সম্পাদকীয়: তনু হত্যার দশ বছর, বিচারের দশ ফোঁড়

একটি হত্যাকাণ্ড, একটি ধর্ষণ, একটি রাষ্ট্রের বিবেক। ২০ মার্চ ২০১৬, কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর পড়ে ছিল সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাসের ছাত্রী, থিয়েটারকর্মী, টিউশনি করে সংসারে সাহায্য করা ১৯ বছরের তনু সেদিন সন্ধ্যায় টিউশনি থেকে আর বাড়ি ফেরেনি। তারপর পেরিয়ে গেছে এক দশক। ২০২৬ সালের ২০ মার্চ তনু হত্যার ১০ বছর পূর্ণ হলো। এই দশ বছরে ৭৮টি তারিখ পার হয়েছে, চারটি সংস্থার ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তার নেই, চার্জশিট নেই, বিচার শুরু হয়নি।

প্রশ্নটা তাই অনিবার্য: কেন একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ, একটি প্রশাসন দশ বছরেও তনুর খুনিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারল না? উত্তরটা এক শব্দে দেওয়া যায় না। উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, ক্ষমতার অদৃশ্য হাত, তদন্তের ইচ্ছাকৃত শৈথিল্য আর আমাদের সম্মিলিত ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিতে।

১. স্থানই যখন সাক্ষ্য লোপাটের সনদ

তনুর লাশ পাওয়া গিয়েছিল কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে। একটি সুরক্ষিত, নিয়ন্ত্রিত, সিসিটিভি-চৌকিতে ঘেরা এলাকা। যুক্তির সাধারণ নিয়ম বলে, এমন জায়গায় অপরাধ হলে অপরাধী ধরা পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণ প্রবেশ-প্রস্থান রেকর্ড থাকে, মানুষ চিহ্নিত থাকে, আলামত সংরক্ষণ সহজ হয়। অথচ তনুর বেলায় ঘটল উল্টো।

ঘটনাস্থল সেনানিবাস হওয়ায় সাধারণ পুলিশের স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার ছিল না। প্রথম ১০ দিন স্থানীয় থানা পুলিশ, তারপর ডিবি, তারপর ২০১৬ সালের পহেলা এপ্রিল মামলা গেল সিআইডির কাছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তদন্ত করছে পিবিআই। প্রতিটি হস্তান্তর মানে সময়ক্ষেপণ, ফাইল-নথি বুঝে নেওয়ার অজুহাত, আলামতের চেইন অব কাস্টডি নষ্ট হওয়া। দশ বছরে ছয়জন আইও বদল মানে ছয়বার শূন্য থেকে শুরু।

এই ‘এখতিয়ার-জটিলতা’ কি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা? নাকি ইচ্ছাকৃত? সেনানিবাসের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় তদন্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিভিল-মিলিটারি যৌথ টাস্কফোর্স হতে পারত প্রথম দিনেই। তা না হয়ে বারবার সংস্থা বদল তদন্তকে পেছনেই ঠেলেছে।

২. ময়নাতদন্ত: বিজ্ঞান যখন বিভ্রান্তি তৈরি করে

প্রথম ময়নাতদন্ত হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। রিপোর্ট এলো ৪ এপ্রিল ২০১৬: ধর্ষণ বা হত্যার আলামত পাওয়া যায়নি। অথচ লাশের গলায় আঘাতের চিহ্ন, মাথার পেছনে থেঁতলানো দাগের কথা প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার শুরু থেকেই বলছিল। দেশজুড়ে বিক্ষোভের মুখে আদালত দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। কুমিল্লা মেডিকেলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত মিলল।

প্রশ্ন জাগে, একই লাশ, দুই রিপোর্ট কেন? প্রথম রিপোর্ট কি তাড়াহুড়োর ফল, নাকি চাপের? ফরেনসিক রিপোর্টে গরমিল একটি মামলাকে শুরু থেকেই দুর্বল করে দেয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে এই বৈপরীত্য তুলে মামলা খারিজের সুযোগ পায়।

এরপর সিআইডি তনুর অন্তর্বাসে তিনজন পুরুষের বীর্যের অস্তিত্ব পায়। ডিএনএ প্রোফাইলও তৈরি হয়। কিন্তু দশ বছরেও সেই ডিএনএ কোনো সন্দেহভাজনের সঙ্গে মেলানো যায়নি। সেনানিবাসের ভেতরে বসবাসকারী ও কর্মরত সকল পুরুষের ডিএনএ নমুনা নিয়ে ক্রস-ম্যাচিং করাটা ছিল রুটিন কাজ। সেটা হয়নি। কেন? প্রযুক্তির অভাব? না, ২০১৬ সালেই সিআইডির নিজস্ব ল্যাব ডিএনএ শনাক্ত করেছে। তাহলে বাধা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরই ‘ধামাচাপা’ শব্দের ব্যাখ্যা।

৩. প্রভাবশালী মহলের ছায়া ও তদন্তের শীতলতা

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ছিলেন। মেয়ে হত্যার পর তিনি চাকরি হারান, পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘দেশে সকল হত্যার বিচার হলেও আমার তনুর কেন বিচার হবে না?’। তাঁর কণ্ঠে যে হতাশা, সেটা লাখো মানুষের।

তিনজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে, অথচ দশ বছরে সন্দেহভাজনের তালিকাই হয়নি। সেনানিবাসের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ, গেট রেজিস্টার, সেদিন ডিউটিতে থাকা সেন্ট্রি-পেট্রোলের তালিকা প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত কর্মকর্তারা বারবার আদালতে সময় চেয়েছেন, কিন্তু ‘অগ্রগতি প্রতিবেদন’ মানে কাগজে লেখা হয় ‘তদন্ত চলমান’।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই শীতলতা কি ভয়? বাংলাদেশে সেনানিবাস-কেন্দ্রিক কোনো অপরাধের তদন্তে সিভিল প্রশাসন বরাবরই অস্বস্তিতে ভোগে। ‘উপরের নির্দেশ’ ছাড়া আগায় না। ফলে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি’ রক্ষার নামে ব্যক্তির অপরাধকে আড়াল করার সংস্কৃতি তৈরি হয়। তনু মামলা তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ।

৪. রাজনৈতিক ব্যবহার ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা

তনু হত্যার পরপরই এটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। শাহবাগ, প্রেসক্লাব, কুমিল্লা—সবখানে আন্দোলন। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা কমতেই মামলার ফাইলও চাপা পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো তনুকে ‘ইস্যু’ হিসেবে ব্যবহার করেছে, ‘বিচার’ হিসেবে নয়। তনুর বাবা নিজেই বলেছেন, লন্ডনে থাকার সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিচার করবেন বলেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবায়ন নেই।

বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে সব সরকারেরই দায় আছে। তদন্ত সংস্থা স্বাধীন না হলে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে, আলোচিত মামলাও ৭৮ তারিখ পেরোয়, কিন্তু সাক্ষী ডাকা হয় না।

৫. সমাজের দায়: আমরা কতদিন মনে রাখি?

প্রথম দুই বছর গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তনুকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তারপর একে একে নতুন ইস্যু এসেছে—আবরার, নুসরাত, মুনিয়া। প্রতিটি মামলার পর আমরা রাস্তায় নেমেছি, হ্যাশট্যাগ দিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি। বিচার বিভাগ ও পুলিশের ওপর নাগরিক নজরদারি না থাকলে ফাইল চাপা পড়বেই। তনুর মা আনোয়ারা বেগম দশ বছর ধরে একা লড়ছেন। রাষ্ট্র তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি, সমাজও না।

৬. ধামাচাপা পড়ার মেকানিজম: একটি পাঠ

তনু মামলা আমাদের শেখায়, বাংলাদেশে স্পর্শকাতর স্থানে সংঘটিত অপরাধ কীভাবে ধামাচাপা পড়ে:

প্রথম ধাপ: সময়ক্ষেপণ। সংস্থা বদল, আইও বদল, তারিখের পর তারিখ। জনস্মৃতি দুর্বল হয়ে আসে।

দ্বিতীয় ধাপ: আলামত বিতর্কিত করা। পরস্পরবিরোধী ময়নাতদন্ত, ডিএনএ থাকার পরও ম্যাচিং না করা। আদালতে গেলে মামলা দুর্বল হয়ে যায়।

তৃতীয় ধাপ: ভিকটিমকে বিচ্ছিন্ন করা। পরিবারকে অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা, যাতে তারা লড়াই চালাতে না পারে। ইয়ার হোসেন বলেছেন, অবসর নিয়েছেন, আর পারছেন না।

চতুর্থ ধাপ: ‘প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি’র দোহাই। ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নিতে চায় না, তাই তদন্তই থামিয়ে দেয়।

৭. পথ কোথায়? ধামাচাপা থেকে আলোয় ফেরা

১. বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন: পুলিশ-পিবিআই-সিআইডি ঘুরে যখন দশ বছর কেটেছে, তখন উচ্চ আদালতের তত্ত্বাবধানে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন সময়ের দাবি। কমিশনকে সেনানিবাসের সব রেকর্ড, সিসিটিভি, ডিএনএ ডাটাবেজে নিরঙ্কুশ অ্যাক্সেস দিতে হবে।

২. ডিএনএ ব্যাংক ম্যাচিং: সেনানিবাসে অবস্থানরত সকল সদস্যের ডিএনএ বাধ্যতামূলক ম্যাচিং। ‘তিনজনের ডিএনএ’ কার, সেটা বের করা এখন প্রযুক্তিগতভাবে ৭২ ঘণ্টার কাজ।

৩. টাইমফ্রেম বেঁধে দেওয়া: আদালত ৬ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির তারিখ দিয়েছেন। এই তারিখে তদন্ত কর্মকর্তাকে চার্জশিট অথবা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করতে হবে। ‘তদন্ত চলমান’ বলে আর সময় নেওয়া যাবে না।

৪. সাক্ষী সুরক্ষা আইনের প্রয়োগ: যারা মুখ খুলতে চায়, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেনানিবাসের ভেতরে অনেকেই সেদিন কিছু দেখেছে। ভয় না কাটলে তারা বলবে না।

৫. সংসদীয় জবাবদিহি: স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়কে প্রতি তিন মাসে সংসদে তনু মামলার অগ্রগতি জানাতে হবে। রাজনৈতিক দায় তৈরি না হলে প্রশাসন নড়ে না।

তনুর বাবা বলেছেন, ‘এক মাসের মধ্যে বিচার না পাইলে আমি আত্মহত্যা করব’। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে এমন উচ্চারণে ঠেলে দিতে পারে না। তনু হত্যার বিচার না হওয়া মানে প্রতিটি মেয়েকে বার্তা দেওয়া: তুমি যেখানেই থাকো, রাষ্ট্র তোমাকে নিরাপত্তা দেবে না; অপরাধী যদি ‘প্রভাবশালী’ হয়, তুমি বিচার পাবে না।

দশ বছর অনেক সময়। আলামত নষ্ট হয়, সাক্ষী মরে যায়, পরিবার নিঃস্ব হয়। কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি মরে না। তনু মামলা ধামাচাপা পড়েছে কারণ আমরা—রাষ্ট্র, প্রশাসন, সমাজ—সবাই চোখ বন্ধ রেখেছি। চোখ খোলার সময় এখনই। ৬ এপ্রিল আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা হাজির হবেন। সেদিন যেন আরেকটা তারিখ না হয়। সেদিন যেন শুরু হয় বিচার। কারণ তনুর কবরে আমরা শুধু একটি মেয়েকে দাফন করিনি, দাফন করেছি আমাদের সম্মিলিত বিবেক। বিবেকের পুনরুত্থানই হবে তনুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মাপকাঠি হলো, সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে কতটা সুরক্ষা দেয়। তনুকে আমরা সুরক্ষা দিতে পারিনি। অন্তত বিচারটুকু দিই। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

প্রকাশিত :  বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy