এক ক্লিকে সর্বনাশ: ভুয়া লিংক, ভাড়া করা NID, আর মুহূর্তেই উধাও কোটি টাকা

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

মুঠোফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো, “সিস্টেম আপডেট করুন”। ক্লিক করলেন সাতকানিয়ার এক ব্যবসায়ী। কয়েক মিনিট পর ফোন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জিমেইল, পাসওয়ার্ড ম্যানেজার, ব্যাংক অ্যাপের পিন, সব চলে গেল প্রতারকের হাতে। লোহাগাড়া ও কেরানীহাটের ইউসিবি শাখা থেকে ধাপে ধাপে উধাও হলো ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা।

এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে এখন শত শত এমন মামলা। তদন্তে উঠে আসছে একই প্যাটার্ন, ভুয়া লিংক, টেলিগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপে চাকরি বা ইনভেস্টমেন্টের প্রলোভন, তারপর লেয়ারিং করে টাকা গায়েব।

ফাঁদটা শুরু হয় যেভাবে
১. ভুয়া আপডেট লিংক: ক্লিক করলেই ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়ে, ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

২. টেলিগ্রাম টাস্ক: imdbmovie-click.com এর মতো সাইটে মুভি রেটিং, লাইক, ছোট টাস্কের কাজ। প্রথমে ১-২ হাজার টাকা দিয়ে কমিশনসহ ফেরত, বিশ্বাস তৈরি।

৩. বড় টোপ: ভিআইপি অ্যাকাউন্ট, টাস্ক আনলক, সিস্টেম অ্যাক্টিভেশনের নামে ১০ হাজার, ৫০ হাজার, ১ লাখ চাওয়া হয়। টাকা আটকে গেলে বলা হয়, আরও আড়াই লাখ দিলে আগেরটা ফেরত পাবেন। এভাবে একজন ভুক্তভোগী ৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৩২ টাকা হারিয়েছেন, কেউ কেউ ৫৭ লাখ পর্যন্ত।

টাকা যায় কোথায়: ৫ মিনিটে ৫০ ভাগ
প্রতারকরা টাকা কখনো এক অ্যাকাউন্টে রাখে না। তদন্ত বলছে, ১ লাখ টাকা ঢুকলে কয়েক মিনিটে ১০ থেকে ১৫টি বিকাশ-নগদে ভাগ হয়। তারপর আবার ভাগ, আবার ভাগ। একে বলে লেয়ারিং।

চট্টগ্রামের এক মামলায় পুলিশ দেখেছে, অন্তত অর্ধশতাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার হয়েছে। মজার বিষয়, সিম একজনের নামে, বিকাশ আরেকজনের NID দিয়ে খোলা।

ভাড়া করা পরিচয়ের বাজার
তদন্তকারীরা বলছেন, প্রায় সব অ্যাকাউন্টই ভুয়া বা ভাড়া করা।
– গ্রামের দিনমজুর, রিকশাচালক, বৃদ্ধ নারীর NID সংগ্রহ করা হয় ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়।
– কখনো সরকারি প্রণোদনার কথা বলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলানো হয়, হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ৫-৬ হাজার টাকা।
– ঢাকার উত্তরা, দিয়াবাড়ীতে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসে থাকা বিদেশি চক্র স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ দেয় মাসে ২০-৩০ হাজার টাকায়।

কাউন্টার টেররিজমের পরিদর্শক সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, “সিম নিবন্ধন ও এমএফএস কেওয়াইসিতে দুর্বলতা থাকায় প্রতারকরা সহজেই সুযোগ নিচ্ছে। এজেন্ট পর্যায়ে যাচাই না হওয়াটাই বড় ঝুঁকি।”

এজেন্টরা এখন আসামি
ক্যাশ-আউট হয় সাধারণত সিসিটিভি নেই এমন দোকানে, রাতে, ছোট ছোট ভাগে। বেশি কমিশনের লোভে কিছু এজেন্ট জড়িয়ে পড়ছেন।

নোয়াখালীর এক এজেন্টের ভাষ্য, “এক লাখে বৈধ কমিশন ৪০০ টাকা। আমাকে বলল ৩ হাজার দেবে। লোভে পড়ে নিয়ম মানিনি। এখন পুলিশ ডাকছে, অ্যাকাউন্ট জব্দ।”

পুলিশ ডিজিটাল স্টেটমেন্ট ধরে প্রথমে ক্যাশ-আউট পয়েন্ট খুঁজে বের করে। মূল হোতা না পেলেও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা ও মানি লন্ডারিং আইনে এজেন্ট আসামি হচ্ছেন।

দেশ ছাড়িয়ে যাওয়া টাকা: ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টো
শুধু ক্যাশ-আউট নয়, বড় অংশ পাচার হয়ে যায়।
– বিদেশে থাকা হুন্ডি এজেন্ট ডলার নেয়, দেশে প্রতারক চক্র ভুক্তভোগীর টাকা থেকে সমপরিমাণ বিকাশে পাঠায় পরিবারের কাছে।
– বিকাশ-নগদের টাকা দিয়ে P2P প্ল্যাটফর্মে কেনা হয় USDT বা বিটকয়েন, সেকেন্ডে চলে যায় বিদেশি ওয়ালেটে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, “এই ডিজিটাল হুন্ডিতে বৈধ রেমিট্যান্স দেশে আসে না, রিজার্ভ কমে, ডলারের দাম বাড়ে। শেষ পর্যন্ত দাম দেয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ।”

 কর্তৃপক্ষ কী বলছে
বিকাশের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানিয়েছেন, সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট তারা নিয়মিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে পাঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, “অভিযোগ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এমএফএস কোম্পানিগুলোকে নীতিমালা মানতে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফের মতে, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়সারা তদারকি চলবে না। ব্যাংকগুলোকে শুধু ঋণ দেওয়া নয়, মানুষকে আর্থিক সচেতন করতেও মাঠে নামতে হবে।”

শেষ কথা: লিংকে ক্লিক করার আগে থামুন। অপরিচিত টাস্কে টাকা পাঠাবেন না। আপনার NID দিয়ে অন্য কেউ সিম বা বিকাশ খুলছে কিনা, নিয়মিত চেক করুন। কারণ এই চক্রে একবার ঢুকলে, টাকা শুধু আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে যায় না, পুরো সিস্টেম ঘুরে দেশের বাইরেও চলে যায়।

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬

 

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy