

মিজানুর রহমান রানার
ক্রাইম থ্রিলার পঞ্চম পর্ব

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
৫.
মানুষের শরীরের ব্যথা ঔষধে সারানো যায়, কিন্তু হৃদয়ের ব্যথা কোনো ঔষধে সারানো যায় না, এর জন্য ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। ভালো কথার প্রয়োজন হয়।
বিশাল সমুদ্রের পাড়ে বসে কথাগুলো ভাবছিলো তুষার আহমেদ। গত ক’দিন যাবত এক সাইকোর পেছনে ছুটতে গিয়ে সময় ব্যয় করে করে ক্লান্ত তাদের টীম। কিন্তু সাইকোটার কোনো হদিসই পায়নি তারা। যে মেয়েগুলোকে সে নির্যাতন করে করে মেরেছে, তাদের মুখগুলো ভেসে উঠে তার হৃদয়ে, তখনই হৃদয়ের ব্যথা শুরু হয়। একজন গোয়েন্দা হয়েও সে নিজকে স্থির রাখতে পারছে না, ওহ কি সাংঘাতিক!
ঠিক এই সময়েই তাসফিয়ার কল এলো, তুষার আহমেদ রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে একটা চিৎকার শোনা গেলো। তাসফিয়া কাউকে যেনো বলছে, ‘এই খবরদার আমার কাছে আসবে না, কে তুমি?’
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তুষার প্রশ্ন করলো, ‘তাসফিয়া কী হয়েছে? কাকে কী বলছো তুমি?’
তাসফিয়া ফিস ফিস করে বললো, ‘তুষার আমার বাসায় একটা লোক প্রবেশ করছে, লোকটা অদ্ভুত টাইপের, গায়ে বিশাল কালো কোট, মাথায় হ্যাট, মুখটা ভয়ঙ্কর। তুমি আমাকে বাঁচাও।’
‘আমি এখনই আসছি তাসফিয়া।’ এই বলে তুষার গাড়িতে উঠে বসলো।
লোকটা ক্রমশঃ তাসফিয়ার কাছে আসছে, তার হাতে কালো একটা লাঠি। তাসফিয়া আবারও বললো, ‘তুমি বাসায় প্রবেশ করলে কীভাবে? কী চাও তুমি?’
লোকটা চাপা গলায় বললো, ‘আমি যা চাই সেটা তুমি এখনই বুঝতে পারবে।’ এই বলে লোকটা দ্রুত তাসফিয়ার কাছে এলো এবং তার নাকমুখ রুমাল চেপে ধরলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে পড়লো তাসফিয়া। লোকটা অজ্ঞান তাসফিয়াকে বাইরে এনে গাড়িতে তুললো, তারপর চলে গেলো অজানার উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তুষার বাসায় এসে দেখলো দরজা খোলা, তাসফিয়া নেই। পুরো বাসার সব রুম, বাথরুম তন্নতন্ন করে খুঁজলো তাসফিয়াকে পেলো না। তার নাম্বারে কল করলো, কিন্তু ফোনটা বন্ধ পাওয়া গেলো।
কি করবে ভেবে পাচ্ছে না তুষার। হঠাৎই তার খেয়াল হলো, আরো বিষয়টা টীম লিডার ইরফানকে জানানো দরকার। তুষার সাথে সাথেই ইরফানকে কল করলো এবং বিষয়টা বিস্তারিত জানালো।
ইরফান বললো, ‘তুষার, তুমি ওখানেই থাকো, আমি পুরো টীম নিয়ে আসছি।
তাসফিয়ার যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন সে চোখ খুলে দেখতে পেলো একটা কুটিরে শুয়ে আছে সে। বাইরে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির গর্জন শোনা যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে উঠতে চাইলো কিন্তু তার হাতপা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে।
কালো লম্বা কোট পরা লোকটা কিছুক্ষণের মধ্যেই কামরায় প্রবেশ করলো, ‘হাই, কেমন আছো তাসফিয়া?
এবার হালকা আলোতে তাসফিয়া লোকটার মুখের অবয়ব দেখতে পেলো, লোকটাকে সে কোথায়ও দেখেছে বলে মনে হচ্ছে কিন্তু মনে করতে পারছে না।
‘কী ভাবছো, এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারবে? তা হবে না, তোমাকে আজ রাতেই সমুদ্রপথে পাচার করে দেওয়া হবে মিডল-ইস্ট, সেখানে শেখদের মহারাণী হয়ে থাকবে।’
‘তুমি তাহলে আদমপাচারকারী দলের সদস্য?’
‘না, সদস্য না, আমি নিজেই সব। আমার রাজত্বে আমিই বস। আমার চেলাপেলারা অন্য কাজ করে, তুমি হচ্ছো রাঘববোয়াল, একজন গোয়েন্দার প্রেমিকা। তোমাকে তুলে আনতে তো আর চেলাপেলা পাঠালে হয় না, তাই না?’
মিষ্টি করে হাসলো তাসফিয়া।
‘হাসছো কেন? ভাবছো তোমার প্রেমিক তুষার এখানে এসে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে?’
‘না। সেটা নয়, ভাবছি তুমি কত ভালো মানুষ। এই দেশের ফকিন্নিদেরকে তুমি বিনা পয়সায় মিডল-ইস্ট পাঠিয়ে রাজরাণী বানিয়ে দিচ্ছো, তোমার তো তুলনা হয় না মিস্টার ..।’
‘জামশেদ, জামশেদ আমার নাম।’
‘ওহ, তোমাকে না ইরফান মেরে সাগরে ফেলে দিয়েছিলো একবার?’
‘শয়তানরা কখনোই মরে না, রূপ পাল্টায়। বুঝতে পারছো? আমি বেঁচে আছি, বেঁচে থাকবো।’ হো হো করে হাসলো জামশেদ।
তাসফিয়ার মনে হলো আসলেই সে একটা মানুষরূপী শয়তান।
গাড়িতে করে ইমতিয়াজ অনন্যা তুষার ও রাশমিকাকে নিয়ে ছুটে চলছে ইরফান। সাথে সজলও আছে। ইরফান সজলকে প্রশ্ন করলো, ‘সজল কোনো ক্লু পেয়েছো তাসফিয়ার বিষয়ে?’
‘স্যার, টেকনাফের একটা বস্তি আছে, সেখানে পাচারকারীরা তরুণী মেয়েদেরকে নিয়ে জমা করে পাচারের জন্য। আমরা সেখানেই যেতে পারি।’
‘ওকে, তাহলে ঠিক আছে। আমরা সেখানেই যাবো আগে।’
তুষারের চোখে অশ্রু জমা হচ্ছে ভাবছে তাসফিয়ার কথা। আর কিছুদিন পরই তাদের বিয়ে হতো। কিন্তু কোন দুষ্টচক্র তাদের ভালোবাসার আনন্দে বিষ ঢেলে দিলো।
তুষারের চোখে অশ্রু দেখে অনন্যা বললো, ‘কাঁদছো কেন তুষার? আমরা অবশ্যই তাসফিয়াকে ফিরে পাবো এবং অক্ষত। আর সেই সাথে অপহরণকারীকেও ধরবো, তুমি চিন্তা করো না এবং ধৈর্য্য ধরো।’
এই সময়েই তুষারের মুঠোফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো, রিসিভ করতেই লোকটা বলে উঠলো, ‘আমি জানি তোমরা আসছো, কিন্তু কোনো লাভ হবে না, না আমাকে ধরতে পারবে, না তোমার প্রেমিকাকে ফিরে পাবো, বেহুদা কষ্ট করছো।’
‘কে তুমি?’
‘আমার নাম জামশেদ।’ অপরপ্রান্তে হাসির শব্দ শোনা গেলো।
ইরফান প্রশ্ন করলো, ‘কার কল ছিলো ওটা?’
‘জামশেদ।’ ভাবতে ভাবতে উত্তর দিলো তুষার।
‘জামশেদ? ওকে তো আমরা ক’বছর আগে মেরে সাগরে ফেলে দিয়েছিলাম, সে ফিরে এলো কীভাবে?’
‘জানি না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলো তুষার। ইমতিয়াজ অনন্যা ও রাশমিকা কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেলো।
এবার মি. আজিমের কল এলো ইরফানের মুঠোফোনে, তিনি বিষয়টা জানতে চাইলেন, ইরফান সব খুলে বললো। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘জামশেদ তাহলে মরেনি? তাকে তো তোমরা গুলি করে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলে, তাহলে সে বেঁচে ফিরলো কীভাবে?’
‘আমি বুঝতে পারছি না, তবে সত্যিই বিষয়টা কী? তা উদ্ঘাটন করে আপনাকে শীঘ্রই জানাবো স্যার।’
ইরফান ফোনটা কেটে দিয়ে তুষারের দিকে তাকাল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
“জামশেদের লাশ আমিই শনাক্ত করেছিলাম, তুষার। ডিএনএ ম্যাচ করেছিল তাহলে আজকের কণ্ঠটা কার ছিল?” প্রশ্ন করলো ইমতিয়াজ।
দূরে সমুদ্রের বুকে তখন একটা লাল সিগন্যাল লাইট তিনবার জ্বলে নিভে গেল, যেন কেউ ওদের দেখছে।
তাসফিয়া বাঁধা অবস্থায় কিছু একটা করে ফেলেছে, যেটা জামশেদ মোটেও টের পায়নি।
কুটিরের বাঁশের বেড়ায় নখ দিয়ে খুঁচিয়ে তাসফিয়া তিনটা শব্দ লিখল: “J ≠ J”। তারপর ঠোঁট কামড়ে হাসল। “তুষার, তুমি কোডটা ধরতে পারলে আমাকে পাবে।”
বাইরে তখন জামশেদ তার লোকদের হুকুম দিচ্ছে, “বোট রেডি কর, মাল আজ রাতেই চালান হবে।”
এবার তাসফিয়ার মুঠোফোন থেকে তুষারের মুঠোফোনে কল এলো, তুষার রিসিভ করতেই জামশেদ ফিসফিস করে বলল, “তুষার, তোমার প্রেমিকার নিঃশ্বাস এখন আমার হাতে। তিনটা ঢেউয়ের পরে চতুর্থ ঢেউটা যখন তীরে আছড়ে পড়বে, তার আগেই আমাকে খুঁজে বের করো। নইলে… সমুদ্রই হবে তোমার প্রেমিকার কবর।”
লাইন কেটে গেল। গাড়ির সবাই একসাথে ঘড়ি দেখল। জোয়ার শুরু হতে আর ৪৭ মিনিট বাকি।
তুষার চোখ মুছে বললো ‘ও আমার তাসফিয়াকে ছুঁয়েছে ইরফান স্যার। এবার ওকে আমি সমুদ্রেই কবর দেব — জ্যান্ত।’
(চলবে)
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ২য় পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৩য় পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৪র্থ পর্ব
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ খ্রি.
















