারাই প্রথমে আমার উপর হামলা করে, আমার মাথায় আঘাত করে, কিলঘুশি মেরে রক্তাক্ত করে দেয়।’

হামলাকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পৌর প্রশাসক ফোন ধরেন না, সচিব বলেন ‘প্রক্রিয়াগত দেরি’। অথচ আইন বলছে ২০ কার্যদিবসে তথ্য দিতে হবে।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, প্যাটার্ন
আকিব আগেও ২০২৩ সালে নদী দখল নিয়ে রিপোর্ট করে প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। চাঁদপুরেই গত এক বছরে সাংবাদিকের ওপর চারটি হামলা হয়েছে। প্রতিবারই অভিযোগের তীর দুর্নীতি ও অনিয়মের রিপোর্টের দিকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ঠিকই বলেছে—আইন আছে, প্রয়োগ নেই। সরকারি দপ্তরগুলো এখনো ‘তথ্য দেওয়া’কে অনুগ্রহ মনে করে, নাগরিকের অধিকার নয়।

তিনটি প্রশ্ন যা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না

১. দালালচক্র কারা, কার স্বার্থে কাজ করে?
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হামলায় ‘কথিত দালাল সাংবাদিকসহ একটি গোষ্ঠী’ জড়িত। পৌরসভার একজন কর্মচারী স্বীকার করেছেন—‘স্যাররা বিরক্ত হয়েছিলেন’। প্রশ্ন হলো, প্রকল্পের ফাইল চাইলে কর্মকর্তা বিরক্ত হন কেন? ফাইল জনগণের টাকার হিসাব। সেখানে গোপনীয়তা কীসের? দালালচক্রের সাহসের উৎস কোথায়, তা খুঁজে বের না করলে আকিবরা মার খেতেই থাকবেন।

২. সিসিটিভি ফুটেজ তিন দিনেও পুলিশ পায়নি কেন?
ওসি বলছেন ‘চিঠি দেওয়া হয়েছে’। একটি সরকারি ভবনে সাংবাদিক পেটানো হলো, অথচ ফুটেজ উদ্ধারে ৭২ ঘণ্টাও যথেষ্ট নয়? এই ঢিলেমি প্রমাণ করে প্রভাবশালী মহলকে সময় দেওয়া হচ্ছে আলামত নষ্ট করার। দ্রুত ফুটেজ প্রকাশ ও আসামি গ্রেপ্তার না হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

৩. তথ্য অধিকার আইন কি শুধু কাগজে থাকবে?
আইন অনুযায়ী তথ্য না দিলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা যায়। কিন্তু তথ্য চাইতে গিয়ে যদি হাসপাতালের বিছানায় যেতে হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিক আবেদন করবে কোন সাহসে? আইনকে ‘দন্তহীন বাঘ’ বানিয়ে রাখার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

আমাদের অবস্থান

– অবিলম্বে গ্রেপ্তার: সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে হবে। ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামির গল্প আর চলবে না।

– বিভাগীয় তদন্ত: জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে ড্রেন প্রকল্পের অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। আকিব যে ফাইল চেয়েছিলেন, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।

– প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা: প্রতিটি সরকারি দপ্তরে ‘তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা’র নাম-মোবাইল দৃশ্যমান স্থানে টাঙাতে হবে। তথ্য চাইতে গিয়ে হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানকে দায়ী করার বিধান কার্যকর করতে হবে।

– সাংবাদিক সুরক্ষা আইন: পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা হলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রেখে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন পাস জরুরি।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগানের সঙ্গে ‘তথ্য গোপনের সংস্কৃতি’ একসাথে চলতে পারে না। একজন আকিবের মাথা ফাটলে হাজারো নাগরিকের প্রশ্ন করার সাহস ফেটে যায়। রাষ্ট্র যদি এখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তবে কাল অন্য কোনো পৌরসভা, অন্য কোনো অফিসে আরেকজন আকিবকে রক্তাক্ত হতে হবে।

তথ্যের অধিকার মানে উন্নয়নের জবাবদিহি। এই জবাবদিহি বন্ধ করতে লাঠি যাদের হাতে উঠেছে, আইনের হাত তাদের চেয়ে লম্বা—এটাই এখন প্রমাণের সময়।

চাঁদপুরের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিল: গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনে থাকে না, ফাইলের পাতায় পাতায় থাকে। সে পাতা খুলতে গিয়ে সাংবাদিকের রক্ত ঝরলে, বুঝতে হবে অন্ধকারটা অনেক গভীরে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy