

সম্পাদকীয়
জেলা প্রশাসক সম্মেলনে দেওয়া একটি ঘোষণা বাংলাদেশের পরিবেশ, কৃষি ও নির্মাণ খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—সরকারি সকল উন্নয়ন ও নির্মাণ কাজে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল কেটে ইটভাটায় ব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নীতি পরিবর্তন নয়, বরং আগামী প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নে একটি সাহসী পদক্ষেপ।

দীর্ঘদিন ধরে আমরা উন্নয়নের নামে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরে আসছি। দেশের জিডিপির ১৩ শতাংশের বেশি আসে কৃষি থেকে, আর মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও কৃষিনির্ভর। অথচ প্রতি বছর গড়ে ৬৯ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এর বড় একটি অংশ যাচ্ছে ইটভাটার পেটে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৭ হাজারের বেশি ইটভাটা আছে, যার ৬০ শতাংশই অবৈধ। এসব ভাটায় বছরে পোড়ানো হয় ৩৫০ কোটি ঘনফুট টপসয়েল। এক ইঞ্চি টপসয়েল তৈরি হতে প্রকৃতির সময় লাগে ৫০০ থেকে ১০০০ বছর। আমরা সেই সম্পদ ১০ দিনে পুড়িয়ে ইট বানাচ্ছি।
১. টপসয়েল: জাতীয় সম্পদের সংজ্ঞা নতুন করে লেখা হলো
প্রধানমন্ত্রী টপসয়েলকে ‘অমূল্য জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রীয় দর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছেন। এতদিন ‘মাটি’ ছিল সহজলভ্য কাঁচামাল। এখন রাষ্ট্র বলছে—এই মাটির মালিক কেবল জমির মালিক নন, পুরো জাতি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ইট প্রস্তুত ও নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩-এর প্রয়োগে আমূল পরিবর্তন আসবে। আইনে টপসয়েল কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা মানা হতো না। কারণ বিকল্প ছিল না, তদারকি ছিল না, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এবার প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জেলা প্রশাসকদের জবাবদিহির আওতায় এনেছেন। অর্থাৎ ‘দেখেও না দেখার’ সুযোগ বন্ধ।
২. কংক্রিট ব্লক বাধ্যতামূলক: উৎসাহ থেকে আইনি বাধ্যবাধকতায় উত্তর
এর আগেও বিভিন্ন সময় পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে ‘উৎসাহ’ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে ‘উৎসাহ’ দিয়ে অভ্যাস বদলায় না। কারণ প্রচলিত ইট সস্তা, সহজলভ্য, মিস্ত্রিরা এতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে ব্লকের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ক্রয়াদেশ না পেয়ে লোকসানে বন্ধ হয়ে গেছে। এবারের ঘোষণাটি গেম-চেঞ্জার, কারণ সরকারই দেশের সবচেয়ে বড় নির্মাতা। এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর মিলে বছরে প্রায় ১.২ লাখ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ করে। এই বাজারের ১০০ শতাংশ যদি ব্লকের জন্য উন্মুক্ত হয়, তবে রাতারাতি ৫০০-এর বেশি ব্লক কারখানা অর্থনৈতিকভাবে সচল হবে। স্কেল অব ইকোনমির কারণে ব্লকের দামও কমবে। গবেষণা বলছে, কংক্রিট হলো ব্লকে নির্মাণ ব্যয় ১৫% পর্যন্ত কম এবং সময় বাঁচে ২০%। দেয়ালের ওজন কম হওয়ায় ভিত্তি খরচও কমে।
৩. পরিবেশগত লভ্যাংশ: দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ
ইটভাটা বাংলাদেশের বায়ুদূষণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। শীতকালে ঢাকার বায়ুমানের ৫৮% অবনতির জন্য দায়ী ভাটার কালো ধোঁয়া। একটি সাধারণ ভাটা বছরে ৩০-৪০০ টন কয়লা পোড়ায়। কংক্রিট ব্লকে মাটি পোড়ানোর দরকার নেই, কয়লার ব্যবহারও নেই। ফলে PM2.5, সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন নিঃসরণ কমবে। দ্বিতীয় ফ্রন্ট হলো কৃষি। টপসয়েল হারালে জমির উৎপাদন ক্ষমতা ৫০% পর্যন্ত কমে যায়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশের ৪০ বিঘা জমি পুড়ে যাওয়ার যে খবর আমরা গত সপ্তাহে পেয়েছি, সেটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার কৃষক এভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন। ব্লকের ব্যবহার বাড়লে টপসয়েলের চাহিদা শূন্যের কোঠায় নামবে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি মজবুত হবে।
৪. বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: ঘোষণা থেকে মাঠের দূরত্ব
ঘোষণা যতটা সাহসী, বাস্তবায়ন ততটাই জটিল। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অবৈধ ভাটার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। অনেক ভাটার মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী। জেলা প্রশাসকদের নিয়মিত অভিযান চালাতে গিয়ে তাদের বাধার মুখে পড়তে হবে। এজন্য প্রশাসনকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো ব্লকের মান নিয়ন্ত্রণ। বাজারে এখনই নিম্নমানের ব্লক আছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দ্রুত ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ফর কংক্রিট ব্লক’ হালনাগাদ করে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো মিস্ত্রি ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ। ইটের গাঁথুনি আর ব্লকের গাঁথুনি এক নয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও এলজিইডিকে যৌথভাবে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
৫. জবাবদিহির নতুন কাঠামো: ডিসি সম্মেলনের তাৎপর্য
প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশ জেলা প্রশাসক সম্মেলনে দিয়েছেন—এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ডিসি সম্মেলন মানে মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ ফোরাম। এখানে দেওয়া নির্দেশ মানে ‘ফাইল চালাচালি’র সুযোগ নেই। প্রতিটি জেলায় এখন KPI হবে: কতটি অবৈধ ভাটা বন্ধ হলো, কত ঘনফুট টপসয়েল রক্ষা পেল, সরকারি প্রকল্পে কত শতাংশ ব্লক ব্যবহৃত হলো। এই ডেটা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাবে। ফলে ‘সাইলো’ ভেঙে সমন্বিত অ্যাকশন সম্ভব। একই সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় মনিটরিং সেল গঠন করা জরুরি।
৬. অর্থনীতির নতুন খাত: সবুজ কর্মসংস্থান
একটি ইটভাটায় গড়ে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করে, কিন্তু কাজটি মৌসুমি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে একটি অটোমেটেড ব্লক কারখানায় ৪০-৫০ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়, বেতনও বেশি। ৫০০ নতুন কারখানা মানে সরাসরি ২৫ হাজার সবুজ চাকরি। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বালু, সিমেন্ট, পাথরকুচির সাপ্লাই চেইন, পরিবহন ও নির্মাণ খাতের দক্ষ শ্রমিক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশে গ্রিন বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালসের বাজার ২০৩০ সাল নাগাদ ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। আজকের এই সিদ্ধান্ত আমাদের সেই বাজারের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দিল।
৭. নাগরিকের করণীয়: নজরদারিই শেষ কথা
সরকারি প্রকল্পে ব্লক ব্যবহার হচ্ছে কি না, এলাকার কোনো ভাটা রাতের আঁধারে টপসয়েল কাটছে কি না—এই তথ্য সবার আগে স্থানীয় মানুষের কাছে থাকে। ৩৩৩ নম্বরে কল করে, পরিবেশ অধিদপ্তরের হটলাইনে বা ‘ডিসি অফিস’ ফেসবুক পেজে ছবি-সহ অভিযোগ জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমকে ‘ওয়াচডগ’ ভূমিকায় আরও সক্রিয় হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আইন তখনই শক্তিশালী, যখন জনগণ তার পাহারাদার হয়।
উন্নয়ন ও পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পুরনো বিতর্ক থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে চাইছে। কংক্রিট ব্লক বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব—শুধু দরকার নীতির স্পষ্টতা ও প্রয়োগের কঠোরতা। টপসয়েল রক্ষার এই যুদ্ধে জিততে না পারলে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন আটকে যাবে আমদানি করা চালের বস্তায়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা তাই শুধু প্রশংসার দাবিদার নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাশ করলে কৃষক বাঁচবে, নদী বাঁচবে, বাতাস বাঁচবে। আর এই তিনটি বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশ।
এখন দরকার তিনটি ‘নি’: নিয়মিত তদারকি, নির্মোহ প্রয়োগ এবং নিরপেক্ষ জবাবদিহি। ঘোষণা থেকে প্রজ্ঞাপন, প্রজ্ঞাপন থেকে মাঠ—এই যাত্রাটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই ২৫ বছর পর আমাদের সন্তানরা বলবে, ‘২০২৬ সালে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই দেশের মাটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল’।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ খ্রি.











