অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সামাজিক ব্যাধি

ক্ষুদীরাম দাস
মানুষ সামাজিক জীব। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার মধ্যদিয়েই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে। মানুষের সুখে আনন্দিত হওয়া, দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া মানবিকতার পরিচায়ক। কিন্তু বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে এর বিপরীত চিত্রও চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষের ব্যর্থতা, অপমান, বিপদ কিংবা ক্ষতিকে কেন্দ্র করে অন্য একজন আনন্দ উপভোগ করে। কারো উন্নতি দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া, সুযোগ পেলে তাকে বিপদে ফেলা, তার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো কিংবা কৌশলে তার ক্ষতি করে আত্মতৃপ্তি লাভ করার প্রবণতা সমাজে নানারূপে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রচলিত কথ্য ভাষায় এ ধরনের আচরণকে বলা হয়, ‘অন্যকে বাঁশ দেয়া’।

এখানে ‘বাঁশ দেয়া’ বলতে কাউকে বাস্তবে বাঁশ দেয়া বোঝানো হচ্ছে না; বরং কাউকে বিপাকে ফেলা, ঠকানো, অপদস্থ করা, তার কাজে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা এমন পরিস্থিতিতে ফেলা, যেখান থেকে তাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। আর এ কাজ করে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা নিছক রসিকতা নয়; অনেক সময় তা’ মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, হীনম্মন্যতা, ঈর্ষা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি সামাজিক বিনোদনের ছদ্মবেশে নিষ্ঠুরতার চর্চায় পরিণত হয়।

বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—প্রায় সর্বত্রই এ প্রবণতার নানা প্রকাশ দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়? এ প্রবণতা কীভাবে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়? এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের কী ক্ষতি হয়? সর্বোপরি, এ মানসিকতা থেকে মুক্তির উপায় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ করার প্রবণতাকে বুঝতে হলে এর বিভিন্নরূপ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। কেউ বন্ধুর সঙ্গে হালকা মজা করতে গিয়ে তাকে সাময়িক বিব্রত করতে পারে। আবার কেউ পরিকল্পিতভাবে অন্যের ক্ষতি করে, তাকে অপমানিত করে কিংবা তার সাফল্য নষ্ট করে আনন্দ পেতে পারে। এ দু’টি আচরণ এক নয়। প্রথমটি পারস্পরিক সম্মতি ও সীমাবোধের মধ্যে থাকলে নির্দোষ রসিকতা হতে পারে; দ্বিতীয়টি প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতা ও অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একজনের আনন্দের শর্ত হয়ে দাঁড়ায় অন্য একজনের অস্বস্তি। কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশ করে হাসাহাসি করা, ভুলের সুযোগ নিয়ে তাকে সবার সামনে ছোট করা, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে বিপদে ফেলা, পরীক্ষায় বা কর্মক্ষেত্রে অন্যের অগ্রগতিতে বাধা দেয়া কিংবা কারো আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিকে উপভোগ করা—এসব আচরণ এ প্রবণতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

অনেক সময় এ ধরনের আচরণকে চালাকির পরিচয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। যে অন্যকে বোকা বানাতে পারে, তাকে ‘চতুর’ বলা হয়; যে অন্যকে বিপদে ফেলতে পারে, তাকে ‘ওস্তাদ’ মনে করা হয়। অথচ অন্যের দুর্বলতার সুযোগ নেয়া প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা নয়। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের দক্ষতা ও বিবেচনাবোধ দিয়ে সমস্যা সমাধান করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের সাফল্যের সঙ্গে অন্যের সাফল্যের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
অতএব, কাউকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা নিছক একটি কথ্য অভিব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের মূল্যবোধ, মানসিক পরিপক্বতা এবং সামাজিক সম্পর্কের গুণগত অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বর্তমান সমাজে মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনবোধ মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রতিযোগিতা, তুলনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে।

বর্তমানে অনেকেই নিজের সাফল্যকে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করেন। প্রতিবেশী নতুন বাড়ি তৈরি করলেন, সহকর্মী পদোন্নতি পেলেন, বন্ধু ভালো চাকরি পেলেন কিংবা পরিচিত কেউ সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেন—এ ধরনের ঘটনা কারো কারো মনে অনুপ্রেরণার বদলে ঈর্ষা সৃষ্টি করে। তখন অন্যের সাফল্যকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে তার দুর্বলতা খোঁজা, তার অর্জনকে খাটো করা কিংবা তার ব্যর্থতার অপেক্ষায় থাকা শুরু হয়।

কেউ যখন বিপদে পড়েন, তখন প্রকৃত সহায়তা করার পরিবর্তে অনেকে তার অতীতের ভুল তুলে ধরেন। কেউ আর্থিক সংকটে পড়লে তাকে সাহায্য না করে তার জীবনযাপন নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়। কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে বারবার সেই ভুলের কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়। এভাবে মানুষের দুর্দশা কারো কারো কাছে সহমর্মিতার বিষয় না হয়ে বিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়।

এ প্রবণতার আরেকটি দিক হলো, নিজের ভুল স্বীকার না করে অন্যকে দোষী প্রমাণ করার চেষ্টা। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে অনেকে নিজের অযোগ্যতা বা ভুল সিদ্ধান্তের দায় নিতে চান না। বরং সহকর্মী, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা অধীনস্থ কাউকে দায়ী করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। এতে সাময়িকভাবে নিজের অবস্থান রক্ষা করা গেলেও পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।

তবে সমাজের সবাই এমন আচরণ করেন, এমন ধারণা সঠিক নয়। অসংখ্য মানুষ এখনো নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে সহযোগিতা করেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান এবং অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হন। তাই সমস্যাটিকে পুরো সমাজের চরিত্র হিসেবে না দেখে একটি ক্ষতিকর আচরণগত প্রবণতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা উচিত। একই সঙ্গে এর বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মনস্তাত্ত্বিক কারণ: কেন মানুষ অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়?
অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ করার পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করতে পারে। সব মানুষের ক্ষেত্রে কারণ এক নয়, আবার একই আচরণের পেছনে একাধিক কারণও থাকতে পারে।
১. ঈর্ষা ও হীনম্মন্যতা
ঈর্ষা এ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ। একজন মানুষ যখন অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তার মনে অসন্তোষ জন্ম নিতে পারে। নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে তিনি অন্যের সাফল্যকে নষ্ট করার কথা ভাবতে পারেন। অন্যের উন্নতি থামিয়ে দিতে পারলে নিজের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হবে—এমন একটি ভুল ধারণা তাকে পরিচালিত করতে পারে।
হীনম্মন্যতায় ভোগা মানুষ কখনো কখনো অন্যকে ছোট করে নিজের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। অন্যের দুর্বলতা প্রকাশ করে তিনি নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু অন্যকে নিচে নামিয়ে কেউ প্রকৃত অর্থে ওপরে উঠতে পারেন না। বরং এ আচরণ নিজের অনিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবকেই প্রকাশ করে।

২. প্রতিশোধপরায়ণতা
কেউ আগে অপমানিত হলে বা অন্যের কাছ থেকে অন্যায় আচরণের শিকার হলে তার মনে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা জন্মাতে পারে। তখন তিনি সুযোগ পেলে পাল্টা অপমান করতে চান। অনেক সময় প্রতিশোধের এ চক্র দীর্ঘস্থায়ী হয়। একজনের অন্যায়ের জবাবে আরেকজন অন্যায় করেন, এরপর প্রথম ব্যক্তি আবার প্রতিশোধ নেন। ফলে বিরোধের সমাধান না হয়ে তা ক্রমশ বিস্তৃত হয়।
নিজের অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করা এবং প্রতিশোধের আনন্দে অন্যকে কষ্ট দেয়া এক বিষয় নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকে অন্যায় বন্ধ করা; প্রতিশোধের লক্ষ্য অনেক সময় অন্যকে কষ্ট দেয়া। এ পার্থক্য উপলব্ধি করা জরুরি।

৩. ক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা
কিছু মানুষ অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষমতা অনুভব করেন। তারা মনে করেন, অন্যকে বিব্রত করতে পারা কিংবা তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারা তাদের প্রভাবশালী অবস্থানের প্রমাণ। বিশেষ করে যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য অসম, সেখানে এ ধরনের আচরণ সহজে প্রকাশ পেতে পারে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি অধীনস্থকে অকারণে অপমান করলে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুল নিয়ে বিদ্রূপ করলে কিংবা পরিবারের ক্ষমতাবান সদস্য দুর্বল সদস্যকে নিয়মিত হেয় করলে ক্ষমতার অপব্যবহারের পরিবেশ তৈরি হয়। তখন অন্যের কষ্টকে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৪. সহমর্মিতার অভাব
সহমর্মিতা মানুষকে অন্যের অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে। অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারলে তার কষ্টকে উপহাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু কেউ যদি অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে তার কাছে অপমান বা দুর্দশা তুচ্ছ মনে হতে পারে।
সহমর্মিতার অভাব সব সময় জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক শিক্ষা, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে মানুষের আচরণে এর ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই সহমর্মিতা চর্চা, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং নিজের আচরণের প্রভাব উপলব্ধি করার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. দলগত স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা
অনেক সময় একজন মানুষ নিজে থেকে অন্যকে অপমান করার সাহস পেতেন না। কিন্তু বন্ধুদের দল হাসাহাসি করলে কিংবা কোনো ব্যক্তি বিদ্রূপ করে সবার প্রশংসা পেলে তিনিও একই আচরণে উৎসাহিত হন। তখন অন্যকে কষ্ট দেয়া তার কাছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার উপায় হয়ে ওঠে। এখানে ব্যক্তির বিবেকের ওপর দলগত মানসিকতা প্রভাব বিস্তার করে। সবাই যখন হাসছেন, তখন কেউ ভুক্তভোগীর কষ্টের কথা ভাবতে চান না। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাসি কোনো আচরণকে নৈতিকভাবে সঠিক করে তোলে না।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ, মতপ্রকাশ ও তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এর অপব্যবহার অন্যকে অপদস্থ করে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি ভুল বক্তব্য দিলে, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়লে কিংবা কোনো ঘটনায় বিব্রত হলে তার ছবি, ভিডিও বা বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকেই পুরো ঘটনা না জেনেই বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন। কেউ আবার মজার নামে সম্পাদিত ছবি, অপমানজনক ক্যাপশন বা ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরি করেন। অল্প সময়ের মধ্যে একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিব্রতকর মুহূর্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য, শেয়ার এবং জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষা অনেককে এমন আচরণে উৎসাহিত করতে পারে, যা সামনাসামনি করতে তারা দ্বিধা বোধ করতেন। পর্দার আড়ালে থেকে মন্তব্য করার কারণে ভুক্তভোগীর কষ্ট অনেক সময় অনুভব করা যায় না। একটি মন্তব্য যে অন্য একজন মানুষের আত্মসম্মান, মানসিক স্বস্তি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনেকে বিবেচনায় নেন না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ক্ষেত্রে অনলাইন উপহাস উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। কোনো ব্যক্তির পুরোনো ভুল বা বিব্রতকর ঘটনার ভিডিও বহুদিন পরেও আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তিনি অতীতের একটি ঘটনার প্রভাব থেকে সহজে মুক্তি পান না। এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত অপমানের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। কোনো কাজের সমালোচনা করা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করা কিংবা যুক্তিসংগতভাবে কারো বক্তব্যের বিরোধিতা করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কাউকে হেয় করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা কিংবা দলবদ্ধভাবে হয়রানি করা সমালোচনার সমার্থক নয়। ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অনলাইন আচরণের নৈতিকতা নিশ্চিত করা না গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ব্যাধি আরো বিস্তার লাভ করতে পারে। পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই মানুষ ভালোবাসা, সম্মান, সহযোগিতা ও নৈতিকতার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু কোনো পরিবারে যদি নিয়মিত একজন সদস্যকে অন্যদের সামনে অপমান করা হয়, ভাইবোনের মধ্যে তুলনা করা হয় কিংবা কারো দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা হয়, তাহলে তা পরিবারের সুস্থ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অনেক সময় বাবা-মা সন্তানদের মধ্যে তুলনা করেন। একজন ভালো ফল করলে অন্যজনকে তার সঙ্গে তুলনা করে ছোট করা হয়। উদ্দেশ্য হয়তো সন্তানকে উৎসাহিত করা, কিন্তু পদ্ধতিটি তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে। একইভাবে ভাইবোনের ব্যক্তিগত ভুল, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, আর্থিক অবস্থা কিংবা সামাজিক অক্ষমতা নিয়ে নিয়মিত বিদ্রূপ করা হলে পারস্পরিক ভালোবাসার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা ও বিরূপতা জন্ম নিতে পারে।
দাম্পত্য সম্পর্কেও এ প্রবণতা ক্ষতিকর। মতবিরোধের সময় পুরোনো ভুল তুলে আনা, অন্যের পরিবারকে অপমান করা, ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশের হুমকি দেয়া কিংবা সন্তানদের সামনে সঙ্গীকে হেয় করা সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে। এতে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা ও সম্মানের অনুভূতি হারাতে পারেন।

পরিবারের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনার মাধ্যমে, অপমানের মাধ্যমে নয়। শিশুদের শেখাতে হবে যে ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু কাউকে অপমান করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। পরিবারে প্রত্যেকের কথা শোনার সুযোগ এবং পারস্পরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের আচরণ অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচরণ শেখারও ক্ষেত্র। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীকে দুর্বলতা, আর্থিক অবস্থা, পোশাক, শারীরিক গঠন, উচ্চারণ, ফলাফল কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে উপহাস করা হলে তা তার স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
কখনো নতুন শিক্ষার্থীকে পরিচিত হওয়ার নামে বিব্রতকর কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কখনো কোনো শিক্ষার্থী ভুল উত্তর দিলে পুরো শ্রেণি হাসাহাসি করে। আবার কোনো শিক্ষার্থীকে দল থেকে বাদ দেয়া, তার জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখা কিংবা তার সম্পর্কে অপমানজনক গুজব ছড়ানোর ঘটনাও ঘটতে পারে। এ ধরনের আচরণ বারবার ঘটলে তা দলবদ্ধ হয়রানি বা বুলিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এখানে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যদি অন্যের ভুল নিয়ে বিদ্রূপ করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা সেটিকে গ্রহণযোগ্য আচরণ বলে মনে করতে পারে। বিপরীতে শিক্ষক যদি ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা একে অপরের প্রতি সহনশীল হতে শেখে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্পষ্ট আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, পরামর্শসেবা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে দোষারোপ না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। একই সঙ্গে যে শিক্ষার্থী হয়রানি করছে, তার আচরণের দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। যে শিক্ষা একজন মানুষকে অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায় না, তার মানবিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।

কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা যখন অন্যকে পেছনে ফেলার উদ্দেশ্যে অনৈতিক কৌশলে রূপ নেয়, তখন তা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট করে। কোনো সহকর্মীর কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা, ভুল নির্দেশনা দিয়ে তাকে ব্যর্থ করা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা কিংবা তার পদোন্নতি ঠেকাতে অপপ্রচার চালানো—এসব আচরণ কর্মক্ষেত্রে অন্যকে বাঁশ দেয়ার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে। এ ধরনের পরিবেশে কর্মীরা পরস্পরকে সহযোগী হিসেবে না দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। ফলে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কমে যায়, সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। দক্ষ মানুষও কখনো কখনো এমন পরিবেশে কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি শুধু ফলাফলকে গুরুত্ব দেয় এবং আচরণগত নৈতিকতাকে উপেক্ষা করে, তাহলে অনৈতিক প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, ন্যায্য পদোন্নতি, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং সম্মানজনক যোগাযোগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে শুধু কে কতটা এগিয়ে গেলেন তার ওপর নয়; বরং সবাই মিলে কতটা ভালো ফল অর্জন করতে পারলেন, তার ওপরও। সহকর্মীকে ব্যর্থ করে নিজের সাফল্য প্রতিষ্ঠা করা সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। রাজনীতি মূলত জনকল্যাণ, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, অপপ্রচার ও প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভুল থাকলে তার যুক্তিসংগত সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ। কিন্তু প্রতিপক্ষের বক্তব্য বিকৃত করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক আক্রমণ করা কিংবা তার দুর্দশাকে রাজনৈতিক বিনোদনে পরিণত করা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। একইভাবে স্থানীয় সমাজে ক্ষমতা বা প্রভাবের অধিকারী কেউ যদি দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগান, তাহলে সামাজিক ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কখনো কখনো নিজেদের বিরোধীদের সামাজিকভাবে হেয় করতে কিংবা তাদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, অবিশ্বাস ও অসহায়ত্ব তৈরি হয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি শত্রু নন। যুক্তির মাধ্যমে মতভেদ প্রকাশ করা এবং অন্যের মর্যাদা রক্ষা করা সভ্য সমাজের পরিচয়। প্রতিপক্ষের ক্ষতিতে আনন্দিত হওয়ার বদলে তার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ দেয়া অধিকতর ফলপ্রসূ।

অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। সমাজে যখন অর্থ, সম্পদ, পদমর্যাদা ও বাহ্যিক সাফল্যকে মানুষের মূল্য নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন অনেকে অন্যকে ছোট করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চান। দরিদ্র মানুষের পোশাক, বাসস্থান বা পেশা নিয়ে বিদ্রূপ করা; কারো আর্থিক দুরবস্থাকে তার ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা; কিংবা ঋণগ্রস্ত মানুষকে অপমান করে সামাজিকভাবে হেয় করা—এসব আচরণ মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী। আর্থিক সংকটে পড়া একজন মানুষের পরিস্থিতির পেছনে অসুস্থতা, কর্মসংস্থানের অভাব, পারিবারিক দায়িত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো অনিয়ন্ত্রিত কারণ থাকতে পারে। তাই তার দুরবস্থাকে উপহাস করার আগে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একইভাবে সম্পদশালী মানুষের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার ক্ষতি কামনা করাও ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় নয়। সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার অর্থ কাউকে নিচে নামিয়ে দেয়া নয়; বরং প্রত্যেকের জন্য ন্যায্য সুযোগ সৃষ্টি করা। মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সমাজের প্রতি অবদানও একজন মানুষের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ উপলব্ধি যত বিস্তৃত হবে, ততই অন্যকে ছোট করে আত্মতৃপ্তি লাভের প্রবণতা কমবে।
আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় এমন অনেক শব্দ ও বাক্য ব্যবহৃত হয়, যা কখনো নির্দোষ রসিকতা হিসেবে প্রচলিত হলেও কখনো অপমানের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বন্ধুদের মধ্যে ঠাট্টা-মশকরা সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করতে পারে। কিন্তু রসিকতার নামে কাউকে বারবার হেয় করা হলে তা আর সুস্থ বিনোদন থাকে না। কোনো রসিকতা গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন কি না। দ্বিতীয়ত, রসিকতাটি কি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, আর্থিক অবস্থা কিংবা সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে লক্ষ্য করছে? তৃতীয়ত, এতে কি কারো সম্মান, নিরাপত্তা বা সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? যে রসিকতায় সবাই আনন্দ পান, সেটি সাধারণত সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু একজন হাসছেন আর অন্যজন অপমানিত বোধ করছেন—এমন পরিস্থিতিতে শুধু হাসির উপস্থিতিকে নির্দোষতার প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। এখানে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলেন যে কোনো মন্তব্যে তিনি কষ্ট পেয়েছেন, তাহলে তাকে ‘এতো সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’ বলে উড়িয়ে দেয়া উচিত নয়। বরং নিজের আচরণের প্রভাব উপলব্ধি করে প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া উচিত। সুস্থ রসিকতার উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি করা, কাউকে মানসিকভাবে পরাজিত করা নয়। অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করতে পারলেই হাস্যরস মানবিক সৌন্দর্যে পরিণত হয়।

অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ করার প্রবণতা প্রথমে ছোটখাটো আচরণ বলে মনে হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব বহুমাত্রিক।

প্রথমত, এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশ্বাস নষ্ট করে। একজন মানুষ যদি মনে করেন যে তার বন্ধু, সহকর্মী কিংবা আত্মীয় তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে অপমান করতে পারেন, তাহলে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে নিজের কথা প্রকাশ করতে পারবেন না। সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ ও দূরত্ব তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত, এ আচরণ ভুক্তভোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বারবার অপমানিত হলে তার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে, উদ্বেগ বাড়তে পারে এবং তিনি সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে পারেন। গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী হয়রানির ক্ষেত্রে মানসিক সহায়তার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত, এটি অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে। যখন সমাজে কাউকে অপমান করা বা বিপদে ফেলা হাসি-তামাশার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে এ আচরণের নৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পরিবর্তে দর্শক হয়ে থাকা কিংবা উপহাসে অংশ নেয়া সহজ হয়ে যায়।

চতুর্থত, এ প্রবণতা সহযোগিতার সংস্কৃতি দুর্বল করে। মানুষ যখন একে অপরের ক্ষতিতে আনন্দ পেতে অভ্যস্ত হন, তখন সম্মিলিত উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক সমস্যা সমাধানের বদলে ব্যক্তিগত দোষারোপ ও প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পায়।

পঞ্চমত, এটি পরবর্তী প্রজন্মের আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। তারা যদি দেখেন যে কাউকে অপমান করলে প্রশংসা পাওয়া যায়, তাহলে তারাও একই আচরণ শিখতে পারেন। এভাবে একটি ক্ষতিকর সামাজিক অভ্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অতএব, বিষয়টিকে নিছক মজার অভ্যাস হিসেবে উপেক্ষা করা উচিত নয়। এর প্রতিরোধ সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক সুস্থতা এবং নৈতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রবণতা দূর করার প্রথম শর্ত হলো আত্মসমালোচনা। অন্যের আচরণ নিয়ে অভিযোগ করা সহজ, কিন্তু নিজের আচরণ অন্যকে কষ্ট দিচ্ছে কি না, তা যাচাই করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। প্রত্যেকের উচিত নিজের কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা। কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলে কেমন লাগতো? আমার মন্তব্য কি অন্য ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন করছে? আমি কি সমস্যার সমাধান করছি, নাকি শুধু কাউকে বিব্রত করে আনন্দ পাচ্ছি? এ ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা মানুষের আচরণে সংযম আনতে পারে। একই সঙ্গে ভুল স্বীকার করার সাহসও গড়ে তুলতে হবে। অন্যের ক্ষতি করে থাকলে তা অস্বীকার না করে ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করা নৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে মানুষের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু ভুলের কারণে তাকে অপমান করার অধিকার কারো নেই। অন্যের সাফল্যে অভিনন্দন জানানো, বিপদে সহযোগিতা করা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার অভ্যাস পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে তুলতে হবে। নৈতিক শিক্ষা শুধু বইয়ের পাঠে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাস্তব জীবনে বড়দের আচরণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সম্মানজনক আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে তা অন্যদেরও প্রভাবিত করবে।

অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা কমাতে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১. ব্যক্তিগত পর্যায়ে
প্রত্যেককে নিজের আচরণের দায় নিতে হবে। রাগ, ঈর্ষা কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত। অন্যের ভুল নিয়ে প্রকাশ্যে হাসাহাসি না করে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। কারো দুর্দশার কথা শুনলে বিদ্রূপ না করে সহায়তার সুযোগ খোঁজা উচিত।
২. পারিবারিক পর্যায়ে
পরিবারে তুলনা, অপমান ও পক্ষপাতমূলক আচরণ পরিহার করতে হবে। শিশুদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য অন্যকে অপমান করলে বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে না গিয়ে শান্তভাবে আচরণটির অসংগত দিক বোঝানো প্রয়োজন।
৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
বুলিং প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা থাকা দরকার। সহমর্মিতা, দলগত কাজ, বিরোধ নিষ্পত্তি ও ডিজিটাল নৈতিকতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. কর্মক্ষেত্রে
প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, ন্যায্য সুযোগ, সম্মানজনক যোগাযোগ এবং অনিয়মের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মীর ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার ও ইচ্ছাকৃতভাবে কাজের ক্ষতি করার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ নীতিমালা কার্যকর করতে হবে।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা অভিযোগ শেয়ার করার আগে তার সত্যতা ও সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করতে হবে। কারো ব্যক্তিগত দুর্দশাকে ভাইরাল করার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অনলাইন হয়রানির শিকার হলে প্রমাণ সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
৬. গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতে
জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য কাউকে অপমান করা কিংবা ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে বিনোদনের উপকরণ বানানো থেকে বিরত থাকা দরকার। গণমাধ্যমের উচিত এমন বিষয়বস্তু উৎসাহিত করা, যা মানুষের মধ্যে সচেতনতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। ব্যঙ্গ ও সমালোচনা যেন ব্যক্তিগত হয়রানিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
৭. সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে
স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেতে পারে। বিরোধ দেখা দিলে প্রতিহিংসা উসকে না দিয়ে সংলাপ, ন্যায্যতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ অনুসরণ করা উচিত। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের আচরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৮. আইন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে
সব ধরনের ঠাট্টা বা অপমানকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত নয়। তবে হুমকি, প্রতারণা, মানহানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অননুমোদিত প্রকাশ কিংবা অন্যান্য আইনবিরোধী আচরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, ন্যায্য প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য প্রতিটি মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে সম্মানজনক আচরণ সামাজিকভাবে স্বীকৃত এবং অন্যায় আচরণের জন্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়।

মানুষের জীবনে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিযোগিতার অর্থ অন্যকে ধ্বংস করা নয়। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে অন্য শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা কমে যায় না। একজন কর্মী পদোন্নতি পেলে অন্য কর্মীর দক্ষতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। একজন উদ্যোক্তা সফল হলে অন্য উদ্যোক্তার জন্য সব সুযোগ শেষ হয়ে যায় না।
বরং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েই উপকৃত হতে পারে। অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে না দেখে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারো ভুল দেখলে তাকে অপমান করার পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেয়া উচিত। একটি সুস্থ সমাজে মানুষের মূল্যায়ন হয় তার সততা, দক্ষতা, মানবিকতা ও অবদানের ভিত্তিতে। সেখানে অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয় না। বরং সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যের বিপদে হাসা সহজ, কিন্তু তার পাশে দাঁড়াতে সাহস লাগে। অন্যকে অপমান করা সহজ, কিন্তু সম্মান দিয়ে কথা বলতে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। অন্যের ভুল প্রচার করা সহজ, কিন্তু তাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া উদারতার পরিচয়। তাই সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে শুধু অন্যের আচরণ পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না; নিজের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। ‘অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ’—কথাটি প্রচলিত ও হাস্যরসাত্মক মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। অন্যকে বিপদে ফেলে আনন্দ পাওয়া, তার ব্যর্থতায় উল্লসিত হওয়া, দুর্বলতার সুযোগ নেয়া কিংবা অপমানকে বিনোদনে পরিণত করা কোনো সুস্থ সামাজিক বৈশিষ্ট্য নয়। এটি ঈর্ষা, হীনম্মন্যতা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহমর্মিতার অভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে এ প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা যায়। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশ্বাস নষ্ট হয়, মানুষের মানসিক স্বস্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এ আচরণকে শুধু মজার বিষয় হিসেবে না দেখে এর ক্ষতিকর দিকগুলো উপলব্ধি করা জরুরি। তবে আশার কথা হলো, মানুষের আচরণ পরিবর্তনযোগ্য। আত্মসমালোচনা, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, ডিজিটাল নাগরিকত্বের চর্চা এবং সহমর্মিতার বিকাশের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমানো সম্ভব। প্রত্যেককে বুঝতে হবে, অন্যকে ছোট করে নিজের মর্যাদা বাড়ানো যায় না; অন্যের ক্ষতি করে স্থায়ী আনন্দও অর্জন করা যায় না।

আমরা যদি অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে শিখি, বিপদে পাশে দাঁড়াই, ভুলের জন্য সংশোধনের সুযোগ দিই এবং রসিকতার মধ্যেও মানুষের সম্মান রক্ষা করি, তাহলে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় এই নয় যে সেখানে কে কাকে কতটা বিপদে ফেলতে পারে; বরং পরিচয় হলো, সেখানে মানুষ কতটা নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং সহযোগিতার পরিবেশে বসবাস করতে পারে। অতএব, অন্যকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ করার মানসিকতা পরিহার করে আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কারো কান্না অন্যের হাসির কারণ হবে না, কারো ব্যর্থতা অন্যের অহংকারের উপকরণ হবে না এবং কারো অসহায়ত্বকে কেউ নিজের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে না। কারণ প্রকৃত আনন্দ অন্যকে কষ্ট দেয়ার মধ্যে নয়; বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে।

প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy