একজন স্বার্থপর মানুষের গল্প

মিজানুর রহমান রানা :

জীবন একটা অদ্ভুত সমীকরণ। সুখ আর দুঃখ মানুষের নিয়তির অংশ। সুখে থাকলেও ভূতে কিলায়, আর দুঃখে পড়লে মানুষ অপরের সত্ত্বা ও ত্যাগ ভুলে যায়। এরই নাম জীবন।

মিরাণ ছোটবেলা থেকেই সংসারের বড় ছেলে। বাবা-মা তাকে শিখিয়েছিলেন, “তুই সবার খেয়াল রাখিস, সংসারটা তোর হাতেই টিকে থাকবে।” সেই দায়িত্ববোধই তার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।

ভাইবোন সাহানা আর রায়হান তখনো পড়াশোনায় ব্যস্ত। মিরাণ নিজের চাকরির সুযোগ, নিজের স্বপ্নের পড়াশোনা সবকিছু একপাশে রেখে তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে শুরু করে। অনেক সময় নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা চাপা দিয়ে ভাইবোনদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

রেহানা, মিরাণের স্ত্রী, সবসময় তাঁকে সাহস জুগিয়েছে। রেহানা বলত, “মানুষের জন্য ভালো করলে একদিন না একদিন তারা বুঝবেই।”

একদিন সাহানা আর রায়হান মিলে মিরাণকে বলল, “তুই সবসময় নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিস। আমাদের কথা ভাবিস না। তুই আসলে স্বার্থপর।”

এই কথাটা মিরাণের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল। সে তো চেয়েছিল সবার সুখ দেখতে, সবার জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে। অথচ তাকে দেওয়া হলো স্বার্থপরের উপাধি।

রেহানা মিরাণকে শান্ত করল। বলল, “মানুষের চোখে তুমি হয়তো স্বার্থপর, কিন্তু আমার চোখে তুমি সেই মানুষ, যে নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে অন্যের সুখ গড়তে চায়।”

মিরাণের জীবনে ত্যাগের গল্প অসংখ্য।
– সাহানার পড়াশোনার জন্য সে নিজের চাকরির টাকা খরচ করেছে।
– রায়হানের ব্যবসার জন্য নিজের সঞ্চয় তুলে দিয়েছে।
– সংসারের প্রয়োজনে নিজের স্বপ্নের বাড়ি বানানো স্থগিত করে তাদের পুরাতন ঘর মেরামত করে দিয়েছে।

কিন্তু এসব ত্যাগের কথা কেউ মনে রাখেনি। বরং সবাই ভেবেছে, মিরাণ নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়, তাই সে স্বার্থপর।

রেহানা মিরাণকে বলল, “মানুষের চোখে তুমি হয়তো স্বার্থপর, কিন্তু সময়ই প্রমাণ করবে তুমি কেমন মানুষ। তুমি যদি নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকো, তবে অন্যের কথায় কষ্ট পেয়ে লাভ নেই।”

মিরাণ চুপ করে রইল। তার মনে হলো, মানুষের কাছে স্বার্থপরের তকমা পাওয়া হয়তো নিয়তির অংশ। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে সে জানে—সে কখনোই স্বার্থপর ছিল না।

সময় গড়িয়ে গেল। সাহানা চাকরি পেল, রায়হান ব্যবসায় সফল হলো। তারা বুঝতে শুরু করল, মিরাণের ত্যাগ ছাড়া তাদের জীবন এত সহজ হতো না।

একদিন সাহানা বলল, “ভাইয়া, আমরা ভুল করেছি। তুমি আমাদের জন্য যা করেছো, তা কোনো স্বার্থপর মানুষ করতে পারে না।”

রায়হানও মাথা নিচু করে বলল, “আমরা তোমার ত্যাগ বুঝতে পারিনি। তুমি আমাদের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছো।”

মিরাণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, “মানুষের চোখে আমি স্বার্থপর, কিন্তু আমার আত্মার কাছে আমি ত্যাগী। হয়তো পৃথিবী আমাকে ভুল বোঝে, কিন্তু আমার বিবেক জানে আমি কেমন মানুষ।”

রেহানা পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি আমার কাছে সবসময় সেই মানুষ, যে ভালোবাসা দিয়ে সংসারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

গল্পের শিক্ষা হলো—মানুষের চোখে আমরা অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির শিকার হই। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকাই আসল শক্তি। মিরাণের মতো মানুষ হয়তো স্বার্থপরের উপাধি পায়, কিন্তু আসলে তারা ত্যাগী, তারা সংসারের আসল নায়ক।

রোববার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫

You might like

About the Author: priyoshomoy