

ছোটগল্প
১. সংসারের প্রথম সকাল
গ্রামের নাম শ্যামলপুর। চারদিকে সবুজ ধানের খেত, ছোট ছোট মাটির বাড়ি, পুকুরের স্বচ্ছ জল আর সারি সারি নারকেলগাছ। গ্রামের এক প্রান্তে পুরোনো আমগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে একটি দোতলা বাড়ি। বাড়িটির নাম কেউ জানে না, তবে গ্রামের মানুষ একে চৌধুরীবাড়ি বলেই চেনে। এই বাড়িতেই বাস করতো অনিরুদ্ধ চৌধুরী ও তার স্ত্রী মাধবী। বিয়ের পর দেখতে দেখতে আটটি বছর পেরিয়ে গেছে তাদের সংসারজীবনের। তাদের দাম্পত্যজীবনে সুখ ছিলো, দুঃখ ছিলো, অভাব ছিলো, আবার ছিলো একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা। অনিরুদ্ধ গ্রামের একজন শিক্ষিত যুবক। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমিজমা দেখাশোনা করার পাশাপাশি সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতো।

তার স্বভাব ছিলো কিছুটা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, কখনো কখনো রাগী। নিজের সিদ্ধান্তকে সে সবসময় সঠিক বলে মনে করতো। অন্যদিকে মাধবী ছিলো শান্ত, ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিমতী। সংসারের ছোট-বড় প্রতিটি বিষয় সে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সামলাতো। মাধবীর কাছে স্বামী মানে শুধু একজন মানুষ নয়, স্বামী মানে জীবনের সঙ্গী, সুখ-দুঃখের অংশীদার এবং একসঙ্গে পথ চলার প্রতিশ্রুতি। সে বিশ্বাস করতো, সংসার কেবল অর্থসম্পদ দিয়ে গড়ে ওঠে না; সংসার গড়ে ওঠে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যদিয়ে। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠতো মাধবী। উঠোন ঝাড়ু দিতো, তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালাতো, রান্নাঘরে গিয়ে সকালের খাবার তৈরি করতো। অনিরুদ্ধ ঘুম থেকে ওঠার আগেই তার প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখতো।
একদিন সকালে অনিরুদ্ধ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলো। মাধবী এসে পাশে দাঁড়ালো।
—শুনছো, আজ স্কুল থেকে ফেরার সময় বাজারটা করে নিয়ে এসো। ঘরে চাল প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
অনিরুদ্ধ কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বললো,—তুমি কি সংসারের সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছো? তোমারও তো কিছু করার আছে।
মাধবী মৃদু হেসে বললো,—আমি তো আমার সাধ্য অনুযায়ী সবই করছি। তুমি বাজারটা করে আনলে আমার সুবিধা হবে।
অনিরুদ্ধ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,—আচ্ছা, দেখা যাবে।
মাধবী আর কোনো কথা বললো না। সে জানতো, ছোটখাটো কথায় তর্ক বাড়ালে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। তবে তার নীরবতা দুর্বলতা ছিলো না। সে জানতো কখন কথা বলতে হয়, আবার কখন ধৈর্য ধরতে হয়।
২. ভালোবাসার পরীক্ষা
বিয়ের প্রথম দিকে অনিরুদ্ধ মাধবীকে খুব ভালোবাসতো। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সারাদিনের গল্প করতো। কখনো দু’জনে পুকুরপাড়ে বসে গল্প করতো, কখনো পূর্ণিমার রাতে ছাদে বসে আকাশের তারা গুনতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধের আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে তার নতুন বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিলাসী জীবনযাপন করতো। দামি পোশাক, নতুন মোটরসাইকেল, শহরের রেস্তোরাঁয় খাওয়া—এসবের প্রতি অনিরুদ্ধের আগ্রহ বাড়তে লাগলো। একসময় সে নিজের সাধারণ জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লো।
মাধবী বিষয়টি বুঝতে পারলেও স্বামীকে কখনো ছোট করতো না। বরং বলতো,—আমাদের যা আছে, তা নিয়েই সুখী থাকার চেষ্টা করা উচিত। মানুষের জীবনে শান্তির চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই।
অনিরুদ্ধ হেসে বলতো,—তোমার চিন্তাভাবনা খুব পুরোনো। এভাবে চললে জীবনে বড় হওয়া যায় না।
মাধবী শান্তভাবে উত্তর দিতো,—বড় হওয়ার অর্থ শুধু অনেক টাকা উপার্জন করা নয়। মানুষের চরিত্র, সততা ও ভালো কাজও তাকে বড় করে।
অনিরুদ্ধ কথাটি শুনে বিরক্ত হতো। সে মনে মনে ভাবতো, মাধবী তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বোঝে না।
কিছুদিন পর অনিরুদ্ধের জীবনে এলো নতুন পরিচিত একজন ব্যবসায়ী। তার নাম রণজিৎ। সে শহরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলো। একদিন বিদ্যালয়ের সামনে অনিরুদ্ধের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কথায় কথায় রণজিৎ তাকে ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলো।
রণজিৎ বললো,—শিক্ষকতা করে আর কতোদিন চলবে? আমার সঙ্গে ব্যবসায় নামো। অল্প সময়ের মধ্যে তোমার জীবন পাল্টে যাবে।
অনিরুদ্ধ প্রথমে দ্বিধায় পড়লেও পরে আগ্রহী হয়ে উঠলো। সেই রাতে খাবার টেবিলে বসে সে মাধবীকে বিষয়টি জানালো।
মাধবী মনোযোগ দিয়ে সব শুনলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো,—লোকটিকে তুমি কতোদিন ধরে চেনো?
—কয়েকদিন হলো।
—তার ব্যবসা সম্পর্কে কিছু জানো?
—না, তবে লোকটিকে বেশ ধনী মনে হয়।
মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,—শুধু কাউকে ধনী দেখেই তার ওপর বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আগে ভালোভাবে খোঁজখবর নাও।
অনিরুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বললো,—তুমি সবকিছুতেই বাধা দাও। জীবনে ঝুঁকি না নিলে উন্নতি হয় না।
মাধবী উত্তর দিলো,—ঝুঁকি নেওয়া আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করা এক বিষয় নয়। তোমার উন্নতি হোক, সেটা আমিও চাই। কিন্তু এমন কোনো কাজ কোরো না, যাতে একদিন আমাদের মাথা নিচু করে বাঁচতে হয়।
অনিরুদ্ধ আর কথা বাড়ালো না।
৩. অন্ধকারের সূচনা
কয়েক মাসের মধ্যে অনিরুদ্ধ রণজিতের ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করলো। নিজের সঞ্চয়ের টাকা দেওয়ার পরও সে থামলো না। গ্রামের একটি জমি বন্ধক রেখে আরো টাকা সংগ্রহ করলো। মাধবী প্রথমে বিষয়টি জানতো না। একদিন আলমারিতে কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে সে জমির বন্ধকনামা দেখতে পেলো। তার বুক কেঁপে উঠলো। সন্ধ্যায় অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরতেই সে কাগজটি সামনে রাখলো।
—এটা কী?
অনিরুদ্ধ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,—ব্যবসার জন্য জমিটা বন্ধক রেখেছি।
—আমাকে একবারও জানালে না?
—তোমাকে জানিয়ে কী হতো? তুমি তো কোনোদিনই আমার কোনো কাজে সমর্থন দাও না।
মাধবীর চোখে জল চলে এলো।
—আমি কি তোমার শত্রু? সংসারের ভালো-মন্দ কি শুধু তোমার একার বিষয়? এই বাড়ি, এই জমি, আমাদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তো আমাদের দু’জনের।
অনিরুদ্ধ রেগে গিয়ে বললো,—তুমি শুধু ঘরের কাজ বোঝো। ব্যবসার হিসাব বোঝো না। আমাকে আমার মতো চলতে দাও।
সেদিন মাধবী আর কিছু বললো না। কিন্তু মনে মনে সে বুঝতে পারলো, তাদের সংসারে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় লোকসান শুরু হলো। রণজিৎ প্রতিদিন নতুন নতুন অজুহাত দেখাতে লাগলো। কখনো বলতো বাজার খারাপ, কখনো বলতো টাকা আটকে গেছে। অনিরুদ্ধের বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আরো টাকা চাওয়া শুরু করলো সে। একদিন হঠাৎ রণজিৎ উধাও হয়ে গেলো। অনিরুদ্ধ বুঝতে পারলো, সে প্রতারণার শিকার হয়েছে। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। জমি বন্ধক, ঋণ, ব্যবসার লোকসান—সব মিলিয়ে সে দিশেহারা হয়ে গেলো। বাড়িতে ফিরে সে চুপচাপ বসে থাকতো। কারো সঙ্গে কথা বলতো না। রাতে ঘুমাতে পারতো না। নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা হলেও কাউকে তা প্রকাশ করতে চাইতো না।
মাধবী সব বুঝতে পারতো। সে স্বামীর পাশে বসে বলতো,
—মানুষের জীবনে ভুল হতেই পারে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে হয়।
অনিরুদ্ধ তিক্ত কণ্ঠে বলতো,—তুমি আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে কী করবে? সব শেষ হয়ে গেছে।
মাধবী দৃঢ়ভাবে বললো,—সব শেষ হয়নি। টাকা হারিয়েছো, জমি বন্ধক রেখেছো, কিন্তু তোমার সততা, তোমার জ্ঞান আর কাজ করার ক্ষমতা তো হারাওনি। এগুলো নিয়েই আবার দাঁড়াতে পারবে।
৪. বিপদের দিনে পত্নীর পরিচয়
অনিরুদ্ধের দুর্দশার খবর ধীরে ধীরে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। যারা একসময় তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো, তারা এখন দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলো। কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করতো। একদিন গ্রামের বাজারে অনিরুদ্ধ কয়েকজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করলো। তারা তাকে দেখে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলো, যেন তাকে চিনতেই পারছে না। অপমানিত হয়ে সে বাড়ি ফিরে এলো। মাধবী তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলো কিছু একটা ঘটেছে।
—কী হয়েছে?
অনিরুদ্ধ বললো, —মানুষের কাছে আমার আর কোনো মূল্য নেই। বিপদে পড়লে সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়।
মাধবী বললো,—মানুষের মূল্য অন্য মানুষের কথায় নির্ধারিত হয় না। তুমি নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকো। একদিন সময়ই তোমার উত্তর দেবে।
অনিরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। —তুমি চাইলে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো। তোমাকে আর কত কষ্ট দেবো?
মাধবী অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। —এ কেমন কথা বলছো?
—আমি তোমাকে সুখ দিতে পারিনি। তোমার জীবন নষ্ট করেছি।
মাধবী স্বামীর হাত ধরে বললো,—আমি তোমাকে শুধু সুখের দিনের জন্য জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করিনি। বিয়ের অর্থ কি শুধু আনন্দের দিনে পাশাপাশি থাকা? দুঃখের দিনে একজন আরেকজনের হাত ছেড়ে দিলে সেই সম্পর্কের মূল্য কোথায়?
অনিরুদ্ধের চোখ ভিজে উঠলো।
মাধবী বললো,—আমি তোমার পাশে থাকবো। তবে একটি কথা মনে রেখো, তোমার ভুলকে আমি সমর্থন করবো না। তুমি যদি আবার ভুল পথে হাঁটতে চাও, আমি বাধা দেবো। আর যদি সৎভাবে নতুন জীবন শুরু করতে চাও, আমি তোমার সঙ্গে লড়বো।
সেদিন অনিরুদ্ধ প্রথমবার উপলব্ধি করলো, তার স্ত্রী শুধু সংসারের কাজ করা একজন নারী নয়; সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
৫. আত্মমর্যাদার সংগ্রাম
সংসারের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিলো না। বাড়ির খরচ কমাতে হলো। একসময় মাধবী নিজের বিয়ের সোনার গয়না বের করে অনিরুদ্ধের সামনে রাখলো।
—এগুলো বিক্রি করে কিছু ঋণ শোধ করো।
অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে বললো,—না, তোমার গয়না আমি বিক্রি করতে পারবো না।
মাধবী মৃদু হেসে বললো,—গয়না কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড়? এগুলো তো আবার কেনা যাবে। কিন্তু আমাদের সংসার ভেঙে গেলে তা আর আগের মতো করে গড়ে তোলা সহজ হবে না।
অনিরুদ্ধ মাথা নিচু করে বসে রইলো। মাধবী আরো বললো, —তবে একটি শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—তুমি আর কখনো যাচাই না করে কারো কথায় টাকা বিনিয়োগ করবে না। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসারের দায়িত্ব আমাদের দু’জনের।
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লো।পরদিন মাধবী তার গয়না বিক্রি করে কিছু টাকা সংগ্রহ করলো। ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করা হলো। কিন্তু সংসারের অভাব তখনো দূর হয়নি। মাধবী ভাবলো, শুধু অনিরুদ্ধের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। তাকে নিজেকেও কিছু করতে হবে। সে ছোটবেলা থেকে সেলাইয়ের কাজ জানতো। গ্রামের কয়েকজন নারীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে ছোট একটি সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র শুরু করলো। প্রথমে কাজ খুব কম আসতো। কিন্তু মাধবীর ব্যবহার, সততা ও দক্ষতার কারণে ধীরে ধীরে তার কাজের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়লো। কেউ ব্লাউজ সেলাই করাতে আসতো, কেউ শিশুদের পোশাক বানাতে দিতো। মাধবী যত্নসহকারে কাজ করতো। তার এই উদ্যোগ দেখে গ্রামের অনেক নারী উৎসাহিত হলো। যারা আগে সংসারের বাইরে কোনো কাজ করার কথা ভাবতো না, তারাও মাধবীর কাছে এসে সেলাই শিখতে লাগলো।
মাধবী তাদের বলতো,
—নারীর শক্তি শুধু সহ্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও নারীর শক্তি। সংসারকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কথাগুলো গ্রামের নারীদের মনে গভীরভাবে দাগ কাটলো।
৬. সন্দেহের বিষ
সংসারের অবস্থা একটু একটু করে উন্নতির দিকে এগোচ্ছিলো। কিন্তু মানুষের জীবনে সব বিপদ একসঙ্গে আসে না, আবার সব বিপদ একদিনে শেষও হয় না। অনিরুদ্ধের কয়েকজন আত্মীয় মাধবীর এই সাফল্য ভালোভাবে মেনে নিতে পারলো না। তাদের মধ্যে অনিরুদ্ধের দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই সুশান্ত ছিলো সবচেয়ে ঈর্ষাকাতর। সে মনে করতো, মাধবীর কারণে অনিরুদ্ধ এখন আর তার কথা শোনে না।
একদিন সুশান্ত অনিরুদ্ধকে বললো, —ভাই, তোমার স্ত্রী এখন নিজের ব্যবসা করছে। গ্রামের লোকজন তাকে খুব সম্মান করে। কিন্তু সাবধান থেকো। বেশি স্বাধীনতা দিলে একসময় সংসারের নিয়ন্ত্রণ তোমার হাত থেকে চলে যাবে। অনিরুদ্ধ প্রথমে কথাটিকে গুরুত্ব দিলো না।
সুশান্ত আবার বললো,—আমি তোমার ভালো চাই বলেই বলছি। একজন স্ত্রীকে নিজের সীমা বুঝে চলতে হয়।
অনিরুদ্ধ চুপ করে রইলো। সুশান্তের কথাগুলো তার মনে সন্দেহের বীজ বপন করলো। কয়েকদিন পর মাধবীকে গ্রামের একজন কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতে দেখে অনিরুদ্ধের মনে অস্বস্তি তৈরি হলো। লোকটি মাধবীর কাজের জন্য কাপড় সরবরাহ করতো।
বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করলো,
—আজ বাজারে কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
মাধবী স্বাভাবিকভাবে বললো,—কাপড়ের দোকানের মালিকের সঙ্গে। নতুন কাজের জন্য কিছু কাপড় নিতে হবে।
অনিরুদ্ধ বললো,
—তোমার কি এখন বাজারে এত ঘোরাঘুরি করার দরকার?
মাধবী অবাক হয়ে বললো,—কাজের প্রয়োজনে যেতে হয়। এতে অসুবিধা কোথায়?
অনিরুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বললো,—আমি পছন্দ করি না।
মাধবী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,—তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?
অনিরুদ্ধ উত্তর দিলো না। মাধবীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। এত কষ্টের মধ্যে যে মানুষটির পাশে সে দাঁড়িয়েছে, সেই মানুষটির মনেই যদি তার প্রতি অবিশ্বাস জন্মায়, তবে তার চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? তবু সে নিজেকে সামলে নিলো।
—শোনো, আমি তোমার স্ত্রী। তোমার সম্মান আমার কাছেও মূল্যবান। কিন্তু আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে সত্যিটা জানার চেষ্টা কোরো।
৭. পতিব্রতা শক্তির প্রকৃত অর্থ
একদিন সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিলো। অনিরুদ্ধ তখন বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরছিলো। পথের মাঝখানে একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তার পাশে আহত একজন বৃদ্ধ পড়ে ছিলেন। অনেকে দূর থেকে দেখছিলো, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছিলো না। অনিরুদ্ধ ছুটে গিয়ে বৃদ্ধকে তুলে ধরলো। নিজের রিকশা ভাড়া করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। বৃদ্ধের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনেক সময় লাগলো। হাসপাতালের প্রাথমিক চিকিৎসার খরচও অনিরুদ্ধ নিজের পকেট থেকে দিলো। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলো। বাড়িতে ফিরে সে দেখলো, মাধবী দরজার সামনে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—এতো রাত করলে কেন? ফোনও বন্ধ ছিলো। অনিরুদ্ধ সব ঘটনা খুলে বললো।
মাধবী মন দিয়ে শুনলো। তারপর বললো,—তুমি খুব ভালো কাজ করেছো। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের ধর্ম।
অনিরুদ্ধ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মনে পড়লো, একসময় সে নিজেই বিপদে পড়েছিলো। তখন মাধবীও তাকে ঠিক এভাবেই আগলে রেখেছিলো। কিন্তু মাধবীর ত্যাগের অর্থ সে এতদিন বুঝতে পারেনি।
সে ধীরে ধীরে বললো, —মাধবী, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
—বলো।
—তুমি আমার এতো কষ্ট সহ্য করো কীভাবে?
মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো, —সহ্য করা আর নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার পাশে আছি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তোমার অন্যায়কে মেনে নেবো। একজন পতিব্রতা স্ত্রীর শক্তি তার অন্ধ আনুগত্যে নয়; তার সত্যনিষ্ঠা, বিবেক, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং সঠিক পথে স্বামীকে পরিচালিত করার ক্ষমতায়। অনিরুদ্ধ গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো।
মাধবী আবার বললো,—স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কোনো প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক নয়। এটি সমান মর্যাদার দুটি মানুষের সম্পর্ক। একজন ভুল করলে অন্যজন তাকে সঠিক পথ দেখাবে। একজন দুর্বল হলে অন্যজন তাকে সাহস দেবে। দু’জন মিলে সংসার গড়বে। এটাই আমার কাছে পতিব্রতা ধর্ম।
অনিরুদ্ধের চোখে জল এসে গেলো।
৮. ভয়াবহ সংকট
দিন যেতে লাগলো। মাধবীর সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র বড় হতে লাগলো। গ্রামের নারীরা সেখানে নিয়মিত কাজ শিখতো। অনিরুদ্ধও আবার বিদ্যালয়ের কাজে মনোযোগ দিলো। কিন্তু তাদের জীবনে আবার একটি ভয়াবহ বিপদ নেমে এলো। একদিন সকালে অনিরুদ্ধ বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। প্রথমে সে ভেবেছিলো সামান্য দুর্বলতা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীর অবশ হয়ে এলো। সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, অনিরুদ্ধের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। খবর শুনে মাধবী ছুটে গেলো হাসপাতালে।
চিকিৎসক বললেন, —রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কিছু পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু অর্থের প্রয়োজন হবে।
মাধবীর কাছে তখন এতো টাকা ছিলো না। সে এক মুহূর্তও ভেঙে পড়লো না। প্রথমে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলো। তারপর পরিচিত মানুষদের কাছে সাহায্য চাইলো। নিজের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঞ্চিত অর্থও চিকিৎসার জন্য ব্যয় করলো। অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো। আবার অনেকে নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেলো।
সুশান্ত পর্যন্ত বললো,—এখন আর কী হবে? এতো টাকা খরচ করে লাভ কী?
মাধবী দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলো,—মানুষের জীবন টাকার চেয়ে অনেক বড়। চিকিৎসকেরা যতদিন আশা দেখাবেন, আমি ততদিন চেষ্টা করে যাবো।
হাসপাতালের করিডরে বসে সে সারারাত প্রার্থনা করতো। কখনো চোখের জল মুছতো, কখনো অনিরুদ্ধের শয্যার পাশে বসে তার হাত ধরে থাকতো।
এক রাতে অনিরুদ্ধের জ্ঞান ফিরলো। সে অস্পষ্ট কণ্ঠে বললো,—মাধবী…
মাধবী তাড়াতাড়ি তার কাছে এগিয়ে গেলো।—আমি আছি। তুমি চিন্তা কোরো না।
অনিরুদ্ধ কষ্ট করে বললো,—তুমি… এতো কষ্ট করছো কেন?
মাধবী চোখের জল লুকিয়ে হাসলো।—কারণ তুমি আমার জীবনসঙ্গী। তোমাকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যেতে চাই। অনিরুদ্ধ কিছু বলতে চেয়েও পারলো না।
মাধবী তার কপালে হাত রেখে বললো,—এখন কোনো কথা নয়। তুমি শুধু সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করো। বাকি সব আমি সামলে নেবো।
৯. মানুষের ভালোবাসা
অনিরুদ্ধের চিকিৎসা চলতে লাগলো। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলো। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে বলে চিকিৎসক জানালেন। এই সময় মাধবী প্রমাণ করলো, একজন মানুষের ভালো কাজ কখনো বৃথা যায় না। যে নারীদের সে সেলাই শিখিয়েছিলো, তারা পালা করে হাসপাতালে আসতো। কেউ খাবার নিয়ে আসতো, কেউ ওষুধ কেনার জন্য টাকা দিতো। গ্রামের কয়েকজন শিক্ষকও আর্থিক সাহায্য করলেন। একদিন হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে মাধবী দেখলো, সেই বৃদ্ধ লোকটি এসেছেন, যাকে একদিন অনিরুদ্ধ দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো। বৃদ্ধের চোখে জল।
তিনি বললেন,—মা, তোমার স্বামী আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আজ তার বিপদে আমি কীভাবে চুপ করে থাকি? আমার সামর্থ্য কম, তবু এই সামান্য অর্থটা গ্রহণ করো।
মাধবী বৃদ্ধের হাত ধরে বললো,—আপনার আশীর্বাদই আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
বৃদ্ধ বললেন,—তোমার মতো স্ত্রী পাশে থাকলে মানুষ কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
কথাটি শুনে মাধবীর চোখ ভিজে উঠলো। সে বুঝতে পারলো, ভালোবাসা শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধই সমাজকে সুন্দর করে।
১০. অনুশোচনার অশ্রু
দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরলো। এখনো তার শরীর দুর্বল। চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। মাধবী তার ওষুধ, খাবার ও বিশ্রামের সব ব্যবস্থা করলো। একদিন বিকেলে অনিরুদ্ধ বারান্দায় বসে ছিলো। মাধবী তার পাশে এসে বসলো।
অনিরুদ্ধ বললো,—মাধবী, তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ।
মাধবী মৃদু হেসে বললো,—সংসারে ঋণের হিসাব করতে নেই।
—না, এ ঋণ শুধু টাকার নয়। তুমি আমার জন্য যা করেছো, তার প্রতিদান দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
মাধবী বললো,—আমি প্রতিদান চাইনি। শুধু চেয়েছি তুমি ভালো মানুষ হও।
অনিরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,—আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তোমার সততা নিয়ে সন্দেহ করেছি। তোমার কাজকে ছোট করে দেখেছি। অথচ তুমি আমার বিপদে একবারও আমাকে ছেড়ে যাওনি।
মাধবী বললো,—অতীতের ভুল নিয়ে সারাজীবন কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। ভুল স্বীকার করে নিজেকে বদলে ফেলাই বড় কথা।
অনিরুদ্ধের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।সে স্ত্রীর হাত ধরে বললো,—আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আর কখনো তোমার আত্মসম্মানে আঘাত করবো না। তোমাকে শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, আমার সমান অংশীদার হিসেবে সম্মান করবো।
মাধবী শান্তভাবে বললো,—আমাদের সংসার নতুন করে শুরু হবে। এবার কোনো সিদ্ধান্ত একা নেওয়া হবে না।
১১. সুশান্তের মুখোশ
অনিরুদ্ধ সুস্থ হয়ে ওঠার পর একদিন সুশান্ত তাদের বাড়িতে এলো। তার মুখে আগের মতোই মিষ্টি হাসি।—ভাই, এখন শরীর কেমন?
অনিরুদ্ধ বললো,—আগের চেয়ে ভালো।
সুশান্ত মাধবীর দিকে তাকিয়ে বললো,—ভাবি তো অনেক বড় ত্যাগ করেছেন। আপনার মতো ভাগ্যবান মানুষ খুব কম আছে। মাধবী কোনো উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ পর অনিরুদ্ধ বললো, —সুশান্ত, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।
—বলো ভাই।
—তুমি একসময় আমার সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলে। মাধবীর কাজ নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছিলে। কেন? সুশান্ত অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।
—আরে ভাই, আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বলেছিলাম।
অনিরুদ্ধ শান্ত কণ্ঠে বললো,—ভালো চাইলে মানুষকে ভুল বোঝাতে হয় না। আমি যখন বিপদে পড়েছিলাম, তখন তুমি পাশে দাঁড়াওনি। বরং আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলে। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, কে আমার সত্যিকারের আপন। সুশান্ত মাথা নিচু করে বসে রইলো।
অনিরুদ্ধ বললো,—সম্পর্কের মূল্য কথায় নয়, কাজে প্রমাণ হয়।
সেদিন সুশান্ত কোনো উত্তর দিতে পারলো না।
১২. নতুন দিনের সূর্য
এক বছর কেটে গেলো।অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলো। বিদ্যালয়ে আবার শিক্ষকতা শুরু করলো। তবে এবার তার জীবনদর্শন অনেক বদলে গেছে। সে শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের পড়া শেখাতো না, সততা, মানবিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষাও দিতো। অন্যদিকে মাধবীর সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র এখন গ্রামের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রায় ত্রিশজন নারী কাজ শেখে। কেউ নিজের সংসারের খরচ চালায়, কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করেছে। মাধবী তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করার চেষ্টা করে।
একদিন গ্রামের কয়েকজন নারী তাকে বললো,—দিদি, তোমার জীবন থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। তুমি এতো কষ্টের মধ্যেও সংসার বাঁচিয়েছো, আবার নিজের পরিচয়ও তৈরি করেছো।
মাধবী হেসে বললো,
—সংসার বাঁচানো শুধু একজন নারীর দায়িত্ব নয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই সমান দায়িত্ব। একজনকে সবসময় ত্যাগ করতে হবে আর অন্যজন শুধু অধিকার ভোগ করবে, এমন সংসার কখনো সুখের হয় না।
একজন নারী জিজ্ঞেস করলো,
—তাহলে পতিব্রতা নারীর আসল পরিচয় কী?
মাধবী কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো,—যে নারী স্বামীকে ভালোবাসে, তার সুখ-দুঃখে পাশে থাকে, তার কল্যাণ চায়, তাকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনে এবং সংসারের মঙ্গলের জন্য নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে পতিব্রতা। তবে মনে রেখো, পতিব্রতা হওয়ার অর্থ নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া নয়। ভালোবাসার সম্পর্ক কখনো ভয়, নির্যাতন বা জোরজবরদস্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। স্বামী যেমন স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, স্ত্রীও তেমন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। দু’জনের সম্মান ও বিশ্বাসেই সংসার পূর্ণতা পায়। নারীরা মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনলো।
১৩. ভালোবাসার স্বীকৃতি
সেদিন ছিলো রোববার। সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বসে অনিরুদ্ধ ও মাধবী চা পান করছিলো। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চারদিকে নীরবতা।
অনিরুদ্ধ বললো,—মাধবী, তোমার একটা স্বপ্নের কথা জানতে চাই।
মাধবী অবাক হয়ে তাকালো।—আমার স্বপ্ন?
—হ্যাঁ। তুমি নিজের জন্য কী চাও?
মাধবী একটু হেসে বললো,—আমি চাই, আমাদের গ্রামের কোনো নারী যেন অর্থের অভাবে অসহায় হয়ে না থাকে। কেউ যেন নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে বাধ্য না হয়। আমি চাই, আমাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে আরো অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক।
অনিরুদ্ধ বললো,—তাহলে তোমার স্বপ্ন পূরণে আমি তোমার পাশে থাকবো।
মাধবী আনন্দিত হয়ে বললো,—সত্যি?
—হ্যাঁ। এবার থেকে তোমার কাজ শুধু তোমার একার থাকবে না। আমাদের দু’জনের কাজ হবে।
মাধবী স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসলো। অনিরুদ্ধ বললো, —জানো, একসময় আমি ভাবতাম সংসারের কর্তা হওয়া মানে সব সিদ্ধান্ত একা নেওয়া। আজ বুঝেছি, সংসারের কর্তা হওয়ার চেয়ে সংসারের সঙ্গী হওয়া অনেক বড় বিষয়।
মাধবী বললো,—এই উপলব্ধিটুকুই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
অনিরুদ্ধ তার হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলো। —তুমি আমার জীবনের অন্ধকার সময়ে প্রদীপের মতো আলো দিয়েছো। তোমার ধৈর্য, সাহস আর ভালোবাসা আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
মাধবী বললো,—আমি একা তোমাকে বাঁচাতে পারতাম না। তুমিও তো নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছো। মনে রেখো, সংসার কখনো একজনের শক্তিতে টিকে থাকে না। দু’জনের বিশ্বাস, সম্মান ও ভালোবাসাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
১৪. সমাজের সামনে এক দৃষ্টান্ত
কয়েক মাস পর শ্যামলপুরে একটি নারী উন্নয়ন সভার আয়োজন করা হলো। গ্রামের বিদ্যালয়ের মাঠে অনেক মানুষ উপস্থিত হলো। সেখানে মাধবীকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। প্রথমে সে কিছুটা সংকোচ বোধ করলেও পরে মঞ্চে উঠে দাঁড়ালো।
সে বললো, —সম্মানিত উপস্থিত সবাই, আজ আমি কোনো বড় বক্তা হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়াইনি। আমি একজন সাধারণ নারী, একজন স্ত্রী, একজন সংসারী মানুষ। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার অর্থসম্পদে নয়, তার মনোবল ও মানবিকতায়।
সে কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে শুরু করলো,—আমাদের সমাজে অনেক সময় পতিব্রতা নারীর অর্থ ভুলভাবে বোঝানো হয়। অনেকে মনে করেন, স্বামীর সব কথা মেনে নেওয়া, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিসর্জন দেওয়া এবং সব অন্যায় নীরবে সহ্য করাই পতিব্রতা ধর্ম। কিন্তু আমি মনে করি, এটি সঠিক ধারণা নয়।
—একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসবে, তার পাশে থাকবে, তার মঙ্গল কামনা করবে। কিন্তু স্বামী যদি ভুল পথে যায়, তবে তাকে সঠিক পথ দেখানোও স্ত্রীর দায়িত্ব। আবার স্বামীরও দায়িত্ব স্ত্রীকে সম্মান করা, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তার স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করা।
—একজন নারী যখন নিজের স্বামীর বিপদে পাশে দাঁড়ায়, তখন তার ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। আবার একজন স্বামী যখন স্ত্রীর আত্মসম্মান রক্ষা করে, তার স্বপ্নকে সম্মান করে, তখন তার ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। এভাবেই একটি সুন্দর পরিবার গড়ে ওঠে। মাধবীর কথা শুনে উপস্থিত মানুষেরা করতালি দিলো।
অনিরুদ্ধ সামনের সারিতে বসে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে গর্বের আলো। সেদিন সে বুঝতে পারলো, মাধবী শুধু তার সংসারের মানুষ নয়; সে সমাজের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা।
১৫. পতিব্রতা শক্তির বিজয়
বছর ঘুরে আবার বসন্ত এলো। শ্যামলপুরের মাঠে মাঠে নতুন ফসলের সবুজ আভা। গ্রামের মানুষের জীবনেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। মাধবীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র এখন আরো বড় হয়েছে। গ্রামের অনেক নারী সেখানে কাজ করে নিজেদের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে। অনিরুদ্ধ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছে। দু’জনে মিলে গ্রামের অসহায় মানুষদের সাহায্য করার জন্য একটি ছোট তহবিলও তৈরি করেছে। একদিন বিকেলে মাধবী উঠোনে বসে সেলাইয়ের কাজ করছিলো। অনিরুদ্ধ এসে পাশে বসলো।
—মাধবী, তোমাকে একটা কথা বলবো?
—বলো।
—তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
মাধবী একটু ভেবে বললো,—বিশ্বাস।
—কীসের বিশ্বাস?
—নিজের প্রতি বিশ্বাস, মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে সে নিজেকে বদলাতেও পারে।
অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে বললো,—আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তুমি।
মাধবী বললো,—তাহলে মনে রেখো, জীবনে কখনো অহংকার কোরো না। সম্পদ হারালে আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস হারালে তা ফিরে পাওয়া খুব কঠিন।
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লো।—তোমার কথা আমি মনে রাখবো।
সন্ধ্যা নেমে এলো। আকাশে পাখিরা আপন নীড়ে ফিরছে। দূরে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। গ্রামের মানুষ দিনের কাজ শেষ করে ঘরে ফিরছে। মাধবী তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালাতে উঠলো। অনিরুদ্ধ তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে পড়লো জীবনের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা, যখন সে সব হারিয়ে নিজেকে অসহায় মনে করেছিলো। সেই সময়ে যে মানুষটি তার হাত ছেড়ে যায়নি, সেই মানুষটির নাম মাধবী। আজ সে জানে, স্ত্রীর ভালোবাসা কোনো দুর্বলতা নয়। তার ধৈর্য কোনো পরাজয় নয়। তার নীরবতা কোনো অসহায়ত্ব নয়। বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং বিপদের সময় অটল থাকার ক্ষমতাই তার প্রকৃত শক্তি।
মাধবী প্রদীপ জ্বালিয়ে ফিরে এসে বললো,—চলো, সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
অনিরুদ্ধ তার হাত ধরে বললো,—চলো। তবে আজ একটা কথা বলতে চাই।
—কী কথা?
—তুমি আমার জীবনে শুধু স্ত্রী নও, তুমি আমার পথপ্রদর্শক, আমার সাহস, আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
মাধবী মৃদু হেসে বললো,—আর তুমি আমার জীবনসঙ্গী। আমরা দু’জন একসঙ্গে পথ চলবো, এটাই তো আমাদের প্রতিজ্ঞা।
দু’জনে পাশাপাশি ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ। তার আলোয় ভেসে যাচ্ছে শ্যামলপুরের পথঘাট, পুকুরের জল আর চৌধুরীবাড়ির উঠোন। সেই আলো যেন নীরবে বলে যাচ্ছিলো—সংসারের প্রকৃত সৌন্দর্য ধনসম্পদে নয়, ভালোবাসা ও বিশ্বাসে। একজন নারীর পতিব্রতা শক্তি তার অন্ধ আত্মসমর্পণে নয়, বরং তার সততা, আত্মমর্যাদা, সাহস, ধৈর্য ও মানবিকতায়। যে ভালোবাসা মানুষকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনে, যে বিশ্বাস মানুষকে ভেঙে পড়ার পর আবার দাঁড়াতে শেখায়, সেই ভালোবাসাই প্রকৃত শক্তি। মাধবী তার জীবনের মধ্যদিয়ে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠা করেছিলো। তার নামের মতোই সে ছিলো মাধুর্যে ভরা। কিন্তু সেই মাধুর্যের অন্তরালে লুকিয়ে ছিলো পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা। আর অনিরুদ্ধ বুঝেছিলো, একজন প্রকৃত জীবনসঙ্গী পাশে থাকলে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার পথও একদিন আলোকিত হয়ে ওঠে। সত্যিকারের পতিব্রতা সেই নারী, যিনি ভালোবাসার মধ্যদিয়ে সংসারকে সুন্দর করেন, সত্যের মধ্যদিয়ে স্বামীকে সঠিক পথ দেখান এবং আত্মমর্যাদার মধ্যদিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর সত্যিকারের স্বামী সেই ব্যক্তি, যিনি স্ত্রীর ভালোবাসার মূল্য বোঝেন, তার মর্যাদা রক্ষা করেন এবং সুখ-দুঃখের প্রতিটি মুহূর্তে তার পাশে থাকেন। এভাবেই ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠে একটি সুন্দর সংসার। পতিব্রতা শক্তির প্রকৃত বিজয় সেখানেই।
প্রকাশিত: রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.













