১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বন্ধ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া, কার্যকর যেভাবে

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক :

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেছে। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে পাশ হওয়া আইনটি এতদিন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল। আইনটির প্রতিপালনে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যাতে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারে, সে কারণেই তাঁদেরকে এক বছর সময় দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।

এবারে আইনটি বাস্তবায়নের পালা। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) থেকেই অস্ট্রেলিয়াজুড়ে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন এই আইন। অর্থাৎ, আগামীকাল থেকে টিকটক, এক্স, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট ও থ্রেডসের মতো প্রধান প্রধান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে পারবে না দেশটির ১৬ বছরের কম বয়সী নাগরিকরা।

এর ফলে যাদের বয়স ১৬ বছরের কম, তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারবে না। আর যাদের ইতোমধ্যেই অ্যাকাউন্ট আছে, তাদের বিদ্যমান প্রোফাইলগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হবে।

এভাবে বয়সের ভিত্তিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার আইনটি যেহেতু অস্ট্রেলিয়াতেই প্রথম, তাই সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমন একটি আইন বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নতুন। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, কীভাবে কার্যকর করা হবে আইনটি।

এখানে আরও কয়েকটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে। এই যেমন, আইনটি করার পেছনে মূল কারণ কী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে কোন প্ল্যাটফর্মগুলো, কতটা সফল হবে এই নিষেধাজ্ঞা, ডেটা সুরক্ষার কী হবে, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া, এবং সর্বোপরি নিষেধাজ্ঞার এই আইনটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?

কেন এই আইন?

অস্ট্রেলিয়া সরকারের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ডিজাইন ফিচারগুলো’ তরুণদেরকে স্ক্রিনে বেশি সময় কাটাতে উৎসাহিত করে। সেই সাথে প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমন কন্টেন্ট থাকে যেগুলো তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। তাই সরকার চাইছে, তরুণদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব কমে আসুক।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে ১৬ বছরের কম বয়সীরাই কেন?

২০২৫ সালের শুরুর দিকে সরকার কর্তৃক পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ৯৬ শতাংশই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে এবং এদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ক্ষতিকর কন্টেন্টের সংস্পর্শে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীবিদ্বেষী কন্টেন্ট এবং সহিংসতা ও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে এমন কন্টেন্টও।

সরকারি সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন ব্যক্তি বড়দের (প্রাপ্তবয়স্ক বা অপেক্ষাকৃত বড় বাচ্চাদের) কাছ থেকে গ্রুমিং-এর মতো আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া অর্ধেকেরও বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

কোন কোন প্ল্যাটফর্ম নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে?

বর্তমানে ১০টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, থ্রেডস, টিকটক, এক্স, ইউটিউব, রেডিট এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিক ও টুইচ। তবে ইউটিউব কিডস, গুগল ক্লাসরুম এবং হোয়াটসঅ্যাপকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।

অস্ট্রেলীয় সরকার তিনটি প্রধান মানদণ্ডের ভিত্তিতে সম্ভাব্য সাইটগুলোকে মূল্যায়ন করে থাকে। এগুলো হলো:

(১) প্ল্যাটফর্মটির একমাত্র বা ‘গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য’ দুই বা ততোধিক ব্যবহারকারীর মধ্যে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের (সোশ্যাল ইন্টার‍্যাকশনের) সুযোগ তৈরি করা কিনা;

(২) এটি একজন ব্যবহারকারীকে অন্যান্য সকল ব্যবহারকারী বা কিছু সংখ্যক ব্যবহারকারীর সাথে যোগাযোগ করতে দেয় কিনা; এবং

(৩) এটি ব্যবহারকারীদেরকে কন্টেন্ট পোস্ট করার অনুমতি দেয় কিনা।

ইউটিউব কিডস, গুগল ক্লাসরুম এবং হোয়াটসঅ্যাপ এই মানদণ্ডগুলোর আওতায় পড়ে না বলেই সরকার এগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখেনি। আর তাই ১৬ বছরের কম বয়সীরা এই ধরণের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বেশিরভাগ কন্টেন্ট দেখতে পারবে, যেগুলোর জন্য অ্যাকাউন্ট খোলারও প্রয়োজন হয় না। তবে সমালোচকরা অনলাইন গেমিং সাইটগুলোতেও এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

আইনটি কীভাবে কার্যকর করা হবে?

এই আইন লঙ্ঘনের জন্য শিশু বা তাদের বাবা-মাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না। বরং, আইন ভাঙলে বা বারবার নিয়ম লঙ্ঘন করলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে ৪৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

সরকার বলেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ’ নিতে হবে যাতে করে তাঁদের প্ল্যাটফর্ম থেকে শিশুরা দূরে থাকে। পাশাপাশি একাধিক বয়স যাচাইকরণ প্রযুক্তিও ব্যবহার করতে হবে প্ল্যাটফর্মগুলোকে। এর মধ্যে থাকতে পারে:

(১) সরকারি আইডি
(২) মুখ বা কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ
(৩) অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে বয়স অনুমান করার প্রযুক্তি (এজ ইন্টারফেস)

প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু ব্যবহারকারী বা তাদের বাবা-মায়ের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস-এর মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা ৪ ডিসেম্বর থেকেই কিশোর-কিশোরীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা শুরু করেছে। স্ন্যাপচ্যাট জানিয়েছে যে, ব্যবহারকারীরা যাচাইকরণের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ফটো আইডি বা সেলফি ব্যবহার করতে পারবে।

এই নিষেধাজ্ঞা কতটা সফল হবে?

এই আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে নানা আশঙ্কা রয়েছে। অনেকে ভয় পাচ্ছেন যে, বয়স যাচাইকরণ প্রযুক্তি ভুলবশত প্রাপ্তবয়স্কদের ব্লক করতে পারে বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হতে পারে। সরকারের নিজস্ব প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, চেহারা মূল্যায়নের প্রযুক্তি কিশোর-কিশোরীদের জন্য সবচেয়ে কম নির্ভরযোগ্য।

এছাড়াও জরিমানার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাক্তন ফেসবুক নির্বাহী স্টিফেন শিলার জানিয়েছেন, ‘মেটার ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার আয় করতে প্রায় এক ঘণ্টা ৫২ মিনিট সময় লাগে।’ অর্থাৎ, জরিমানার অঙ্ক বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর খুব বেশি প্রভাব নাও ফেলতে পারে।

অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞার সীমিত পরিধি (যেমন ডেটিং ওয়েবসাইট, গেমিং প্ল্যাটফর্ম, এবং এআই চ্যাটবট বাদ দেওয়া), এর উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষিত করা আরও কার্যকর হতো।

অনেক কিশোর-কিশোরী ইতোমধ্যেই নকল প্রোফাইল তৈরি করার কথা বিবিসিকে জানিয়েছে। অনেকে আবার তাদের বাবা-মায়ের সাথে যৌথ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে শুরু করেছে। এছাড়া অনেকে মনে করছেন যে, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অস্ট্রেলিয়াতে ভিপিএন (যা ব্যবহারকারীর অবস্থান গোপন করে) ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে, যেমনটা এর আগে যুক্তরাজ্যে দেখা গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার যোগাযোগ মন্ত্রী অন্নিকা ওয়েলস অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞা ‘নিখুঁত’ নাও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মাঝপথে এটি কিছুটা অগোছালো লাগতে পারে। বড় ধরনের সংস্কারে তা সবসময়ই হয়ে থাকে।’

ডেটা সুরক্ষার কী হবে?

ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই করার জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে সমালোচকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে, এই আইনে ব্যক্তিগত ডেটার জন্য ‘শক্তিশালী সুরক্ষা’ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, ডেটা শুধুমাত্র বয়স যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে এবং পরবর্তীতে তা ধ্বংস করতে হবে, যা লঙ্ঘন করলে ‘গুরুতর শাস্তির’ বিধান রাখা হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া কী?

২০২৪ সালের নভেম্বরে এই নিষেধাজ্ঞাটি ঘোষণার সময় সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, আইনটি বাস্তবায়ন করা কঠিন, এড়ানো সহজ এবং ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার জন্য এটি ঝুঁকি তৈরি করবে। তাদের আশঙ্কা, এই আইন শিশুদেরকে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে ঠেলে দিতে পারে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

ইউটিউব এবং স্ন্যাপচ্যাট নিজেদেরকে সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গণ্য করে না বলে জানায়। ইউটিউব জানায়, ‘তাড়াহুড়ো করে আনা’ এই আইন শিশুদেরকে আরও অসুরক্ষিত করে তুলবে। কেননা তারা অ্যাকাউন্ট ছাড়াই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতে পারবে, ফলে তাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ‘পিতামাতার নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ফিল্টারগুলো’ আর কাজ করবে না।বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেছে। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে পাশ হওয়া আইনটি এতদিন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল। আইনটির প্রতিপালনে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যাতে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারে, সে কারণেই তাঁদেরকে এক বছর সময় দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।

মেটা সতর্ক করে বলেছে যে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কিশোর-কিশোরীরা ‘তাদের ব্যবহৃত অ্যাপগুলোতে অসঙ্গতিপূর্ণ সুরক্ষা’ পাবে। তবে টিকটক এবং স্ন্যাপ সংসদীয় শুনানিতে জানিয়েছে, বিরোধিতা করলেও তাঁরা আইনটি মেনে চলবে। রেডিট জানিয়েছে, তাঁরা আইনটি মেনে চলবে যদিও এর সাথে তাঁরা একমত নয়, কারণ এটি ‘সবার স্বাধীন মত প্রকাশ এবং গোপনীয়তার অধিকারকে দুর্বল করে।’

সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড

You might like