বিলুপ্তির পথে দেশি ধান: উপকূলের কৃষিকে বাঁচাতে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি

সম্পাদকীয়

প্রিয় সময়ে ‘শ্যামনগরে কৃষক নেতৃত্বে দেশীয় ধান রক্ষায় মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের দেশের জন্যে সময়োপযোগী ও গ্রহণযোগ্য সংবাদ; যা’ আমরা আমাদের দেশ রক্ষায় কৃষির জন্যে নতুনভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কৃষক নেতৃত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ধান জাত গবেষণার মাঠ দিবসটি উপক‚লীয় কৃষির বর্তমান সঙ্কট এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্যে এক এতোটা তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করলো।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও স্থানীয় কৃষকদের সম্মিলিত উদ্যোগে ১৬২টি স্থানীয় আমন ধানের জাত নিয়ে এ গবেষণা এবং মাঠ দিবস প্রমাণ করলো যে, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এ অঞ্চলে দেশীয় ধানের জাত সংরক্ষণ এখনো কেবল কোনো কৃষিগত বিষয় নয়, তা’ জীবন ও জীবিকা রক্ষার এক অপরিহার্য লড়াই। উপক‚লীয় অঞ্চলে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ধান চাষকে এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলো। একসময় এ অঞ্চল বহু স্থানীয় ধানের বৈচিত্রে সমৃদ্ধ ছিলো, বর্তমানে দ্রæত বর্ধনশীল হাইব্রিড এবং উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাতের উপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক বহু স্থানীয় জাত এখন বিলুপ্তির পথে।

মাঠ দিবসের বক্তারা এবং অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মূল উদ্বেগ এতোটাই স্পষ্ট: খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্যে স্থানীয় জাত রক্ষা করবো অপরিহার্য। এ দেশীয় জাতগুলো হাজার বছর ধরে এ প্রতিক‚ল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করছিলো। জলাবদ্ধতা সহনশীলতা, লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা, রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধ এবং কম সার প্রয়োজনÑএগুলোই স্থানীয় ধানের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কৃষকরা গবেষণা প্লট পরিদর্শন করলো এবং আরমান, স্বর্ণমাশুরী, নারকেল মুচি, চিনিকানি, দারশাইলসহ যে জাতগুলো নির্বাচন করলো, সেগুলোর প্রতিটিই এ অঞ্চলের পরিবেশের জন্যে বিশেষভাবে উপযোগী।

কৃষক নেতা নিমাই মন্ডলের বক্তব্যটি গভীর মনোযোগের দাবি রাখে: “হাইব্রিড ও উফশী ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানা সরকারি উদ্যোগ ছিলো তা’ কারো অজানা নয়, কিন্তু স্থানীয় জাত সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ ছিলো না।” এ দু’টি দিক একটি নির্মম সত্য। সরকারি কৃষি গবেষণা এবং সম্প্রসারণের মূল ফোকাস প্রায়শই উচ্চ ফলনশীল জাতের উপর থাকায়, স্থানীয় জাতের বীজভান্ডার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অথচ, এ স্থানীয় জাতগুলোই ভবিষ্যতে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু সঙ্কটের সময় আমাদের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ আশ্রয় হতে পারতো। বারসিক এবং স্থানীয় আইপিএম কৃষি ক্লাবের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তারা কেবল বীজ সংরক্ষণই করছে না, বরং কৃষক সমাজকে এ প্রক্রিয়ায় সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে দেশীয় জ্ঞান ও দক্ষতাকে পুনরুজ্জীবিত করছে।

এমতাবস্থায়, কেবল বেসরকারি বা স্থানীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দেশের কৃষি নীতি নির্ধারকদের এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেয়া উচিত। স্থানীয় জাত টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করলো। সরকারকে অবশ্যই: (১) বীজ সংরক্ষণ ও গবেষণা কর্মসূচিতে স্থানীয় ধানের জাতগুলোকে আরো অগ্রাধিকার দেবো। (২) কৃষক-নেতৃত্বাধীন গবেষণা এবং বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবো। (৩) কৃষকদের মধ্যে স্থানীয় জাতের চাষাবাদ উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করবো।

উপক‚লের কৃষি এবং বৃহত্তর অর্থে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করতে হলে, আমাদের বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ধানের জাতগুলোকে রক্ষা করবোই। শ্যামনগরের এ মাঠ দিবসটি কেবল কোনো গবেষণা প্রদর্শন নয়, তা’ আমাদের জাতীয় কৃষি কাঠামোর প্রতি একটি স্পষ্ট আহŸানÑসময় এসেছে আমাদের ঐতিহ্যের শেকড় ধরে ভবিষ্যতের পথে লড়বো।

মঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫

You might like