

দশ বছরের দীর্ঘশ্বাস ও এক বাবার শেষ আকুতি: “মরার আগে তনু হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই”
জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, কুমিল্লা | ০৬ এপ্রিল ২০২৬
দীর্ঘ ১০টি বছর ধরে হৃদয়ে পাথর বেঁধে দিন গুনছেন এক বাবা। ২০১৬ সালের সেই কালরাত থেকে ২০২৬-এর আজকের সকাল—মাঝখানে কেটে গেছে ৩৬৭০টি দিন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও অধরা। তবে গতকাল ও আজকের আদালত সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম তনুর পরিবারকে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।

তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। মামলার ষষ্ঠ তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হাজির হয়ে তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। এই তিন ব্যক্তি হলেন— সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক জাহাঙ্গীর আলম। তনুর পোশাকে পাওয়া অজ্ঞাত তিন পুরুষের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে এই তিনজনের প্রোফাইল মিলিয়ে দেখতে চায় তদন্ত সংস্থা পিবিআই। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক আবেদনটি গ্রহণ করে পর্যালোচনার জন্য রেখেছেন।
এর আগে গত রবিবার (৫ এপ্রিল) মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে আদালত থেকে পিবিআই-কে তলব করা হয়েছিল। দীর্ঘ চার বছর তদন্তের পর পিবিআই-এর বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, এখনই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব না হলেও মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তারা আদালতকে জানিয়েছেন।
“মরার আগে বিচার দেখে যেতে চাই”
আজ আদালতে উপস্থিত ছিলেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন। বার্ধক্যের ছাপ আর দীর্ঘদিনের ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া এই বাবার কণ্ঠে ছিল শুধু হাহাকার। ১০ বছর আগে যে সেনানিবাস এলাকায় মেয়ের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, সেই স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আদালত প্রাঙ্গণে কান্নায় ভেঙে পড়ে ইয়ার হোসেন। আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তনুর বৃদ্ধ বাবা ইয়ার হোসেনের চোখে ছিল জল আর কণ্ঠে আজন্ম হাহাকার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পার হয়ে গেছে। সেনানিবাস এলাকা, থানা, সিআইডি আর ঢাকার পিবিআই অফিসে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি ক্লান্ত। কত দপ্তরে যে অসংখ্যবার সাক্ষ্য দিয়েছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। আজ নতুন সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি—মরার আগে যেন আমার মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি।”
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ টিউশনি শেষ করে বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। পরে সেনানিবাস এলাকার পাওয়ার হাউসের অদূরে জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর তদন্তভার হাতবদল হয়েছে দফায় দফায়—থানা পুলিশ থেকে ডিবি, ডিবি থেকে সিআইডি এবং সবশেষে ২০২০ সালে পিবিআই। চার সংস্থা আর ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও ১০ বছরে একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এমনকি দুই দফা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়েও ছিল ধোঁয়াশা।
এখন মামলার সবটুকু ভরসা আটকে আছে সেই ডিএনএ নমুনার ওপর। সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে তনুর পোশাকে যে তিনজন পুরুষের বীর্য ও ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল, তার সঙ্গে সন্দেহভাজনদের নমুনা মিললেই কেবল এই দীর্ঘ বিচারহীনতার অবসান ঘটতে পারে। তনুর পরিবারের প্রতীক্ষা এখন সেই ডিএনএ রিপোর্টের দিকে, যা হয়তো এক বাবার দশ বছরের দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটাবে।
এদিকে তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার দাবি করে শুরু থেকে আন্দোলন করে আসা অন্যতম সংগঠন চলচ্চিত্র মঞ্চ এর পরিচালক খায়রুল আনাম রায়হান এবং তনুর ভাই রুবেল হোসেন বলেন, এর আগেও বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। তখন এর ফলাফল সম্পর্কে কাউকে অবগত করা হয়নি। সিআইডির যে কর্মকর্তা তদন্তে ছিলেন, তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের ধারণা, আজকের ঘটনাটিও লোক দেখানো। তবে আমরা চাই সত্য উদঘাটন হোক।
তারা বলেন, একটি খুনের বিচার পেতে একটি দশক কি যথেষ্ট নয়? এই প্রশ্ন এখন কুমিল্লা সেনানিবাসের সেই নিভৃত কোণ থেকে শুরু করে সারা দেশের মানুষের মুখে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ যে অন্ধকার রাতে সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ জঙ্গলে পড়ে ছিল, সেই অন্ধকারের কুয়াশা ১০ বছর পরও কাটেনি। তবে ২০২৬ সালের ৫ ও ৬ এপ্রিলের আদালত সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম তনুর পরিবারকে নতুন করে এক চিলতে আশার আলো দেখাচ্ছে।
সর্বশেষ গত বছরের (২০২৫) ৭ এপ্রিল বিকালে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ওই তদন্ত কর্মকর্তা। পিবিআইয়ের তদন্ত টিম মামলার বাদী তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেনের সঙ্গে তার অফিসে গিয়ে কথা বলেন। পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম এ মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা।
প্রকাশিত : সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.
















