

-সুষুপ্ত পাঠক :
আজকে পুরোটা সময় নিয়ে “আমি মেজর ডালিম বলছি” বইটা পড়লাম। পৃথিবীর নৃশংস এক খুনির লেখা বই। আমার কৌতূহল ছিল বঙ্গবন্ধুকে একা নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা, শিশু রাসেল ও অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে হত্যার এই খুনির কাছে কি যুক্তি ছিল। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে রাজনৈতিক কারণে হত্যা এক জিনিস, তার নিরহ পরিবারকে কেন হত্যা করা হলো?

ডালিম নিজের জবানে বলছে, ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাড়ি ছিল তার জন্য অবারিত দ্বার। মুজিব ও তার পুরো পরিবার তাকে স্নেহ করত। যখন তখন ৩২ নম্বরে ডালিম যেতেন। তাকে ও তার স্ত্রী নিম্মীকে এই পরিবার খুবই ভালোবাসত।
একদিনের ঘটনা। রাতের বেলা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ডালিমের গাড়িতে মুখোমুখি ধাক্কা দেয় আরেকটা ট্যাক্সি। এতে ডালিমের কপাল ফেটে যায়। গাড়ি স্টার্ট বন্ধ হয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। এই সময় রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তার গাড়িবহর নিয়ে ফিরছিলেন। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তাঁর গাড়ি থামিয়ে ডালিমকে জিজ্ঞেস করেন কি হয়েছে। তক্ষুণি তাকে ও তার স্ত্রীকে রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরের একটি গাড়িতে করে সিএমএইচে চিকিত্সা নিতে পাঠান এবং রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব ডালিমের বাড়িতে ফোন দিয়ে ঘটনা জানান এবং কোন রকম চিন্তা করতে বারণ করেন। এতটাই স্নেহ করতেন ডালিমকে মুজিব।
ডালিম তার বইতে মুজিব হত্যাকে এরপর জায়েজ করতে গিয়ে বলেছেন ব্যক্তি মুজিবকে নয়, গণবিরোধী মুজিবের সঙ্গে সে আপোষ করতে পারেনি। তা বেশ, আদর্শগত থেকে মুজিব বিরোধীতা তো থাকতেই পারে, কিন্তু তার পুরো পরিবারকে তার জন্য হত্যা করতে হলো কেন? কি সে কারণ?
শেখ কামাল যে ডালিমকে আদর করে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ‘বস’ বলে সম্বোধন করতো সেটা ডালিমের বইতেই পাবেন। এক রাতে পার্টির কাজে অনেক রাত হলে কুমিল্লার ক্যান্টমেন্টের ডালিমের বাসায় শেখ কামাল তার দুই বন্ধু নিয়ে হাজির। অত রাতে ঢাকা ফেরা তখনকার পরিস্থিতিতে নিরাপদ নয় মনে করে ডালিমের বাসায় খাওয়া দাওয়া করে থেকে গিয়েছিলেন। আরেকদিনের কথা, ডালিম ৩২ নম্বরে এসেছে। জামাল ও রেহানার সঙ্গে বসে আলাপ করছে।
এই সময়ে শেখ কামাল বাইরে থেকে এসে ডালিমকে দেখে খুশি হয়ে বলল, বস কি ব্যাপার? শুনে ডালিমের জবাব, কেন ৩২ নম্বরে কি দরকার ছাড়া আসা যায় না?
কামাল লজ্জা পেয়ে বলল, অবশ্যই। তবে সবাই কোন না কোন দরকারেই আসে। তবে সবাই না, এই যেমন আপনি। আপনি তো আসেন শুধু আব্বার সঙ্গে ঝগড়া করতে। ডালিমের উত্তর, ঝগড়া তার সঙ্গেই করা যায় যাকে ভালোবাসা যায়…।
ডালিম নির্জলা মিথ্যা বলেছিল কামালকে। ডালিমের পুরো পরিবার শেখ মুজিব বিরোধী। ডালিমের বাবা শেখ মুজিবকে নিয়ে কটুক্তি করতো সেটা ডালিমের বর্ণনাতেই আছে। আসলে সমস্যাটা কোথায় সেটা লেখার শেষে বলব। আগে ডালিমের জবানে আরো কিছু ঘটনা জেনে নেই।
শেখ কামাল কিডন্যাপ করেছিল মেজর ডালিমের বউকে- এটা বাংলাদেশে জামাত শিবির ও বামপন্থী শিবিরের সহস্রবার বলা একটা মিথ্যার প্রায় ইতিহাস হয়ে যাওয়ার নমুনা। কিন্তু ডালিমের বইতে এই রকম কোন ঘটনা নেই। সে লিখছে তাকে ও তার বউকে অপহরণ করেছিল গাজী গোলাম মোস্তফা। তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রধান ও রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান। ঘটনাটি ছিল এমন: ডালিমের খালাতো বোনের বিয়ে ছিল লেডিস ক্লাবে। সেই বিয়েতে গাজীর পরিবারও দাওয়াত পেয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ডালিমের শ্যালক বাপ্পী ও গাজীর কিশোর পুত্রের মধ্যে। গাজীর বেয়াদপ পুত্র পিছনের চেয়ারে বসে বাপ্পীর চুল ধরে টান মারছিল। বাপ্পী ফিরে ফিরে দেখলে তারা কিছুই জানে না ভান করছিল। এভাবে কয়েকবার চলার পর বাপ্পী হাতেনাতে ধরে ফেললে তারা বলে তারা চুল টেনে দেখছিল চুলটা নকল নাকি আসল। স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হয় বাপ্পী। সে ঐ ছেলেকে ঘর থেকে বের করে দেয়। এই ঘটনার জেরে গাজী লোকজন নিয়ে এসে ডালিমকে বন্দুকের মুখে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়।
সঙ্গে তার শাশুড়ি ও খালাও উঠে। ঘটনা সর্বত্র জানাজানি হয়। ৩২ নম্বরে বিচার দেয় গাজী মিথ্যা বলে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা শেখ মুজিব জানতে পেরে গাজীকে গালাগালি করেন। ডালিম ও নিম্মীকে জড়িয়ে ধরেন স্নেহে। কামাল রেহানা এসে তাদের ধরে শেখ মুজিবের বেডরুমে নিয়ে গিয়ে বসায়। স্বভাবতই নিন্মি কান্নায় ভেঙে পড়ে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়। শেখ মুজিব তাকে সান্ত্বনা জানান। এদিকে আর্মি গাজীর বাসায় রেইড দিয়ে সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু গাজীকে বলে, তুই নিন্মির কাছে মাফ চা! কিন্তু নিন্মি ক্ষিপ্ত উঠে গাজী মাফ চাইতে এলে।
ডালিমের ভাষ্য, নিন্মি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, কাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী। আমি সেই মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অন্যায়ের বিচার চাই। হাসিনা রেহানার সঙ্গে এমনটা হলে আপনি কি বিচার করতেন আমি সেই বিচারটা চাই। বঙ্গবন্ধু নিন্মিকে মাথায় স্নেহের হাত রেখে আদর করতে করতে বলেন, মা, তুই আমার হাসিনা রেহানার মতই মেয়ে। আমি নিশ্চিয় এর উপযুক্ত বিচার করবো। তুই একটু শান্ত হ…।
এই হচ্ছে ঘটনা। ডালিমের বলা ঘটনা সত্যি হলেও আওয়ামী লীগের নেতার এহেন ঘটনার জন্য কি পুরো মুজিব পরিবারকে হত্যা করা যায়? যেখানে বঙ্গবন্ধু পরে এই ঘটনা নিয়ে বলেছিলেন, আর্মি ঠিক কাজই করেছে। গাজীর বিরুদ্ধে যথেষ্ঠ প্রমাণ আছে। আমার কিছু করার নেই। মানে গাজীর বিষয়ে কোন শাস্তি হয়েছিল? কিন্তু শাস্তি হয়েছিল বা হয়নি সে বিষয়ে ডালিমের বইতে কিছু নেই। কিন্তু এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীতে খুব উত্তেজনা দেখা দেয়। আর্মির আঁতে ঘা লাগে। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ড মুজিব পরিবারের সঙ্গে ঘটলেও গাজী পরিবারের সঙ্গে কোন প্রতিশোধ তো নেয়া হয়নি। এই ঘটনায় মুজিরের দোষটা কোথায়? সেই দোষেই গোটা পরিবারকে মেরে ফেলা যায়?
সেনাবাহিনীতে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে ক্ষমতা দখলের উচ্চাভিলাশ করছিল স্বাধীনতার পর থেকে। ‘র’ থেকে যুদ্ধের সময় বলা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক ক্যু হবার জোর সম্ভাবনা আছে। ২৫ বছরের পাকিস্তানী আদর্শের সেনা সদস্যরা মাত্র নয় মাসে তাদের আদর্শ পরিবর্তন করে ফেলবে না। ইন্টারেস্টিং আরো একটি বিষয়, সেনা বাহিনীতে তখন বামপন্থী মতবাদের অংশটি ক্ষমতা দখলের কথা ভাবছিল। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মনোভাব ছিল তারাই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে কাজেই তারাই দেশ পরিচালনা করবে।
এই বামপন্থীদের লিভিয়ার গাদ্দিফির ইসলামী সমাজতন্ত্রে আস্থা ছিল অনেকের। ডালিমের লিভিয়াতে আশ্রয় লাভ থেকেই সেটা পরিস্কার হয়েছে। ডালিমের ঘটনাকে উছিলা করে একটা সামরিক ক্যুর চেষ্টা সম্ভবত গোয়েন্দা বিভাগ আঁচ করতে পেরেছিল। ফলে ডালিম ও নূরের চাকরি চলে যায়। এর আগে তাহেরের উচ্চাভিলাষ জানতে পেরে তাকে আর্মি থেকে সরিয়ে অন্যত্র চাকরি দেয়া হয়। সেখানে বসেই সে জাসদের গণবাহিনী গঠনের কাজ করে যায় গোপনে।
ডালিমের চাকরি গেলেও, গোপন কোন তথ্য তার সম্পর্কে থাকলেও বঙ্গবন্ধু তাকে ৩২ নম্বরে ডেকে বিদেশের দুতাবাসে তার জন্য চাকরির অফার করেন। ডালিম সেটা গ্রহণ না করে দোয়া করতে বলেন। চাকরির হারানোর অপমানই কি মুজিবকে বংশধরসব হত্যা করা হয়? এই আক্রশ ব্যক্তি ডালিমের থাকলে তাকে পাগল বলতে হবে। মুজিব হত্যাকে যৌক্তিক করতে তাই কখনো শেখ কামালের দ্বারা ডালিমের বউকে কিডন্যাপ করার কাহিনী, কখনো দেশে লুটপাট দুর্নীতির কাহিনী তোলা হয়, কোনটাই নিরীহ নারী শিশু হত্যার জন্য কারণ হতে পারে না। যদি এটা ডালিমের ব্যক্তিগত আক্রোশ থাকতো তাহলে সবার আগে ১৫ আগস্ট সে গাজীর ফ্যামিলিকে শেষ করে দিতো। সেটা তো করা হয়নি।
মূল কারণ ছিল শেখ মজিব ও তার উত্তরাধিকদের খতম করো তাহলে বাংলাদেশে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ঘনোনোর যে বাংলাদেশ তার শেকড় উপড়ে ফেলা। ডালিম তার বইতে লিখেছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারা আল্লাহ আকবর শ্লোগান দিয়েছে। ডালিমের বইতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষপট ও যুদ্ধের সময় নানা রাজনৈতিক ঘটনাবলী সবগুলো চীনপন্থী বামপন্থীদের বইগুলো থেকে নেয়া। এই বিষয়ে আমার পড়া থাকায় জানি সে কোন কোন বইগুলো থেকে এসব নিয়েছে। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার যে প্রেক্ষাপট ডালিমের তার পেছনে কাজ করছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকা। ডালিমকে সিনিয়র থেকে জুনিয়র পদে অবনতি করা হয়। কোন বাঙালি অফিসারকেই ওরা বিশ্বাস করতো না।
তাদের অবাঙালি সহকর্মীরা তাদেরকে কটুক্তি করে বলত বাঙালিরা হিন্দুর জাত। এতে তাদের খুব অপমান হতো। এইসব কারণই ছিল তাদের পালিয়ে আসার পেছনে তখনকার কারণ। যুদ্ধে আসার পর তাদের মধ্যে তীব্র ভারত বিদ্বেষ জেগে উঠে। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে এই শংকার কথা ‘র’ কর্মকর্তারা আগেই ভারত সরকারকে সতর্ক করেছিল। ভারত মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র দিতে দেরি করেছিল তাদের এই দ্বিধার কারণেই।
ডালিমের বইয়ের লাইন বাই লাইন ধরে তার ঐতিহাসিক তথ্যের অসত্য ধরিয়ে দেয়া যায়। কর্ণেল ওসামানী যে আত্মসমর্পনের অনুষ্ঠানে যাননি আর্মি প্রটোকলের কারণে, সেকথা তিনিই বলেছিলেন, আর্মিতে চাকরি করেও ডালিম এটাকে ভারতের আধিপত্যের কাছে ওসমানী আপোস করেননি বলে চালিয়ে দিয়েছে।
এরকম অসংখ্য মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য পরিবেশ করা হয়েছে তার বইতে। ১৫ আগস্টের হত্যার বর্ণনা সে দেয়নি। শুধু লিখেছে মুজিবের বাড়ির কয়েকজন সদস্য নিহিত হয়েছে। কেন নিরীহ শিশু ও নারীদের হত্যা করা হলো তার কোন জবাব কৈফিয়ত নেই।
শেখ মুজিব স্বৈরাচার থাকলে তার শিশু ও অন্তঃসত্বা পুত্রবধূরা কি দোষ করলো সে জবাব কোন খুনির থাকে না। তারও নেই। আমি কেবল এই বইতে ডালিমের লেখা তথ্য থেকে মুজিবের স্নেহ আদর পেয়েও কতটা রোষে তার পুরো বংশধর শেষ করা হয়েছিল- কী ভয়ংকর সেই দ্বিজাতিত্ত্বের প্রতিশোধ সেটাই যাচাই করে নিলাম।
প্রকাশিত : রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

















