ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : পর্ব ৯

মিজানুর রহমান রানার ধারবাহিক থ্রিলার : অদৃশ্য আততায়ী। আজ লিখেছেন নবম পর্ব।
নয়.

পৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ দয়ামায়াহীন, তারা শুধু সুখ খোঁজে, টাকা খোঁজে আর সুন্দরী নারীর গায়ের ঘ্রাণ। উতালা হয় বেতলা হয় তারপর কাজ শেষে ঘুম দেয় অনায়াসে। দুর্বলরা পড়ে থাকে, আর সবলরা পৃথিবীটাকে ঘোরায়, মানুষকে নিয়ে সার্কাসে মাতে।

গভীর রাত। টেকনাফ-কঙ্বাজার হাইওয়ে।

আকাশে চাঁদ নেই। কিন্তু রাস্তা চকচক করছে, যেনো কেউ তেল ঢেলে রেখেছে। আজ বৃষ্টি হয়নি, তবু বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

কুকুরগুলোও আজ ডাকছে না। হয়তো কোনো বিপদের গন্ধ পেয়েছে!

লাল রঙের ‘সেন্টমার্টিন এঙ্প্রেস’ বাসটা স্কিড করে থামল। ড্রাইভার জানালা দিয়ে মুখ বের করে গালি দিল, ‘ওই কে রে! মরতে চাস?’

চাকার নিচে কিছু একটা। প্রথমে মনে হলো কাপড়ের পুতুল। তারপর হেডলাইটের আলো পড়তেই ড্রাইভারের গলা শুকিয়ে যেনো কাঠ হয়ে গেলো। সে হেলপারকে বললো, ‘ইমরান, আমাকে একটু পানি দে-তো।’

ইমরান পানি দিতেই ঢকঢক করে ড্রাইভার সমশের বোতলটা খালি করে দিলো। তারপর সামনে তাকালো ভালোভাবে।
ছেঁড়া ওড়না। সাদার উপর নীল ফুল। আর তার পাশে কাদা-মাখা একটা হাত।

১৭ বছরের একটা মেয়ে। রুমি। দক্ষিণ টেকনাফ গার্লস হাইস্কুল, ক্লাস টেনে পড়তো। রোল নং তিন। সন্ধ্যা ৭টায় টিউশনি থেকে বের হয়েছিল। মাকে ফোনে বলছিলো, ‘আম্মু, দশ মিনিট লাগবে। ভ্যান পাইছি।’
দশ মিনিট আর ফুরায়নি।

সকাল ৫:২০ মিনিট। কঙ্বাজার সদর হাসপাতালের ডা. ফরিদা চশমা খুলে চোখ কচলালেন। ২০ বছর ধরে লাশ কাটেন, তবু হাত কাঁপে।
‘কজ অফ ডেথ: ম্যানুয়াল স্ট্র্যাঙ্গুলেশন। গলায় বুড়ো আঙুলের ছাপ-বাম পাশে ০.৮ সেন্টিমিটার বেশি গভীর। অ্যান্টি-মর্টেম রেপ। এরপর পোস্ট-মর্টেম রানওভার। টাইম অফ ডেথ: ২:৩০ থেকে ৩:০০ এর মধ্যে।’

ইরফান দাঁড়িয়ে শুনছে। তার হাতে রুমির ছবি। স্কুল ড্রেস, দুই বেণী, চোখে কাজল। সে অবাক হয়ে দেখলো ছবির নিচে লেখা: ‘আমি ডাক্তার হবো।’

রিপোর্টের শেষ লাইনটা ইরফানকে পাথর বানিয়ে দিল: ‘প্যাটার্ন ১০০% ম্যাচ উইথ প্রিভিয়াস সিঙ্ ভিক্টিমস।’
সে ভাবে কিন্তু রবিন তো জেলে। ৩০২ ধারায়। আলাদা সেল। সিসিটিভি ২৪ ঘণ্টা ওর উপর ফোকাস করা। গত ৭২ ঘণ্টায় ও বাথরুমেও যায় নাই সেলের বাইরে।
তাহলে খুন করল কে?

সকাল ৬:১০ মি.। গোয়েন্দা অফিস, কঙ্বাজার। রুমে এসির বাতাস, তবু সবার কপালে ঘাম। ফাইলের গন্ধ, সিগারেটের ধোঁয়া আর ঘুমহীন চোখ।

রাশমিকা ফাইলটা টেবিলে আছড়ে ফেলল। চুড়ির শব্দটা বোমার মতো বাজল। সে বললো, ‘স্যার, এটা তো একেবারেই অসম্ভব! আমি নিজে রবিনের সেলে ডিউটি করছি কাল রাত ১টা পর্যন্ত। ও খাটে শুয়ে ছিল। নাক ডাকছিল। জেল সুপারকে ফোন দিয়েছি-গেট লগ ক্লিয়ার। কোনো এন্ট্রি-এঙ্টি নাই।’

ইমতিয়াজ হোয়াইট বোর্ডে মার্কার ঘষছে। লাল কালি দিয়ে সাতটা ক্রস। সে বললো, ‘তাহলে দুইটা অপশন স্যার। এক, কপিক্যাট কিলার। রবিনের ফ্যান। দুই…।’ সে মার্কার থামাল। ‘রবিন কোনোদিনই আসল খেলোয়াড় ছিলো না। ও শুধু বলি। পেছনে কেউ আছে। কোচ।’

অনন্যা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা একটু ঘোরাল। তারপর বললো, ‘স্যার, প্যাটার্ন দেখেন। ভিক্টিম সবাই ১৫-১৯ বছর। সবাই সন্ধ্যার পর কোচিং বা টিউশনি থেকে ফেরে। গলা টিপে ধরার স্টাইল এক। বুড়ো আঙুল বাম দিকে বেশি প্রেসার দেয়। মানে খুনি লেফটি না, রাইট-হ্যান্ডেড। কিন্তু শ্বাসরোধ করার সময় শরীরের ওজন বাম হাঁটুর উপর ফেলে। আর টাইমিং…।’
‘২টা থেকে ৩:১৭ এর মধ্যে।’ ইরফান শেষ করলো। তারপর ভাঙা গলায় বললো, ‘এটা বিগ বসের প্রিয় সময়।’

তুষার কিবোর্ডে ঝড় তুলল। তারপর বললো, ‘আরেকটা মিল স্যার। রুমির ফোনের কললিস্ট। লাস্ট কল রাত ২:১৮। অপরিচিত নাম্বার। টাওয়ার লোকেশন ট্রেস করছি-টেকনাফ পুরান লাইটহাউস। একই টাওয়ার থেকে গতকাল আলী নেওয়াজের ফোনেও থ্রেট কল গিয়েছিল।’
রুম নিস্তব্ধ। শুধু দেয়ালঘড়ির টিক… টিক… টিক… শব্দ।

ইরফান উঠে দাঁড়াল। জানালার গ্রিল ধরে সমুদ্র দেখল। ঢেউগুলো আজ কালো। তারপর বললো, ‘রবিন না। এটা রবিনের ওস্তাদ। যে ওকে ছুরি ধরা শিখাইছে। যে ওকে ৩:১৭ মুখস্থ করাইছে।’ সে ঘুরলো। তার চোখে আগুন। ‘ফাইল খুলো। অপারেশন ‘চোখ’। টার্গেট: বিগ বস।’

সকাল ৭টা। আলী নেওয়াজের বাংলো, টেকনাফ। বাড়িটা মরা। দরজা খোলা। বাতাসে পর্দা উড়ছে। ড্রয়িংরুমের টেবিলে চায়ের কাপ। চা শুকিয়ে তলানিতে কালো দাগ। জায়নামাজটা মেঝেতে পড়ে আছে, অর্ধেক ভাঁজ করা। যেন মাঝপথে উঠে যেতে হয়েছে।

সম্পা দৌড়াচ্ছে। ‘বাবা! বাবা! ও বাবা!’
গলা ফাটিয়ে চিৎকার, কিন্তু দেয়ালগুলো শুধু প্রতিধ্বনি ফেরত দেয়।
আরমান হাঁপাতে হাঁপাতে ঢ়ুকল। খালি গা, লুঙ্গি পরা। খবর পেয়ে ঘুম থেকে উঠে দৌড় দিয়েছে। আলী নেওয়াজের ১৫ বছরের ছায়া সে।

‘আপামনি, বসের পালসার গাড়ি গ্যারেজে। চাবি ভেতরে। ফোন বন্ধ, লাস্ট লোকেশন কাল রাত ৩:০৫-এই বাড়ি। আর…’ তার গলা বুজে এলো। ‘কাশেম ভাই… পিছনের পুকুরে।’

সম্পা ছুটল পুকুর ঘাটে। শান বাঁধানো ঘাটে শ্যাওলা। পানিতে কচুরিপানা। তার মাঝে উপুড় হয়ে ভাসছে কাশেম। ঘাড়টা অদ্ভুতভাবে বাঁকা। ডান দিকে ৯০ ডিগ্রি। চোখ খোলা।

সম্পার পা ভেঙে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ‘জামশেদ… কাল রাতেই বাবাকে থ্রেট দিছিল ফোনে…।’
‘কিন্তু জামশেদ তো জেলে আপা…।’ আরমান বলতে গিয়েও থামল। কারণ গেটে হর্ন। একটা… দুইটা… তিনটা।

কালো পাজেরো। কাঁচ নামানো। ড্রাইভিং সিটে জামশেদ। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, আতরের গন্ধ আসছে এতদূর থেকেও। মুখে সেই বাঁকা হাসি, যেটা দেখলে কঙ্বাজারের দোকানদাররা শাটার নামায় দিত।
আরমান পিস্তল বের করল। সেফটি অফ। ‘তুই! তুই জেল থেকে কেমনে বের হইলি রে ব্যাটা? তোর তো ১৪ দিনের রিমান্ড চলতেছে!’

জামশেদ গাড়ি থেকে নামল না। কনুই জানালায় রেখে আরাম করে বললো, ‘আহা আরমান ভাই, গরম হন ক্যান? প্রেসার বাড়বে। জেলে থাকা কি আমার কাজ নাকি? আমি হইলাম ম্যানেজার। মাফিয়ারা যদি জেলে বসে থাকে, তাহলে ইয়াবার চালান কে ছাড়াবে? হোটেলের বিল কে দেবে? উকিল আছে, জজ সাহেব আছে, মন্ত্রীর পিএস আছে। সিস্টেম আছে ভাই, সিস্টেম।’

সম্পা টলতে টলতে গেটের কাছে গেল। চোখে পানি নাই, আগুন। ‘আমার বাবা কই জামশেদ? কাল রাত ৩:১০ এ তোমার ফোনের পর থেকে নিখোঁজ। কী করছিস তুই?’

জামশেদ পকেট থেকে গোল্ডলিফ বের করল। লাইটার জ্বালাল। ‘আলী নেওয়াজ? আহা, বেচারা আলী ভাই। সারাজীবন খালি ভুল ঘোড়ার উপর বাজি ধরল। প্রথমে আমার ঘোড়া, তারপর ইরফান সাবের ঘোড়া। এখন হয়তো…।’ সে ধোঁয়া ছাড়ল উপরে। ‘হয়তো বিগ বসের ঘোড়ায় উঠছে।’

আরমানের হাত কাঁপছে। ‘বিগ বস কে? নাম বল শু’র বাচ্চা!’

জামশেদ হাসল। দাঁতগুলো হলদে। ‘নাম? নাম দিয়ে কী করবা আরমান ভাই? নামে কিছু আসে যায় না। কামে আসে যায়। বিগ বস হইল সে, যে রবিনরে কোলেপিঠে করে বড় করছে। যে আমাকে গতকাল রাত ১টায় জেল গেট থেকে নিজের গাড়িতে তুলে নিছে। যে তোমার বসকে তওবা করার পরেও মাফ করে নাই। কারণ তওবা করলে কি ২০ বছরের খুন মাফ হয়?’ সে সম্পার দিকে তাকাল। চোখ ছোট করল। ‘যে গতরাতে রুমিকে…।’

সম্পা গ্রিল ধরে ফেলল। ‘তুই মারছিস রুমিকে?’

‘আমি? নাউজুবিল্লাহ। আমি হইলাম রোজাদার মানুষ।’ জামশেদ বুকের উপর হাত রাখল। ‘আমি খালি খবর দিই। কাজ করে অন্য লোক। যাও গিয়া, পুরান লাইটহাউসে খুঁজো। তোমার বাপের লাশ পাইতেও পারো। সময় ৩:১৭। বিগ বসের নামাজের সময়।’

গাড়ি স্টার্ট দিল। চাকা ঘুরল। ধুলার ঝড় তুলে মিলিয়ে গেল।
সম্পা আরমানের শার্ট খামচে ধরল। ‘আরমান ভাই, বাবা… বাবা বেঁচে আছে তো? বলেন না ভাই?’
আরমান জবাব দিল না। সে পিস্তলের নল দেখছে। তার চোখে এখন আর পানি নাই। শুধু বারুদ। ‘আপামনি, আপনি ঘরে যান। আমি বসকে না নিয়ে ফিরব না। জিন্দা বা মুর্দা।’

রাত প্রায় ৯:৩০ বাজে। কঙ্বাজার শহর, বাজার রোড। টিপটিপ বৃষ্টি। নিয়ন লাইটগুলো ঝাপসা। রাস্তায় রিকশা নাই, মানুষ নাই। শুধু ড্রেনের পানি বয়ে যাওয়ার শব্দ।

কালো কোট। কালো হ্যাট। হাতে কালো লাঠি, মাথায় সিলভারের বাঘ। লোকটা হাঁটছে। ধীরে। প্রতি কদমে লাঠির ঠক ঠক শব্দ। বয়স? ৪০ও হতে পারে, ৬০ও হতে পারে। মুখের ডান পাশ ছায়ায় ঢাকা, বাম পাশে আলো পড়লে চামড়ার ভাঁজ দেখা যায়।

মোড়ের মাথায় সম্পা। খালি পা, চুল ভেজা। বাবাকে খুঁজতে পাগলের মতো বের হইছে। আরমানকে জোর করে থানায় পাঠাইছে-জিডি করতে, ইরফানকে ফোন দিতে।
হঠাৎ লোডশেডিং। পুরা এলাকা ব্ল্যাকআউট। শুধু একটা চায়ের দোকানে হারিকেন। কাঁপা কাঁপা আলো।
আলো-আঁধারির ভেতর লোকটা এসে দাঁড়াল। সম্পার থেকে দুই হাত দূরে।

‘তুমি আলী নেওয়াজের মেয়ে না?’ গলাটা ফিসফিস। কিন্তু শীতল। শ্মশানের বাতাসের মতো। ‘চোখ দুইটা চেনা লাগে। রূপার চোখ পাইছো।’
সম্পার শিরদাঁড়া বেয়ে বরফ নামল। ‘রূপা কে? আপনি কে? আমার পথ ছাড়েন!’
লোকটা নড়ল না। হ্যাটটা দুই আঙুলে ধরে একটু উঁচু করল। কপালের ডান পাশে একটা কাটা দাগ। পুরনো সেলাইয়ের দাগ, চামড়া জোড়া লেগে সাদা হয়ে আছে। ইঞ্চি তিনেক লম্বা।
‘আমি? আমি কেউ না মা। আমি শুধু হিসাবের খাতা রাখি। ২০ বছর আগে, এই টেকনাফের এক বর্ষার রাতে, তোমার বাবা আমার কাছ থেকে জান কবচ করছিল। রূপাকে। আমার বোনকে।’
সম্পা দুই পা পিছাল। ‘মিথ্যা! আমার বাবা তওবা করছে! সে এখন নামাজ পড়ে!’

‘তওবা?’ লোকটা প্রথমবার হাসল। শব্দ নাই, শুধু ঠোঁট বাঁকা হলো। ‘তওবা করলে কি রক্ত মুছে যায় মা? ২০ বছর আগে আলী নেওয়াজ ইয়াবার চালান নিয়ে ঝামেলায় আমার বোনকে জিম্মি করছিল। তারপর…।’ সে থামল। ‘তারপর রূপার লাশ ভেসে উঠছিল নাফ নদীতে। গলায় একই দাগ। বুড়ো আঙুল বাম দিকে বেশি চেপে বসা।’

সম্পার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ‘আপনি… আপনি বিগ বস?’
‘বিগ বস?’ লোকটা লাঠি দিয়ে মাটিতে ঠক করে বাড়ি দিল। ‘নাম দিয়ে কী হবে? আমি হইলাম সময়। ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। আলী নেওয়াজকে বড় করছি, ওর সাম্রাজ্য বানাইছি, আবার ধ্বংস করছি। রবিনকে দিয়ে ছয়টা মেয়ে মারছি-ট্রেনিং। জামশেদকে দিয়ে জেল ভাঙছি-মহড়া। এখন ফাইনাল খেলা।’

সে এক পা আগাল। ‘ভয় পেও না। তোমাকে মারব না। তুমি হইলা রানী। মোহর। তোমাকে সামনে রেখে আমি চাল দেব। তোমার আশিক সজলকে ডাকব, তোমার ইরফান স্যারকে ডাকব, আর তোমার তওবা করা বাপকে…।’
সে আকাশ দেখল। মেঘ ডাকছে। ‘তারপর ৩:১৭ তে চেকমেট।’
সম্পা চিৎকার দিতে গেল, ‘বাঁচাও!’
তখনই ব্রেকের ক্যাঁচ শব্দ। একটা সাদা মাইক্রো। নম্বর প্লেট কাদা মাখা। দরজা স্লাইড করে খুলে গেল। দুইজন মুখোশধারী, হাতে গ্লাভস।

লোকটা ফিসফিস করল, ‘বিগ বস সালাম দিছে মা। বলছে, আপনার বাবা পুরান লাইটহাউসে অপেক্ষা করতেছে। আপনার জন্য বিরিয়ানি রান্না করছে।’

সম্পাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল গাড়িতে। সে ধস্তাধস্তি করল, নখ দিয়ে একজনকে আঁচড় দিল। কিন্তু লাভ হলো না।
দরজা লাগার আগে শেষ মুহূর্তে সম্পার চোখ পড়ল লাঠিটার দিকে। মাথায় সিলভারের বাঘ, আর তার নিচে খোদাই করা। একটা চোখ। মণির মাঝে কাঁটা কম্পাস। আর নিচে লেখা: ‘৩:১৭’।
গাড়ি বৃষ্টির ভেতর হারিয়ে গেল। রাস্তায় পড়ে রইল সম্পার এক পাটি স্যান্ডেল।
রাত ১১:০০ । গোয়েন্দা অফিস। ইরফানের ফোন কাঁপছে। স্ক্রিনে ‘অপরিচিত নাম্বার’।
‘হ্যালো?’

ওপাশে সজল। গলা ভাঙা, হাঁপাচ্ছে। যেন ম্যারাথন দৌড়ে আসছে। ‘স্যার… স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে। সম্পাকে পাচ্ছি না। ওর ফোন ট্র্যাক করছি-লাস্ট লোকেশন বাজার রোড, ৯:৩৮। এরপর সুইচড অফ। আর স্যার… আরমান ভাই ফোন দিছিল। আলী নেওয়াজের পুকুরে কাশেমের লাশের পাশে পলিথিনে মোড়ানো একটা চিরকুট।’
ইরফান চোখ বন্ধ করল। ‘কী লেখা?’

সজল পড়ছে, কাগজ খসখস শব্দ হচ্ছে: ‘খেলা নতুন ছকে। গুটি তোমার। চাল আমার। ইতি, বিগ বস।’ সে ঢোক গিলল। ‘নিচে লাল কালি দিয়ে লেখা-৩:১৭। আর স্যার… একটা চোখ আঁকা।’

ইরফান ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠল। দেয়ালের বিশাল ম্যাপটার সামনে গেল। সাতটা লাল পিন। রুমি, তানিয়া, শিউলি, পপি, জবা, কলি, বকুল। সাতটা কিশোরী। সাতটা খুন।
সে সুতা নিল। পিন থেকে পিনে যোগ করল।
রাশমিকা ফিসফিস করল, ‘চোখ…।’

একটা নিখুঁত চোখের আকৃতি। আর মণি বরাবর যে পিনটা, সেটা গাঁথা-টেকনাফের পুরান লাইটহাউস। ১৯৭১ এ পরিত্যক্ত।
ইরফান ম্যাপে হাত রাখল। ‘রবিন সৈন্য। জামশেদ ঘোড়া। আলী নেওয়াজ যদি রাজা হয়…।’ সে সজলের দিকে তাকাল, ফোনের ওপাশে। ‘তাহলে মন্ত্রী কে সজল? যে ২০ বছর ধরে রাজাকে বাঁচাইছে, আবার মারতেছে? যে রূপার খুনের বদলা নিচ্ছে?’

বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। জানালার কাঁচে আলো পড়ে ইরফানের মুখটা কেটে কেটে দেখাল।
‘অফিসার অনন্যা, জেল সুপারকে ফোন দাও। রবিনের সেলের গত ৭ দিনের সিসিটিভি ফুটেজ লাগবে। ফ্রেম বাই ফ্রেম।’
‘ইমতিয়াজ, পুরান লাইটহাউসের ব্লু-প্রিন্ট বের করো। নিচে কোনো বাঙ্কার আছে নাকি।’
‘তুষার, রূপা নামে ২০০৩-২০০৫ এ টেকনাফে কোনো মিসিং বা মার্ডার কেস ছিল নাকি দেখো।’
‘রাশমিকা, সজলকে লোকেশন পাঠাও। আমরা মুভ করছি।’

সে পিস্তল লোড করল। ‘খেলা এখন আর জামশেদ বনাম পুলিশ না। খেলা এখন রক্তের বদলা রক্ত। ছায়ার ভেতর ছায়া। আর ছায়ার মালিক নিজে মাঠে নামছে।’
ঘড়িতে ১১:১৭। ৩:১৭ বাজতে আর ৪ ঘণ্টা।

সমুদ্র আজ গর্জাচ্ছে বেশি। যেন সে-ও জানে, আজ রাতে লাইটহাউসে কিস্তি মাত হবে। কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কেউ বাঁচবে, কেউ…।
ইরফান দরজার দিকে পা বাড়াল। ‘চলো। সময় কারো জন্য থামে না। বিশেষ করে ৩:১৭ এর জন্য।’
(চলবে…)

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ২য় পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৩য় পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৪র্থ পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৫ম পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৬ষ্ঠ পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : পর্ব ৭

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : পর্ব ৮

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ খ্রি

You might like

About the Author: priyoshomoy