

মিজানুর রহমান রানার ক্রাইম থ্রিলার : পর্ব ৬ (পূর্ব প্রকাশিতের পর)
‘পৃথিবীতে মানুষ আসে শুধু মৃত্যুর জন্য, মাঝে কিছুদিন খায়-দায়, ঘুরে ফিরে জীবনকে উপভোগ করে তারপর আস্তে আস্তে জ্বর, কাশি, ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন রোগে ভোগে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই ধাবিত হয়।’

আরমানের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো আলী নেওয়াজ। আরমান ও বুলবুল বসের দিকে তাকিয়ে আছে। বসের সামনে একটা লম্বা কালো দেওয়াল ঘড়ি ঝুলছে সেটায় ঘণ্টা শেষ হলে টুটাং শব্দ হয়। আলী নেওয়াজ সেদিকে তাকিয়ে বললো, ‘বুঝলে আরমান, এই ঘড়িটা মানুষকে সময় দেখায়, আবার সময়ের ঝাঁতাকলে সেও একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়, দম ফুরিয়ে ডাস্টবিনে পড়ে থাকে। পৃথিবীতে মানুষও এমন, যখন শক্তি আছে তখন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কত ঘটনা অঘটন ঘটায় কিন্তু সময় শেষের পথে ওই পরিণতিই ভোগ করে, যার তার কপালে লেখা থাকে।’
‘বস কথাগুলো শুনে ভালো লাগলো, একটা নতুন খবর আছে।’
‘বলো, নতুন খবর কি?’
‘জামশেদ বেঁচে আছে।’
‘তাই নাকি, কোথায় এখন সে?’
‘আমার জানামতে সে গোয়েন্দা তুষারের প্রেমিকা তাসফিয়াকে অপহরণ করে টেকনাফের একটা বস্তিতে আছে, হয়তো কিছুক্ষণ পরই তাকে দেশের বাইরে পাচার করে দিবে।’
‘হ্যাঁ, তার তো এটাই ব্যবসা, পৃথিবীর যত অঘটন ঘটানোর দায়িত্ব পেয়েছে ওই শয়তানটা, আমাদের কি কিছু করার আছে?’
‘আসলে ইরফানের পুরো টীম সেদিকেই যাচ্ছে, হয়তো তার আগেই মেয়েটা পাচার হয়ে যাবে।’
‘তোমরা দু’জন যাও, দেখো জামশেদের কী অবস্থা, প্রয়োজন হলে অ্যাকশানে যাবে, জামশেদের সাথে পুরোনো হিসাব নিকাশ বাকি আছে। সেগুলো মিট করতে হবে।’
আরমান বুলবুলকে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো, তারপর ছুটে চললো টেকনাফের উদ্দেশ্যে।
সম্পা ধীরে ধীরে আলী নেওয়াজের বিশাল বাড়িতে প্রবেশ করলো, আলী নেওয়াজ তাকে দেখে বললো, ‘মা-মনি তুমি এতোক্ষণ কোথায় ছিলে? বাইরে বেশিক্ষণ থাকাটা তোমার জন্য নিরাপদ নয়। চারদিকে অপহরণ খুন আর অন্যায় কাজের ছড়াছড়ি, যে কোনো সময় খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। এখন থেকে তুমি বাইরে গেলে আমাকে জানাবে, তোমার সাথে একজন বডিগার্ড থাকবে, যাতে কোনো কিছু হলে তোমাকে হেল্প করতে পারে।’
সম্পা বাবার কাছে এসে বসলো, তারপর গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ‘বাবা, তুমি এতো টেনশন করে না তো। আমার কিছুই হবে না, আমি সেলফ ডিফেন্স জানি। তুমিই তো আমাকে শিখিয়েছো।’
আলী নেওয়াজ কন্যা সম্পার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো, ‘সেটা ঠিক আছে মা, তবুও আমার তোমার জন্য টেনশন লাগে। তুমি কি সেটা বুঝতে পারছে না?’
‘বুঝি বাবা, পৃথিবীর সকল বাবা-মায়েদেরই সন্তানদের জন্য টেনশন থাকে, সেটা আমি বুঝি। তবুও আমাকে তুমি আল্লাহর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দাও, আমি ভালো থাকবো।’
আলী নেওয়াজ সম্পার কথায় খুবই খুশি হলেন, এ বয়সের টিনেজ সন্তানরা যেখানে আল্লাহর নামই নেয় না, সেখানে তার সন্তানটা আল্লাহর ইচ্ছার উপর তাকে সমর্পণ করতে বলেছে, এটা ভালো একটা দিক। যার জন্য আল্লাহ আছেন, তার আর পৃথিবীর কোনো শক্তির সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।
‘বাবা তুমি কী ভাবছো? বলো আমাকে।’
‘না, ভাবছি তুমি অনেক সুন্দর কথা বলেছো, আল্লাহই আমাদের সব, ওনার নির্দেশ পালন করলে পৃথিবীর মানুষ
সুখে থাকে, ভালো থাকে, শান্তিতে থাকে, এটাই শেষ কথা।’
রবিন। বয়স ২৪ বা ২৬ বছর হবে। শুকনা, ফ্যাকাশে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। দিনে লাইব্রেরিয়ান, রাতে এক ভয়ঙ্কর কিলার হিসেবে আবিভর্‚ত হয়। ডার্কওয়েব, ডিপফেক, ভয়েস মিমিক্রি, কেমিক্যাল নিয়ে পিএইচপি ড্রপআউট সে। তাই সিসিটিভিতে ধরা পড়ে না, কারণ তার থাকে ফেস মাস্ক, আর কণ্ঠে এআই ভয়েস চেঞ্জার। আধুনিক সমস্ত নতুন প্রযুক্তিতে সে নিজকে গড়ে তুলেছে।
বাবা জামশেদকে ইরফান-টিম দু’বছর আগে মেরেছিল। বদলা নিতে সে একে একে টিমের প্রিয় মানুষগুলোকে টার্গেট করছে। তাসফিয়া তার ৩ নম্বর শিকার। তবে সে যেহেতু গোয়েন্দা টীমের একজন সদস্য তুষারের প্রেমিকা, তাই পুরো টীমটাকে দুর্বল করে দিতে ভিন্ন এক কৌশল আর প্ল্যান করে।
অন্য মেয়েদেরকে খুনের পর ভিকটিমের বাম হাতে নীল পদ্ম এঁকে দিতো সে। কারণ তাসফিয়ার বিয়ের কার্ডে নীল পদ্ম থাকার কথা। তাই তার গেম প্ল্যানের একটা একটা সাইকোলজিক্যাল টর্চার। এতে সে ভীষণ আনন্দ পায়।
তার একটা ওসিডি আছে। সে প্রতিটা খুন রাত ৩:১৭ মিনিটে করে। এই প্যাটার্নই ওর একটা আনন্দদায়ক বিষয়।
জোয়ারের ৪৭ মিনিট বাকি। ইরফানের গাড়ি টেকনাফ বস্তিতে ঢোকে। পুরো বস্তি খালি। দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা: ‘রং বীচ ডিটেকটিভ’।
তুুষারের ফোনে নতুন এমএসএস আসে, তাসফিয়ার চোখ বাঁধা ছবি। পেছনে সেন্টমার্টিনের পুরনো লাইটহাউসের ছায়া।
সজলের সেকেন্ড ফোন ভাইব্রেট হয়, সে তাকিয়ে দেখে ‘জে’ থেকে মেসেজ : “অভিনন্দন। আপনি ধোঁকাটা ধরে ফেলেছেন” ইরফান সন্দেহের চোখে সজলের দিকে তাকায়। টিমের ভেতর এক অজানা অবিশ্বাস ঘুরে ফিরে আসে। আসলে সজল কি ডাবল এজেন্ট?
জামশেদ বোট রেডি করতে বের হয়েছে। এই ফাঁকে রবিন প্রথমবার ক্যামেরায় আসে। মুখে জামশেদের মতোই হ্যাট, কিন্তু গলায় এআই ভয়েস, ‘হ্যালো আন্টি, আমি রবিন। বাবা বললো, আপনি নাকি গোয়েন্দার বউ হবেন?’
রবিনের একথার উত্তর দেয় না তাসফিয়া। তবে সে তাসফিয়াকে ৩টা ধাঁধা দেয়। প্রতি ভুল উত্তরে তাসফিয়ার হাতে পিন ফোটায়। ধাঁধা ৩টাই তুষারের ছোটবেলা নিয়ে, রবিন তুষারকে হ্যাক করে সব জেনে গেছে।
রবিন বলে, ‘আন্টি, আপনি ৩ নম্বর। আপনার আগে অনন্যার ছোট বোন আর রাশমিকার কাজিনকে আমি নীল পদ্ম দিয়েছি।” — টিম জানতোই না ওদের পরিবারের কেউ মিসিং!
অনন্যা শিউরে উঠে, ‘বলে কি? বিষয়টা এখনও কেউ জানে না কেন?’
রবিন উত্তর দেয়, ‘ওদের হাতে নীলপদ্ম, আর মুখ, শরীর ক্ষতবিক্ষত, ডিএনএ টেস্টও এখন হয়নি, তাই জানতে পারেনি, কারণ আমি তো তাদেরকে একের পর এক খেলা খেলে অন্যদিকে মোটিভ ঘুরিয়ে রেখেছি, আসল সত্য উদ্ঘাটন করার সুযোগই পায়নি।’
‘তুমি কি মানুষ নাকি পশু? পশুও তো এমন বিকৃতভাবে মানুষকে মারে না। আর তুমি যে কিশোরীদেরকে নির্যাতন করে হত্যা করো, তারা কী অপরাধ করেছে? কেন তুমি এমন করো?’
রবিন মজা পেয়ে হাসে, তারপর উত্তর দেয়, এটা আমার কাছে একটা খেলামাত্র, এসব কিশোরীরা তো একদিন মরেই যাবে, কিন্তু আমি তো আর আমার খেলার মজাটা পাবো না। ঠিক না?’
‘তোমার কাছে এটা খেলা মনে হতে পারে মানুষকে নির্মম কষ্ট দিয়ে, কিন্তু তুমি কি ভেবে দেখেছো, ওই জায়গায় তুমি থাকলে তোমার কাছে কেমন লাগতো?’
‘আমার বাবা জামশেদ, কয়েকবার তাকে মেরে ফেলা হয়েছে কিন্তু সে বেঁচে গেছে, এ ধরনের খেলা আমাদের ফ্যামিলিরই একটা রেওয়াজ বলা যায়, এ খেলা কেউ কখনো থামাতে পারবে না, আমরা খেলবো, আর আমাদের খেলার পুতুল হবে কিছু ইনোসেন্ট মানুষ। দেখো না, রাজপথে কতো মানুষ পুলিশের গুলিতে মারা যায়, এরপর কি হয়? কয়েকদিন একটু নাড়াচাড়া তারপর সব শেষ, কেউ তাদের খবর রাখে না।’
তাসফিয়া বুঝতে পারলো এই সাইকোকে কোনো যুক্তিতেই বুঝানো যাবে না, ওদের মাথায়, হৃদয়ে এমন বস্তু রয়েছে, যা তাদেরকে অন্যায়ের দিকেই যুক্তি দেখায়। আসলে শয়তানের সাথে তুমি যতোই ভালো ব্যবহার করো, সে শয়তানই থাকবে।
ইরফানের কাছে রেডিও সংকেত আসে “স্যার, সেন্টমার্টিনের পুরনো লাইটহাউসে মুভমেন্ট।” টিম রওনা দিয়েছে।
জামশেদ ফোন করে তুষারকে, ‘আমার ছেলে একটু পাগলাটে, তুষার। ওকে থামাও। নইলে তাসফিয়ার লাশও পাবে না। সে সব ধ্বংস করে ফেলবে।
তুষার এবার বুঝতে পারলো জামশেদও ছেলেকে পুরো কন্ট্রোল করতে পারে না। তাহলে জামশেদের চেয়ে বড় শয়তান হচ্ছে তার ছেলে রবিন, ওকেই আগে খুঁজতে হবে। আর এই খেলায় সজলকে দিয়ে ট্র্যাপ বানাতে হবে।
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ২য় পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৩য় পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৪র্থ পর্ব
আরও পড়ুন : ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৫ম পর্ব
প্রকাশিত : বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ খ্রি.
















