

মূল : জন পার্কিন্স
অনুবাদ ও সম্পাদনা : জালাল কবির, টরন্টো, কানাডা
অধ্যায়-৫
আত্মা-বিক্রি

আমাদের এগারো সদস্যের টিম জাকার্তায় ছয়দিন কাটিয়েছে। আমেরিকার দুতাবাসে রেজিষ্ট্রিকরন, বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক, নিজেদেরকে গুছিয়ে নেয়া, এবং সুইমিঙ পুলের চারপাশে বিশ্রাম। হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টালে আমেরিকান-অতিথিদের সংখ্যা আমাকে বিষ্মিত করেছে। সুন্দরী সব তরুনী, আমেরিকার তেল এবং নির্মান-কোম্পানীর প্রশাসকদের স্ত্রীদের দেখে আমি খুবই আনন্দ পেয়েছি। তারা সুইমিঙ পুলে দিনের অধিকাংশ সময় কাটায়। বিকেল-সন্ধ্যা তারা হোটেল এবং এর চারপাশের অর্ধ ডজন ফিটফাট রেষ্টুরেন্টে অবস্থান করে।
তারপর চার্লি আমাদের টিমকে পাহাড়ী শহর বান্দুং এ স্থানান্তরিত করল। আবহাওয়া মাঝারি। দারিদ্র্য কম দেখা যায়। চিত্তবিক্ষেপ আরও কম। আমাদেরকে একটি সরকারি অতিথিশালায় রাখা হল, নাম ইউসমা। এখানে আছে একজন ম্যানেজার, একজন পাচক, একটি মালি, এবং এক দল চাকরবাকর। ডাচ-উপনিবেশের সময়ে তৈরি ইউসমা একটি স্বর্গ। এর প্রশস্ত বারান্দা, চা বাগানের মুখোমুখি। বিস্তীর্ন ঢেউ খেলানো পাহাড়ের পাদদেশে জাভার আগ্নেয়গিরির ঢালুতে তাদের অবস্থান। বাসস্থান ছাড়াও উঁচু-নিচু রাস্তায় চলার জন্য আমাদেরকে এগারোটি টয়োটা গাড়ি দেয়া হল। প্রতিটির একটি করে ড্রাইভার ও দোভাষী আছে। সবশেষে, আমাদেরকে বিশিষ্ট বান্দুং গলফ এবং র্যাকেট ক্লাবের সদস্যপদ দেয়া হল। স্থানীয় পেরুসাহান উমুম ডিস্ট্রিক নেগারার (চখঘ) সদর দফতরে আমাদের অফিস এবং সুইট। সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থাও হল। পিএলএন সরকারি মালিকানায় আছে বিদ্যুত জনসংযোগ (পাবলিক-সার্ভিস)।
বান্দুংএ প্রথম কয়েক দিন আমি চার্লি এবং হাওয়ার্ড পার্কার এর সাথে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। অবসরপ্রাপ্ত হাওয়ার্ড এর বয়েস ৭০ বা তার বেশি। সে নিউ ইংলন্ড ইলেক্ট্রিক সিস্টেমের বৈদ্যুতিক বর্তণীতে বিদ্যুতের পরিমান সংক্রান্ত প্রধান ভবিষ্যদ্বক্তা। এখন সে জাভা দ্বীপে আগামী পঁচিশ বছর কি পরিমান বিদ্যুতের প্রয়োজন এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিদ্যুত উৎপাদনের পরিমান কি হবে সেই (ঃযব ষড়ধফ) হিসাব ও ভবিষৎদ্বাণীর অংক দেবে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন অংশে বন্টন ও আঞ্চলিক পুর্বাভাষের দায়িত্বেও সে। যেহেতু বিদ্যুতের চাহিদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্র্কযুক্ত, সেজন্য তার ভবিষৎদ্বাণী অর্থনৈতিক বিশ্লেষন ও প্রতিফলনের উপর নির্ভরশীল। আমাদের বাকি টিমের সদস্যরা এই সব ভবিষৎদ্বাণীর পরিপ্রেক্ষিতে মাষ্টার প্ল্যানের বিকাশ ঘটাবে। কোথায় কোথায় বিদ্যুত-উৎপাদন কেন্দ্র নির্মান করা হবে এবং তাদের নকশা প্রণয়ন, প্রেরণ (ট্র্যান্সমিশন) সরবরাহ লাইন, জ্বালানী তেলের পরিবহন-পদ্ধতি, এসবই এমন ভাবে সমাধা করতে হবে যাতে আমাদের অভিক্ষেপন যথাসম্ভব সন্তোষজনক হয়। আমাদের বাক্য বিনিময়ের সময়, চার্লি বারংবার আমার কাজের গুরুত্বের উপর ভীষন জোর দিচ্ছিল। ভবিষৎদ্বাণী করার সময় অত্যন্ত আশাবাদি হওয়াটা যে অত্যাশ্যক, সে ব্যপারে আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করেছিল। ক্লডিন ঠিকই বলেছে। আমিই সমস্ত মাষ্টার-প্ল্যানের মুল চাবিকাঠি।
চার্লি ব্যাখ্যা করে বললো “এখানে প্রথম কয়েক সপ্তাহ,“আমাদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে”
সে, হাওয়ার্ড এবং আমি চার্লির বিলাসবহুল অফিসে বিশাল সাইজের বেতের চেয়ারে বসেছিলাম। চারদিকের দেয়াল বাটিক-টাপেস্ট্রিতে সুসজ্জিত। তাতে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী রামায়নের চিত্রের সমাবেশ। চার্লি একটা মোটা সিগারের ধুমপান করছে।
“ইঞ্জিনিয়াররা বর্তমান বিদ্যুত-পদ্ধতি, বন্দরের ধারনক্ষমতা, রাস্তাঘাট, রেলওয়ে, এরকম সব কিছুর একটি বিস্তৃত চিত্র প্রণয়ন করবে।” আমার দিকে সে তার সিগার নিশানা করল। “আপনাকে দ্রæত কাজ করতে হবে। প্রথম মাসের শেষে, হাওয়ার্ডের পুরোমাত্রায় অর্থনৈতিক ইন্দ্রজাল সম্পর্কে একটি উত্তম ধারনার প্রয়োজন হবে। নতুন ইলেক্ট্রিক লাইন নির্মান শেষে যার অবির্ভাব ঘটবে। দ্বিতীয় মাসের শেষে, তার আরও বিস্তৃত তথ্যের প্রয়োজন হবে- বিভিন্ন অঞ্চলের উপর ভিত্তি করে। শেষ মাসে, যেখানে যেখানে ফাঁক পড়েছে, তা পুরণ করতে হবে। এটা খুব সঙ্কটজনক। আমাদের সবাইকে তখন একযোগে মাথা খাটাতে হবে। সুতরাং, এখান থেকে প্রস্থানের পুর্বে আমাদের চুড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে হবে, আমাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় হয়েছে কি না। সেটা হবে আমাদের ইশ্বরের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপনের আস্তানা Ñএই মূলমন্ত্র। ফিরে আসার কোনো পথ নেই”
হাওয়ার্ডকে মনে হল খোশমেজাজি, পিতামহের মত। কিন্ত আসলে সে ছিল একটি ত্যাক্ত-বিরক্ত বৃদ্ধ, যে মনে করত, জীবন তাকে প্রতারণা করেছে। সে কখনও নিউ ইংল্যান্ড বিদ্যুত-পদ্ধতির সর্বোচ্চ চুড়ায় উঠতে পারেনি এবং এর জন্য সে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। “আমাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে,” আমাকে সে বার বার বলত, “কারন আমি কোম্পানির উপরওয়ালাদের ঘুষ দেইনি।” তাকে জোর করে অবসর দেয়া হয়েছে তারপর, স্ত্রীর সাথে বাড়িতে বসে থাকা তার সহ্য হয়নি, তাই মাইন-ফার্মে পরামর্শদাতার চাকরি নিয়েছে। এখানে তার দ্বিতীয় নিয়োগ। আমাকে আইনার এবং চার্লি দুজনেই সাবধান করেছিল, তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। ’জেদি’, ‘নীচ‘ এবং ’প্রতিহিংসাপরায়ণ’ জাতীয় শব্দ দিয়ে ওকে তারা বর্ণনা করেছিল।
কিন্তু পরে দেখা গেল, হাওয়ার্ড আমার শ্রেষ্ট জ্ঞানী শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম একজন, যদিও ঐসময়ে আমি স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলাম না। ক্লডিন আমাকে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, হাওয়ার্ড কখনই সেরকম কিছু পায়নি। আমার মনে হয়, সম্ভবত তাকে অত্যন্ত বৃদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল, বা খুবই জেদী। বা হয়তো তারা ভেবেছিল সে খুব কম সময়ই এখানে টিকবে। যে পর্যন্ত না তারা আমার মত একজন সহজে বাঁকানো যায় ফুল-টাইমারকে প্রলুদ্ধ করতে পারে। যাইহোক তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সে একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। হাওয়ার্ড অত্যন্ত স্পষ্ট করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পেরেছিল, তারা তাকে দিয়ে কি ভুমিকা পালন করাতে চায় ? এজন্য সে দৃঢ়সংকল্প ছিল, কিছুতেই সে একটি দাবার বোড়ে হবে না। যাবতীয় বিশেষণ যা আইনার ও চার্লি তাকে বর্ননা করার জন্য ব্যবহার করেছিল, সবই ছিল যথার্থ। কিন্ত দাস্য বৃত্তিতে অস্বীকৃতি তার জেদি মনোভাবের কিছুটা ব্যক্তিগত প্রতিশ্রæতির বহিঃপ্রকাশ ছিল। আমার সন্দেহ ছিল, সে কখনই ‘ইকোনোমিক হিট ম্যান‘ শব্দটি শুনেছে কিনা, কিন্ত সে জানত; তাদের ইচ্ছা ছিল, তাকে এমন একটি সা¤্রাজ্য-নির্মানে ব্যবহার করা, যা সে মেনে নিতে পারে না।
চার্লির সাথে মিটিঙ্গের পর সে একদিন আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেল। তার কানে ছিল শোনার যন্ত্র। শার্টের নিচে শব্দ-নিয়ন্ত্রনের যে ছোট্ট বোতাম ছিল, তা সে নাড়াচাড়া করছিল। “এই কথাবার্তা শুধু আমার ও তোমার মধ্যে” হাওয়ার্ড ফিস ফিস করে বলল। আমরা দুজনে মিলে যে অফিসে বসতাম, তার জানালার পাশে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের নজর বদ্ধ খালে যা পিএলএন বিল্ডিং এর চারদিকে এঁকে বেঁকে প্রবাহিত। এর নোংরা জলে একটি যুবতী গোছল করছিল। প্রায় অনাবৃত দেহে, সারোঙ টানাটানি করে সে যতটা সম্ভব সংযমের আভাস বজায় রাখার চেষ্টা করছে। “তারা চেষ্টা করবে তোমাকে বোঝানোর জন্য, এই অর্থনীতি আকাশে রকেটের মত উর্ধগামী।” সে বলল, “চার্লি নির্মম। সে যেন তোমাকে বশ না করতে পারে।”
তার কথায় আমি খুবই বিষন্ন বোধ করলাম। কিন্ত সাথে সাথে আমার ইচ্ছা হল, চার্লি যে সঠিক, তা তাকে বোঝানোর জন্য। সব সত্তে¡ও, মাইনের বস্দের সন্তুষ্ট করার উপরেই আমার চাকরির উন্নতি নির্ভর করছে।
নিশ্চয়ই এই অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হবে, আমি বললাম, আমার চোখ খালের মহিলার দিকে। “শুধু দেখে যান, কি ঘটছে”। “আহা তুমিও তাদের দলে”, সে বিড়বিড় করল। মনে হল আমাদের চোখের সামনের দৃশ্যটি সম্পর্কে সে উদাসীন। “এর মধ্যেই তুমি তাদের ধ্যান-ধারনা মেনে নিয়েছ, নয় কি?”
খালের একটি নড়াচড়া আমার দৃষ্টি আকর্ষন করল। একটি বয়স্ক লোক খালের পাড়ে উঠে এসেছে, প্যান্ট খুলে পানির কিনারায় উবু হয়ে বসে প্রশ্রাব করছে সে। যুবতীটি নিরুৎসাহ চোখে তাকে দেখছে। কোনো উত্তেজনা ছাড়াই সে গোছল করতে থাকল। আমি জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে সরাসরি হাওয়ার্ডের দিকে তাকালাম।
“আমি অনেক জায়গা ঘুরে দেখেছি” আমি বললাম। আমার হয়ত বয়স কম, কিন্ত আমি সবেমাত্র তিন বছর দক্ষিণ আমেরিকাতে কাটিয়ে এসেছি। আমি দেখেছি তেল আবিস্কৃত হলে কি হতে পারে। পরিবর্তন দ্রæত হয়।
“আহা, আমিও বহু জায়গায় ছিলাম”, সে ব্যাঙ্গের সুরে বলল। “বহু বহু বছর। তরুন যুবক, তোমাকে আমি কিছু বলব। তুমি যা বললে, তেল আবিস্কার এবং উন্নয়ন এসবে আমি ফুটো পয়সার গুরুত্বও দেই না। সারা জীবন আমি বৈদ্যুতিক বর্তণীতে বিদ্যুতের পরিমান নিয়ে ভবিষৎদ্বানী করেছি- মন্দার সময়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, সমৃদ্ধি আর তেজী সময়ে। আমি দেখেছি তথাকথিত ম্যাসাচুসেটসের রুট-১২৮এর অলৌকিক ঘটনা বোস্টনের জন্য কি করেছে। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, যে কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোথাও বছরে ৭ থেকে ৯% এর বেশি বৈদ্যুতিক-সরবরাহ বাড়েনি। এবং তাও সবচাইতে ভালো সময়ে। ৬% অধিকতর যুক্তিযুক্ত।”
আমি তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম। আমার মনের একটি অংশের সন্দেহ, তার কথা সত্যি। কিন্ত আমার মধ্যে একটি আত্মরক্ষার ভাব উদয় হল। আমি জানতাম তাকে আমার বোঝাতেই হবে। কারন আমার নিজস্ব বিবেক সত্যতা প্রতিপাদন করার জন্য চিৎকার করছে।
“হাওয়াডর্, এটা বোস্টন নয়। এটি এমন একটি দেশ, যেখানে এমন কি এখন পর্যন্ত, কেউই বিদ্যুত পায়না। ঘটনা এখানে স্বতন্ত্র।”
সে হাত নেড়ে ঘুরে গেল যেন সে আমাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দেবে।
“কাজ করে যাও” কর্কশ কন্ঠ তার। “বিক্রি হয়ে যাও। আমি তোমার কথার এক পয়সা মুল্য দেই না।”
টেবিলের পেছন থেকে তার চেয়ারকে সে ঝাঁকি দিয়ে সরিয়ে এনে ধপ করে বসে পড়ল। “আমার বিশ্বাসের ভিত্তিতেই আমি বৈদ্যুতিক-ভবিষৎদ্বানী করব, পরলোকে কল্পিত সুখের কোনো অর্থনৈতিক আকাশ-কুসুম স্বপ্ন থেকে নয়” তার পেন্সিল হাতে নিয়ে সে কাগজের প্যাডে আঁকিঝুকি শুরু করল।
এটি ছিল একটি চ্যালেঞ্জ, যা আমি অবহেলা করতে পারি না। আমি তার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“তোমাকে অত্যন্ত বোকার মত দেখাবে, সবাই যা চায় তা হচ্ছে এমন একটি সমৃদ্ধি যা কালিফোর্নিয়ার সোনার খনির সাথে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার মত। এছাড়া তুমি বৈদ্যুতিক-ক্রমবৃদ্ধির এমন একটি ভবিষৎদ্বানী করবে যার হার ১৯৬০ সালে বোস্টনের সাথে তুলনা করার সমান, সেরকম একটি পরিকল্পনা নিয়ে আমি কাজ করি।”
সে টেবিলে পেন্সিলটি সশব্দে ঠুকে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “নীতিচেতনার বাইরে! আমি ঠিক এটাই বলতে চাই। “তোমরা শয়তানের কাছে তোমাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছ শুধু টাকা কামানোর জন্য”। তারপর সে হাসির ভান করে শার্টের নিচে হাত ঢোকাল, এবং বললো “আমি আমার শোনার যন্ত্রের সুইচ বন্ধ করে আমার কাজ শুরু করব।”
অন্তরের অন্তস্থলে আমি দোলা অনুভব করে ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে এসে চার্লির অফিসের দিকে গেলাম। অর্ধেক যাবার পর, আমি থেমেছি। একটি অনিশ্চিতকর অবস্থা, আমি কি করতে চাই ? আর সামনে না গিয়ে আমি ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে সদর দরজার বাইরে অপরাহ্নের সুর্যালোকে চলে এলাম। তরুনী যুবতীটি খাল থেকে পাড়ে উঠে আসছে। তার গায়ে এখন সারোঙ আঁট করে পরা। বুড়ো লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। বেশ কিছুু বালক খালের পানিতে খেলছে। এ ওর গায়ে পানি ছুঁড়ে হৈচৈ করছে। একটি বয়স্কা মহিলা হাটু পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছে। আরেকজন কাপড় কাঁচছে।
একটি বিরাট পিন্ড আমার গলায় জমা হচ্ছে। কংক্রিটের একটি ভগ্ন বর্গাকার টুকরায় আমি বসেছি। খাল থেকে যে দুর্গন্ধ ভেসে আসছে তাতে মনোযোগ না দেবার চেষ্টা করছি। চোখের পানি ঠেকানোর জন্য আপ্রান লড়াই করছি। আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে, আমি এতটা দুর্বিষহ বোধ করছি কেন ?
“তোমরা এখানে শুধু টাকা কামানোর জন্য” আমি বার বার হাওয়ার্ডের এই কথা শুনতে পাচ্ছি। সে একটি কাঁচা ¯œায়ুতে আঘাত করেছে।
ছোট্ট ছেলেরা পরস্পরে পানি ছিটাতে ব্যস্ত। আকাশ-বাতাস তাদের আনন্দ-চিৎকারে ভরে আছে। আমি ব্যথিত হয়ে ভাবলাম, আমি কি করতে পারি। এদের মত দুশ্চিন্তামুক্ত হতে হলে, আমাকে কি মুল্য দিতে হবে ? এ প্রশ্নটি আমাকে নিদারুন যন্ত্রনা দিল, যখন আমি তাদের নিষ্পাপ পরম সুখের উত্তেজনা ভরা লাফালাফি দেখছি। স্পষ্ট প্রতীয়মান, পুতিগন্ধময় পানিতে খেলা করার যে ঝুঁকি তারা নেয় তা তাদের অজানা। পেঁচানো লাঠি হাতে একজন বয়স্ক কুঁজওয়ালা ব্যক্তি খালের পাড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে। সে থেমে ক্রীড়ারত বাচ্চাদের দেখল, তার মুখে দন্তহীন একটি স্মিত হাসি।
বোধহয় আমি হাওয়ার্ডকে বিশ্বাস করতে পারি। হয়তো আমরা দুজনে একটা সমাধানে পৌছতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে আমি একটু স্বস্তি বোধ করলাম। একটা ছোট্ট পাথর তুলে খালে ছুঁড়ে দিলাম। তার তরঙ্গ মুছে যাবার মতই আমার আনন্দও শেষ হয়ে গেল। আমি জানতাম, এ ধরনের কোনে কাজই আমি করতে পারব না। হাওয়ার্ড বৃদ্ধ এবং তিক্ত। তার নিজস্ব ভবিষৎকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সমস্ত সুযোগই সে অতিক্রম করে গেছে। নিশ্চয়ই সে এখন আর বাঁকবে না। আমার বয়েস কম, কেবলমাত্র জীবন শুরু করেছি, বিষয়টি অবশ্যই তার মত সমাপ্ত করতে চাই না।
সেই খালের পঁচা পানির দিকে তাকিয়ে, আমি আবার পাহাড়ের উপর নিউ হ্যাম্পশায়ার প্রিপারেটরি স্কুলের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম। যেখানে আমি একাকি আমার ছুটির দিনগুলি কাটিয়েছি। সহপাঠিরা নবাগতা তরুনীদের সাথে বলনৃত্যে অংশ নেওয়ার স্মৃতি আস্তে আস্তে আমার বিষন্নতা দুর করে দিল।
সে রাতে বিছানায় শুয়ে আমি অনেক্ষণ চিন্তা করেছি, আমার জীবনে যে সব লোকজনের আবির্ভাব হয়েছে- হাওয়ার্ড, চার্লি, ক্লডিন, এ্যান, আইনার, আংকল ফ্রাংক। ভেবেছি আমার জীবন কেমন হতে পারত, যদি তাদের সাথে আমার কখনই দেখা না হত, কোথায় আমি থাকতাম ? ইন্দোনেশিয়াতে নয়, এটা নিশ্চিত। আমি আমার ভবিষৎ নিয়েও ভেবেছি, কোথায় আমি চলেছি। যে সিদ্ধান্তটির আমি সামনাসামনি হয়েছি, গভীরভাবে তাকে নিয়ে চিন্তা করলাম। চার্লি এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সে আশা করে, হাওয়ার্ড এবং আমি যেন বাৎসরিক সমৃদ্ধি কমপক্ষে ১৭% হিসাব করি। এখন কোন ধরনের ভবিষৎদ্বানী আমি তৈরি করব ? হঠাৎ আমার মনে একটি চিন্তার উদয় হল, যা আমার আত্মাকে শান্ত করল। এটা কেন আগে আমার মনে হয়নি ? এ সিদ্ধান্তটি তো মোটেই আমার নয়। হাওয়ার্ড বলেছে, আমার মতামতকে তোয়াক্কা না করে সে তাই করবে যা সে সঠিক মনে করে। আমি বস্দের একটি উচ্চতর ভবিষৎদ্বানী দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারি। আর সে তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে। আমার কাজ মাষ্টার-প্ল্যানে কোনো প্রভাব বিস্তার করবে না। সবাই আমার ভুমিকার প্রয়োজনীয়তার উপর চাপ দিচ্ছে, কিন্ত এটা তাদের ভুল। একটি বিরাট বোঝা আমার ঘাড় থেকে নেমে গেল। আমি গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়লাম।
কয়েকদিন পরে, হাওয়ার্ড কঠিনভাবে আমাশায় আক্রান্ত হল। তাকে দ্রæত ক্যাথলিক মিশন-হাসপাতালে নেয়া হল। ডাক্তাররা অষুধ দিলেন এবং কঠোরভাবে সুপারিশ করলেন, সে যেন অনতিবিলম্বে আমেরিকা ফিরে যায়। হাওয়ার্ড আমাদের আশ্বাস দিল, যা প্রয়োজন সমস্ত উপাত্তই তার যোগাড় হয়েছে। তাই অনায়াসে সে তার ইলেক্ট্রিক-লোডের ভবিষৎদ্বানী বোস্টন থেকে সমাপ্ত করতে পারবে। যাবার সময় আমাকে সে যা বলল, তা তার আগের সাবধান বানীরই প্রতিধ্বনি।
“সংখ্যার দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই,” বলল সে। “আমি হেলাফেলার সেসব কাজে অংশীদার হবো না, তুমি অর্থনৈতিক অলৌকিক ঘটনার ব্যাপারে যাই বল না কেন!”
আরও পড়ুন : ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-১
আরও পড়ুন : ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-২
আরও পড়ুন : ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-৩
আরও পড়ুন : ইকোনোমিক হিটম্যান : পর্ব ৪
সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫















