

সম্পাদকীয়:
ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি—পাড়া-মহল্লার যে কোনো অপরাধের খবরে এখন সবার আগে উঠে আসে ‘কিশোর গ্যাং’-এর নাম। যাদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, স্কুলের ব্যাগ, তারাই এখন চাপাতি, পিস্তল আর মাদকের নেশায় ডুবে ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, শুধু রাজধানীতেই সক্রিয় ১১৮টি কিশোর গ্যাং। সারাদেশে এই সংখ্যা ২৩৭, সদস্য সংখ্যা অন্তত ৫০ হাজার। পরিসংখ্যানটি উদ্বেগের, কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ হলো—এই গ্যাংগুলো আর ‘কিশোর দুষ্টুমি’র মধ্যে নেই। এরা এখন খুন করছে, কবজি কাটছে, গুলিও চালাচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে।

অপরাধের নতুন চেহারা, পুরোনো পৃষ্ঠপোষক
মোহাম্মদপুরে ‘এলেক্স ইমন’কে কুপিয়ে হত্যা কিংবা শেরপুরের নকলায় সজীব মিয়াকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা—দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, কিশোর গ্যাং এখন প্রাণঘাতী। আরও ভয়ের বিষয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো গ্যাংগুলোই নতুন নামে, নতুন নেতৃত্বে ফিরে এসেছে। দল বদলেছে, নেতা বদলেছে, কিন্তু অপরাধের ধরন বদলায়নি। বরং আইনশৃঙ্খলার সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে নতুন নতুন গ্যাং গজিয়ে উঠেছে।
এই কিশোরদের পেছনে কারা? পুলিশ-র্যাবের তথ্য স্পষ্ট: এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরাই এদের ব্যবহার করছে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রতিপক্ষ দমনে। কিশোরদের ‘রক্ত গরম’, মাদকের সহজলভ্যতা আর ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে একেকটি চলন্ত বোমা।
শুধু গ্রেফতার সমাধান নয়
গত এক বছরে শুধু মোহাম্মদপুরেই তিন হাজারের বেশি গ্রেফতার হয়েছে। তবু অপরাধ থামছে না। কারণ জামিনে বেরিয়ে এরা আবারও পুরোনো চক্রে ফিরছে। ঢাকায় অপরাধে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর—এই তথ্য প্রমাণ করে, আমরা একটি প্রজন্মকে হারাতে বসেছি।
এখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি, তবে সেটাই শেষ কথা নয়। কিশোর অপরাধ দমনে ‘শাস্তি’র চেয়ে ‘সংশোধন’ বেশি দরকার। গ্রেফতারের পর এদের পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ না দিলে এরা আবারও অন্ধকারে ফিরবে। একই সঙ্গে গডফাদারদের ধরতে হবে। লাঠির আগা কাটলে হবে না, গোড়ায় হাত দিতে হবে। যে রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, তাকে আইনের আওতায় না আনলে গ্যাং কালচার বন্ধ হবে না।
পরিবার ও সমাজের দায়
পুলিশ, র্যাব একা এই সংকট সামলাতে পারবে না। সমাজবিজ্ঞানীরা ঠিকই বলছেন—সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে, তা জানার পাশাপাশি তাকে সময় দেওয়া জরুরি। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন শিথিল হলেই সে বাইরের ‘ভাই’, ‘বড় ভাই’-এর কাছে আশ্রয় খোঁজে। সেই ভাই-ই তাকে চাপাতি ধরিয়ে দেয়।
স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসা, খেলার মাঠ—সবখানে কিশোরদের যুক্ত রাখতে হবে। মাদকের সহজলভ্যতা কমাতে হবে, অনলাইনে সহিংস কনটেন্টের লাগাম টানতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম—সবাইকে নিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে।
এখনই রুখতে হবে
কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সংগঠিত সামাজিক ব্যাধি। আজ যারা ‘কবজি কাটা গ্রুপ’, ‘লও ঠেলা গ্রুপ’ নামে পরিচিত, কাল তারাই হবে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। ১৪-২০ বছর বয়সী ৫০ হাজার তরুণ যদি অপরাধের পথে থাকে, তবে আগামী ১০ বছরে আমাদের সমাজের চেহারা কী হবে—তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।
তাই প্রিয় সময়-এর পক্ষ থেকে আমাদের স্পষ্ট দাবি:
1. গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন ঢাল না হয়।
2. কিশোর অপরাধীদের জন্য বিশেষ সংশোধন ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করতে হবে। শুধু কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র নয়, সেখানে দক্ষতা উন্নয়ন ও মানসিক কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
3. মাদকের সরবরাহ চেইন ভাঙতে হবে। মাদকমুক্ত না হলে কিশোরমুক্ত সমাজ সম্ভব নয়।
4. স্থানীয় পর্যায়ে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ জোরদার করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে শিক্ষক, অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা হোক।
কিশোররা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে চাপাতি নয়, আমরা কলম দেখতে চাই। খেলার মাঠে দেখতে চাই, গ্যাংয়ের মহড়ায় নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—তিন পক্ষ একসঙ্গে কাজ না করলে এই বিষফোঁড়া একদিন পুরো সমাজকেই পঙ্গু করে দেবে। সময় এখনই—কিশোরদের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানোর।
—সম্পাদক, প্রিয় সময়।
প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.









