বাবার শেখানো জীবন

ক্ষুদীরাম দাস:

ময়মনসিংহ জেলার এক শান্ত, সবুজে মোড়া খ্রীষ্টান পাড়ায় পিটার গোমেজের সংসারটি ছিলো খুবই সাধারণ; কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতর লুকিয়ে ছিলো গভীর শিক্ষা। পাড়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো ইটের গীর্জাটি যেনো পুরো এলাকার প্রাণ। রোববার ভোর হলেই গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো; আর সেই শব্দে পিটার গোমেজের ঘুম ভাঙতো বহু বছর ধরে।

পিটার তখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ। চুলে পাক ধরেছে, চোখে মুখে ক্লান্তির রেখা, তবুও তার মনোবল ছিলো অটুট। স্ত্রী মার্থা গোমেজ অনেক বছর আগে অসুস্থতায় মারা গিয়েছিলেন। সেই দিনের পর থেকে পিটার একাই তার একমাত্র মেয়ে এলিজাকে মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ, কোনো আক্ষেপ কখনো তার মুখে শোনা যায়নি।

এলিজা তখন কলেজে পড়ে। অবিবাহিত, শান্ত স্বভাবের মেয়ে। তার চোখে ছিলো স্বপ্ন; কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো ছিলো দায়িত্ববোধে বাঁধা। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে এসেছে, বাবা কীভাবে ভোরে উঠে প্রার্থনা করে, কীভাবে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে সংসার চালায়, কীভাবে ঈশ্বরের ওপর সব ছেড়ে দিয়ে জীবনকে সামনে এগিয়ে নেয়।

প্রতিদিন ভোরে পিটার ঘুম থেকে উঠতো। ঘরের ভেতর নীরবতা থাকলেও রান্নাঘরে গিয়ে সে চুলা ধরলো, চা বানালো। তারপর বাইবেল খুলে টেবিলের পাশে বসলো। এলিজা ঘুম ভাঙার পর দরজার আড়াল থেকে বাবাকে তাকাচ্ছিলো। বাবার ঠোঁট নড়ছিলো, চোখ বন্ধ, যেনো সমস্ত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঈশ্বরের সাথে কথা বলছে।

একদিন এলিজা সাহস করে বললো, “বাবা, আমি কি তোমার সাথে প্রার্থনা করবো?”

পিটার তাকালো। তাকাচ্ছিলো মানে শুধু দেখা নয়, ভেতরের আনন্দ লুকোচ্ছে। বললো, “হ্যাঁ মা, অবশ্যই। ঈশ্বরের কাছে একসাথে দাঁড়ালে মন শক্ত হয়।”

সেই দিন থেকে এলিজা বাবার পাশে বসে প্রার্থনা করতো। শুরুতে তার ভালো লাগতো না, ঘুম পেতো, মন বসতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করলো, এই নীরব সময়টাই বাবার শক্তি।

পিটার শুধু প্রার্থনাই শেখাননি, শেখান সংসারের কাজও। একদিন বললো, “মা, আজ রান্নাটা তুমি করবো।”

এলিজা অবাক হয়ে বললো, “আমি পারবো?”

পিটার হাসলো। হাসলো মানে সাহস দিলো। বললো, “পারবো না ভেবে কেউ কখনো পারেও না।”

সেই দিন এলিজা প্রথম ভাত রান্না করলো। ভাত একটু বেশি নরম হয়েছিলো, ডাল লবণ কম। কিন্তু পিটার একটুও অভিযোগ করলো না। বললো, “ভালো হয়েছে। শেখার শুরু এভাবেই।”

এভাবে দিনে দিনে এলিজা শিখলো ঝাড়– দেয়া, কাপড় ধোয়া, বাজার করা, টাকার হিসাব রাখা। পিটার সব সময় বলতো, “এই কাজগুলো তোমার মৃত্যু পর্যন্ত কাজে লাগবে।”

একদিন সন্ধ্যায় বাবা-মেয়ে একসাথে বসে খাবার খাচ্ছিলো। পিটার হঠাৎ বললো, “মা, মনে রেখো, এ জগতে জন্মদাতা পিতা ছাড়া কেউ নিঃস্বার্থ না। তুমি কাজ করো বা না করো, আমি তোমাকে ভাত কাপড় দেবো। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন, সমাজÑকেউ কিছু দেবে না যদি কাজ না করো।”

এ কথাগুলো এলিজার মনে গভীর ভীত তৈরি করলো। সে বুঝলো, বাবা ভয় দেখাচ্ছে না, সত্য শেখাচ্ছে।

কলেজে এলিজার বান্ধবীরা ছিলো আধুনিক চিন্তার। তারা বলতো, “সংসারের কাজ করলে মানুষ ছোট হয়।” কেউ আবার বলতো, “বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।” এলিজা এসব কথা শুনছিলো, কিন্তু তার মনে বাবার মুখটাই ভেসে উঠতো।

একদিন কলেজ থেকে ফিরে সে দেখলো বাবা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। শরীর কাঁপছে। এলিজা দৌড়ে গেলো। বললো, “বাবা, কী হয়েছে?”

পিটার বললো, “কিছু না মা, একটু দুর্বল লাগছে।”

সেই দিন থেকেই এলিজা সংসারের ভার পুরোপুরি কাঁধে নিলো। রান্না, ওষুধ, বাজারÑসবকিছু সে করছিলো। পিটার বিছানায় শুয়ে তাকাচ্ছিলো। তাকাচ্ছিলো মানে ভেতরে ভেতরে সন্তুষ্ট হচ্ছিলো।

রোববার সকালে এলিজা একাই বাবাকে নিয়ে গীর্জায় গেলো। ইটের গীর্জার ভেতরে বসে সে প্রার্থনা করছিলো। ফাদার জন উপদেশে বললেন, “পিতামাতার সেবা ঈশ্বরের চোখে সবচেয়ে বড় সেবা।”

এই কথা এলিজার মনে আরো শক্ত করে গেঁথে গেলো। সে ভাবলো, বাবার সেবা মানেই ঈশ্বরের পথে থাকা।

সময় যেতে লাগলো। পিটার কিছুটা সুস্থ হলো, কিন্তু আগের মতো শক্তিশালী আর হলো না। এলিজা তখন প্রতিমাসে টাকার হিসাব রাখতো। সংসারের সঙ্কট এলেও সে ভীত হয়নি। বাবার শেখানো হিসাবের নিয়মে সব সামলাতো।

পাড়ার লোকজন অবাক হয়ে তাকাতো। কেউ বলতো, “এই মেয়ে আলাদা।” কেউ বলতো, “এতো দায়িত্ব ও নিতে পারে!” পিটার এসব শুনে চুপ থাকতো, শুধু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতো।

একদিন এলিজার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এলো। পাত্র ভালো চাকরি করে, শহরে থাকে। আত্মীয়রা খুশি। এলিজা বাবার কাছে এসে বললো, “বাবা, তুমি কী বলো?”

পিটার ধীরে বললো, “মা, যে মানুষ পিতার সম্মান বোঝে না, সংসারের কাজকে ছোট করে দেখে, তার সাথে জীবন কঠিন হয়।”

এলিজা পাত্রের সাথে কথা বললো। কথাবার্তার মধ্যদিয়ে বুঝলো, লোকটি তার বাবার সেবাকে বোঝে না। সে বিনয়ের সাথে না বললো।

সময় আরো এগিয়ে গেলো। পিটার একদিন এলিজার হাত ধরে বললো, “মা, আমি একদিন থাকবো না। তখন এ শিক্ষা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।”

এলিজার চোখে জল এলো। বললো, “বাবা, তোমার শেখানো জীবন আমি কখনো ছাড়বো না।”

কয়েক মাস পরে পিটার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তার বললো, সময় কম। এলিজা দিনরাত বাবার পাশে বসে থাকতো। খাচ্ছিলো কম, ঘুমাচ্ছিলো কম। তবুও মুখে কোনো অভিযোগ নেই।

এক ভোরে পিটার এলিজার দিকে তাকিয়ে বললো, “মা, আমি গর্বিত। তুমি আমার শিক্ষা সম্মান করেছো।”

এ কথাটুকুই এলিজার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে থাকলো।

সেদিন সকালে পিটার পরলোকগমন করলেন। গীর্জার ঘণ্টা বাজলো। পুরো পাড়া নীরব হয়ে গেলো। এলিজা বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। চোখে জল, কিন্তু মন ভাঙেনি।

পিতার মৃত্যুর পরেও এলিজা বাবার শেখানো জীবন আঁকড়ে ধরলো। শোক তাকে ভেঙে দিতে পারেনি, বরং ভেতরে ভেতরে আরও শক্ত করে তুলেছিলো। গীর্জার ইটের মেঝেতে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হতো, বাবা যেনো এখনো পাশে পাশে হাঁটছেন। প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি সেবায় সে বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেতোÑ“মা, দায়িত্ব থেকে কখনো পালাবে না।”

এলিজা গীর্জার কাজ আরও নিয়মিতভাবে শুরু করলো। শিশুরাদের পড়াতো, অসহায়দের খাবার দিতো, বৃদ্ধদের পাশে বসে তাদের কষ্টের কথা শুনতো। অনেকে জিজ্ঞেস করতো, “তুমি এতো কষ্ট করছো কেনো?” এলিজা শান্ত কণ্ঠে বলতো, “বাবা শিখিয়েছেন।” এই ছোট্ট উত্তরেই যেনো তার জীবনের সমস্ত দর্শন লুকিয়ে থাকতো।

সমাজ আবারও বিয়ের কথা তুললো। কেউ সহানুভ‚তির সুরে বললো, কেউ উপদেশের ভঙ্গিতে। এলিজা কারো কথায় রাগ করলো না, ভয়ও পেলো না। সে জানতো, বিয়ে জীবনের শেষ লক্ষ্য না, দায়িত্ববোধই আসল পরিচয়। বাবার শেখানো জীবন তাকে এ সাহস দিয়েছিলো।

প্রতিমাসে সে বাবার কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াতো। ফুল রাখতো, চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করতো। তার মনে হতো, বাবা হারিয়ে যাননিÑতিনি তার চরিত্রের ভেতর, কাজের ভেতর, বিশ্বাসের ভেতর বেঁচে আছেন।

একদিন গীর্জার ফাদার জন বললেন, “এলিজা, তুমি অনেকের জন্য উদাহরণ।” কথাটা শুনে এলিজা মাথা নিচু করলো। তার চোখে জল এলো, কিন্তু সেই জল ছিলো দুর্বলতার না, কৃতজ্ঞতার।

সে বুঝলো, বাবার শেখানো শিক্ষা শুধু তার নিজের জন্য নাÑএটা সমাজের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য। একজন অবিবাহিত মেয়ে হয়েও সে সম্পূর্ণ মানুষ হতে পারে, শক্ত হতে পারে, সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে।

গল্পটা এখানেই শেষ হলেও শিক্ষাটা শেষ হয় না। কারণ এই জগতে জন্মদাতা পিতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর তার শেখানো জীবনÑসত্যিই মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি মৃত্যুর পরেও মানুষের পথ দেখায়।

বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

You might like