

হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর), ১৮ এপ্রিল ২০২৬:
হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে কুকুর-বিড়ালের জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পোষা প্রাণীর মালিকরা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ করা ভ্যাকসিন পেতে গেলে প্রথমে ‘স্টক নেই’ বলে চাঁদপুর জেলা সদরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কর্মচারীদের ‘খরচ’ বাবদ ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে মিলে যাচ্ছে সেই ভ্যাকসিন।
সরেজমিনে একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে ও তিনদিন হাসপাতালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকার প্রাণীপ্রেমী ও সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের বয়ানে ভোগান্তির চিত্র
হাজীগঞ্জ পৌরসভার মকিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইসলাম গত সপ্তাহে তার পোষা বিড়ালের বার্ষিক র্যাবিস ভ্যাকসিন দিতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যান। তিনি বলেন, “কাউন্টারে যাওয়ার পর এক কর্মচারী জানালেন ভ্যাকসিন শেষ। চাঁদপুর জেলা হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বললেন। আমি যখন ফিরে আসছিলাম, তখন ওই কর্মচারীই আস্তে করে বললেন, ‘স্যার, খরচপাতি দিলে ব্যবস্থা করা যাবে’। ২০০ টাকা দেওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমার বিড়ালকে ভ্যাকসিন দিয়ে দেওয়া হলো।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন বাকিলা ইউনিয়নের গৃহিণী শারমিন আক্তার। তার দুটি দেশি কুকুর রয়েছে। “গরিব মানুষ, কুকুর দুটিকে ভালোবাসি। সরকারি হাসপাতালে বিনা পয়সায় টিকা দেয় শুনে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনি টিকা নাই। পরে এক আয়া বললেন, ১০০ টাকা করে দিলে প্রতি কুকুরে টিকা পাওয়া যাবে। বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা দিয়েছি। টাকা না দিলে আমার কুকুরগুলোর টিকা হতো না,” বলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক তরুণ জানান, তিনি গত এক মাসে তিনবার গিয়েছেন। প্রথম দুবার ‘ভ্যাকসিন নেই’ শুনে ফিরে এসেছেন। তৃতীয়বার এক পরিচিতজনের পরামর্শে ১৫০ টাকা ‘চা-নাস্তার খরচ’ দিতেই কাজ হয়ে যায়।
এ ছাড়াও কামরুন নাহার রুমা নামে এক সাংবাদিকের স্ত্রী বলেন, ‘ওনাদেরকে টাকা না দিলে ভ্যাকসিন নেই বলে চাঁদপুরে পাঠিয়ে দেয়, আর যদি ২শ’ টাকা ‘খরচ’ দেয় তাহলে ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, তারপরের বার ভ্যাকসিন দিতে এলেও তারা ৫০-১০০ টাকা করে চায়, তাই আমি দুইবার ভ্যাকসিন দিয়ে তৃতীয়-চতুর্থ বার এখানে আর আসিনি। সরকারি ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে গেলে টাকা না দিলে তারা ভ্যাকসিন দিতে চায় না, তাছাড়া তারা বাইরে থেকে সিরিঞ্জ কিনেও আনতে বলে, অথচ সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যেই সরকার সিরিঞ্জ দিয়ে থাকে রোগীদের জন্য।
যেভাবে চলছে ‘খরচের’ কারবার
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ভবনের টিকাদান কক্ষের সামনে কোনো মূল্য তালিকা বা ভ্যাকসিনের মজুদের তথ্য টানানো নেই। সেবাপ্রার্থীরা এলে প্রথমে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বা আয়া তাদের সঙ্গে কথা বলেন। সরকারি সরবরাহ থাকলেও প্রাথমিকভাবে ‘নেই’ বলা হয়। সেবাগ্রহীতা নাছোড়বান্দা হলে বা অসহায়ত্ব প্রকাশ করলে তখন ‘খরচের’ প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১০০ থেকে ২০০ টাকার এই ‘খরচ’ কোনো রসিদ ছাড়াই নেওয়া হয়।
একটি সূত্র জানায়, উপজেলা পর্যায়ে প্রতি মাসে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক র্যাবিস ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ভ্যাকসিনগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পোষা ও বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালকে দেওয়ার কথা। কিন্তু মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এই টাকা আদায় করা হচ্ছে।
কী বলছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, “কুকুর-বিড়ালের জলাতঙ্কের টিকা সরকারিভাবে সম্পূর্ণ ফ্রি। এখানে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কেউ নিয়ে থাকে, সেটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও দুর্নীতি।”
‘ভ্যাকসিন নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে আমাদের সরবরাহ কম থাকে। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পেলে আমরা সিরিয়াল মেইনটেইন করি বা জেলা হাসপাতালে রেফার করি। তবে স্টকে ভ্যাকসিন রেখে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা খুবই দুঃখজনক। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
টাকার বিনিময়ে ভ্যাকসিন পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। আমার অফিসের কোনো কর্মচারী এমন কাজে জড়িত থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তবে অফিসের একজন অফিস সহায়কের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি পরিচয় জানার পর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জেলা কর্মকর্তার বক্তব্য
চাঁদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বখতিয়ার উদ্দিন জানান, প্রতি মাসে হাজীগঞ্জ উপজেলায় গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ ডোজ র্যাবিস ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। “চাহিদা বেশি থাকলে আমরা অতিরিক্ত বরাদ্দও দিই। হাজীগঞ্জ থেকে গত তিন মাসে ‘ভ্যাকসিন সংকট’ নিয়ে কোনো চাহিদাপত্র আমরা পাইনি। সুতরাং সেখানে টিকা থাকার কথা,” বলেন তিনি।
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি কেউ টাকার বিনিময়ে টিকা দেয়, সেটা ফৌজদারি অপরাধ। ভুক্তভোগীদের ৩৩৩ নম্বরে কল করে বা সরাসরি আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বলুন। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।”
জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে গড়ে ২ হাজার মানুষ মারা যায়। এর প্রধান কারণ কুকুরের কামড় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব। সরকার এ কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে গণটিকা কার্যক্রম চালাচ্ছে।
চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা মিলি বলেন, “জলাতঙ্ক শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু একবার হলে মৃত্যুহারও শতভাগ। পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দেওয়া শুধু প্রাণীটির জন্য নয়, মানুষের জন্যও সুরক্ষা। এই জায়গায় ১০০-২০০ টাকার দুর্নীতি মানে আমরা জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছি। যারা টাকা দিতে পারবে না, তারা টিকাই দেবে না। ফলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়বে।”
আইন কী বলে
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী, সরকারি সেবা দিতে কোনো কর্মচারী উপঢৌকন বা অবৈধ অর্থ দাবি করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, এটি অসদাচরণ এবং এর জন্য চাকরিচ্যুতিও হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি
হাজীগঞ্জ এর একজন সাংবাদিক বলেন, “এটা নতুন কিছু না। হাসপাতাল, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস—সবখানেই ‘খরচ’ ছাড়া ফাইল নড়ে না। কিন্তু ভ্যাকসিনের মতো জীবনরক্ষাকারী জিনিস নিয়ে এমন করা অমানবিক। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক এবং হাসপাতালে সিসি ক্যামেরা ও অভিযোগ বক্স স্থাপন করুক।”
‘হাজীগঞ্জ এনিমেল লাভারস’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ক তানজিনা তাবাসসুম বলেন, “আমরা বেওয়ারিশ কুকুরদের বন্ধ্যাত্বকরণ ও টিকাদান নিয়ে কাজ করি। সরকারি হাসপাতালের অসহযোগিতার কারণে আমাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই প্রতিদিন কয়টা ভ্যাকসিন আসলো, কয়টা দেওয়া হলো তার তালিকা নোটিশ বোর্ডে টানানো হোক।”
সমস্যার সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা সমাধানে তিনটি জিনিস জরুরি:
1. স্বচ্ছতা: প্রতিদিনের ভ্যাকসিনের মজুদ ও বিতরণের হিসাব নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা। সেবার রেট চার্ট টানানো, যেখানে ‘বিনামূল্যে’ কথাটি বড় করে লেখা থাকবে।
2. জবাবদিহিতা: অভিযোগ কেন্দ্র চালু করা এবং মোবাইল নম্বরসহ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ্যে টানানো। গোপন ক্যামেরায় মনিটরিং বাড়ানো।
3. সচেতনতা: মানুষকে জানাতে হবে যে এই টিকার জন্য কোনো টাকা লাগে না। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও মসজিদের মাইকে প্রচার করা যেতে পারে।
১০০ বা ২০০ টাকা হয়তো অনেকের কাছে সামান্য। কিন্তু এই সামান্য টাকার জন্য যখন একজন নিম্নবিত্ত মানুষ তার পোষা প্রাণীকে টিকা না দিয়ে ফিরে যায়, তখন ঝুঁকিতে পড়ে পুরো এলাকা। হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সামনে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘সেবাই ধর্ম’। সেবাগ্রহীতারা চান, কথাটি শুধু সাইনবোর্ডে নয়, বাস্তবেও প্রতিফলিত হোক।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। অভিযোগ প্রমাণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সেবা সহজীকরণে আমরা নোটিশ ও হেল্পলাইন চালু করব।”
[প্রতিবেদনটি অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি]
প্রকাশিত : শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.














