নিভে যাওয়া প্রদীপ : ক্ষুদীরাম দাস

এক.
রাত বাড়ছিল। জানালার বাইরে শহরের আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছিল, কিন্তু রুমের ভেতরের অন্ধকার তবু জেগে ছিল। প্রদীপ নিভে গেলে ঘর অন্ধকার হয়—মানুষ এটা সহজে বোঝে। কিন্তু মন নিভে গেলে কী হয়, সেটা বোঝা যায় না কারও কাছে। তখন গোটা পৃথিবী আলোকিত থাকলেও মানুষ নিজেকে অন্ধকার মনে করে।

আরিফুল ইসলাম সেই রাতে বারান্দায় বসে ছিল। হাতে এক কাপ ঠান্ডা চা, যেটা সে অনেকক্ষণ ধরে ছুঁয়েই ছিল, পান করেনি। তার বয়স তখন আটত্রিশ। শরীরটা এখনো শক্ত, মুখে দাড়ি, কপালে সামান্য কুঁচকানো ভাঁজ। কিন্তু চোখদুটোতে এমন একটা ক্লান্তি ছিল, যেন সে অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছে—শুধু রাস্তা নয়, নিজের ভেতর দিয়েও হেঁটেছে।

বাড়িটা ছিল পুরনো। দেয়ালে সময়ের দাগ, ছাদে বৃষ্টির চুঁইয়ে পড়া চিহ্ন, উঠানে একটা পুরনো আমগাছ। একসময় এই বাড়িতে হাসি ছিল। মায়ের ডাক ছিল, বাবার সকালের নামাজের আওয়াজ ছিল, ভাইবোনদের ঝগড়া ছিল। এখন সব শেষ। বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগে। মা এখনো বেঁচে আছেন, কিন্তু তার সঙ্গে আরিফুলের কথা বলা হয় না বললেই চলে। ভাই রাশেদ শহরের অন্য প্রান্তে থাকে, বোন সাদিয়া স্বামীর বাড়িতে। আরিফুল একা।

একা থাকাটা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু এই রাতে একাকিত্বটা অন্যরকম ভারী লাগছিল।
সে ভাবছিল—মানুষ কি সত্যিই নিজের ভুল বুঝতে পারে? নাকি সে শুধু বুঝেও চুপ করে থাকে, কারণ স্বীকার করাটা খুব কষ্টের?
আরিফুলের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ছিল, যেগুলো সে কাউকে বলেনি। কাউকে বলার সাহসও পায়নি। সেগুলো তার বুকের ভেতরে পাথরের মতো চাপা পড়ে আছে। দিনে সে কাজ করে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, হাসেও। কিন্তু রাত নামলে সব মুখোশ খুলে যায়। তখন সে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। আর নিজেকে চিনতে পারে না।

দুই.
আরিফুলের জীবনে তিনটা মানুষ ছিল, যাদের কারণে সে আজ এই অবস্থায়।
প্রথমজন ছিল তার বন্ধু জাহিদ। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে তারা। একই স্কুল, একই মসজিদ, একই উঠানে খেলা। জাহিদ ছিল চটপটে, রসিক, সবার সঙ্গে মিশে যায়। আরিফুল ছিল চুপচাপ, লাজুক। মানুষ বলত, জাহিদ আরিফুলের মুখের কথা বলে।

কিন্তু বড় হওয়ার পর জাহিদ বদলে গেল। সে টাকার পেছনে ছুটতে শুরু করল। ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণ নিল, তারপর ঋণ শোধ করতে না পেরে অন্যের টাকা খেয়ে ফেলল। আরিফুলকেও টানল সেই পথে। একসময় আরিফুলের বাবার জমির দলিল জাহিদের হাতে চলে গেল। বাবা অসুস্থ, আরিফুল অনভিজ্ঞ—জাহিদ সুযোগটা নিল। সে বলেছিল, “ভাই, আমি তো তোদের জন্যই করছি। পরে সব ফিরিয়ে দেব।”
পরে কিছুই ফিরে আসেনি।
জাহিদ শহর ছেড়ে চলে গেল। কিছুদিন পর খবর পাওয়া গেল, সে অন্য জেলায় আরেকটা প্রতারণার মামলায় জেলে আছে। জেলে তার শরীর ভেঙে গেছে। বন্ধুরা ছেড়ে গেছে, পরিবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সে এখন জেলের ভেতরে বসে ভাবে—যে টাকা সে জমিয়েছিল, সেটা তাকে রাখতে পারেনি। যে মানুষদের সে ঠকিয়েছিল, তাদের মুখ সে আর দেখতে পারবে না।
আরিফুল জাহিদকে ক্ষমা করেনি। কিন্তু জাহিদের কষ্টের খবর শুনে সে আনন্দিতও হয়নি। বরং ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করেছিল। কারণ সে বুঝেছিল—ক্ষতি করা মানুষের পরিণতি শেষ পর্যন্ত নিজেই সহ্য করতে হয়।
দ্বিতীয়জন ছিল তার চাচাতো ভাই নাসির। নাসির ছিল বড়, শক্তিশালী, রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তার। সে সবসময় নিজেকে ঠিক মনে করত। যাকে পছন্দ হতো না, তাকে সে ছোট করত। আরিফুলের বাবার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। নাসির মামলা করল, সাক্ষী ভাড়া করল, এমনকি মসজিদের ইমামকেও চাপ দিল।
আরিফুলের বাবা অসুস্থ ছিলেন। মামলার চাপে তার শরীর আরও খারাপ হলো। একদিন সে মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি আরিফুলের হাত ধরে বলেছিলেন, “বাবা, কারও সঙ্গে ঝগড়া করিস না। আল্লাহর কাছে সব হিসাব আছে।”
আরিফুল তখন ছোট ছিল, রাগ বেশি ছিল। সে চেয়েছিল নাসিরের শাস্তি হোক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে দেখল—নাসিরের শাস্তি আদালতে হয়নি, হয়েছে তার নিজের জীবনে।
নাসিরের ছেলে বড় হয়ে বাবার পথ ধরল। সেও অন্যের জমি দখল করতে চাইল। কিন্তু এবার মানুষ আর চুপ থাকল না। গ্রামের লোকজন একত্রিত হলো। মামলা হলো, নাসিরের সম্পত্তি জব্দ হলো। সে একসময় যে সম্মান নিয়ে চলত, সেটা হারিয়ে ফেলল। মানুষ তাকে রাস্তায় দেখলে চোখ নামিয়ে নেয়। তার নিজের ছেলেও তাকে দোষ দিত।
নাসির শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গেল। চোখে দেখতে পারত না, কিন্তু মনে মনে সব দেখত—যে মানুষগুলোকে সে কষ্ট দিয়েছিল, তাদের মুখ। সে বলত, “আমি ভেবেছিলাম টাকা আর ক্ষমতা সব কিছু কিনতে পারে। কিন্তু এখন দেখি, মানুষের মন কেনা যায় না।”
আরিফুল নাসিরকে দেখতে গিয়েছিল একবার। নাসির তার হাত ধরে কেঁদেছিল। ক্ষমা চেয়েছিল। আরিফুল কিছু বলেনি। শুধু চুপ করে বেরিয়ে এসেছিল। কারণ ক্ষমা করাটা তার পক্ষে তখনো সম্ভব ছিল না।
তৃতীয়জন ছিল তার নিজের ভাই রাশেদ।
এটাই সবচেয়ে কষ্টের।
রাশেদ ছোট ছিল, আরিফুল বড়। ছোটবেলায় আরিফুল তাকে সব সময় রক্ষা করত। স্কুলে কেউ মারলে আরিফুল সামনে দাঁড়াত। কিন্তু বড় হওয়ার পর রাশেদ বদলে গেল। সে টাকার লোভে পড়ল। আরিফুলের ব্যবসার টাকা চুরি করল। তারপর সেটা দিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করল।
আরিফুল জানত, কিন্তু প্রমাণ ছিল না। মা বিশ্বাস করেননি। রাশেদ বলেছিল, “ভাই, তুমি আমাকে দোষ দিচ্ছ। আমি তোমার ভাই।”
আরিফুল চুপ করে গেল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা ঘা হয়ে গেল। সে ভাবত—নিজের ভাই, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, সে-ই তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করল।
রাশেদের ব্যবসা প্রথমে ভালো চলল। কিন্তু পরে তার অংশীদার তাকে ঠকাল। সে যেভাবে ভাইকে ঠকিয়েছিল, সেভাবেই সে ঠকা হলো। টাকা গেল, ব্যবসা গেল, সম্মান গেল। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেল। ছেলেমেয়ে মায়ের কাছে থাকে। রাশেদ এখন একা, ছোট একটা ভাড়া বাসায় থাকে।
একদিন আরিফুল রাস্তায় রাশেদকে দেখেছিল। রাশেদ তাকে দেখে মুখ নামিয়ে নিল। আরিফুলও কিছু বলল না। দুজনেই চুপ করে হেঁটে গেল। কিন্তু দুজনের ভেতরেই একটা ভাঙা জায়গা ছিল, যেটা কেউ সারাতে পারেনি।

তিন.
আরিফুল শুধু অন্যের দোষ ভাবত না। সে নিজের ভুলও ভাবত।
সে ভাবত—আমি কি ঠিক ছিলাম? আমি কি যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম? আমি কি সঠিক সময়ে কথা বলেছিলাম?
সে মনে করত, যখন জাহিদ প্রথম ভুল করছিল, তখন সে কিছু বলেনি। ভেবেছিল, বন্ধু তো, সে নিজেই বুঝবে। কিন্তু বুঝেনি। আরিফুলের নীরবতা জাহিদকে আরও সাহস দিয়েছিল।
সে মনে করত, যখন নাসির মামলা করছিল, তখন সে আরও শক্তভাবে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সে ভয় পেয়েছিল। ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল। ফলে বাবার কষ্ট বেশি হয়েছে।
সে মনে করত, যখন রাশেদ টাকা চুরি করছিল, তখন সে সরাসরি মুখোমুখি হতে পারত। কিন্তু সে চুপ করে গিয়েছিল। ফলে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে গেছে।
এই ভাবনাগুলো তাকে রাতে ঘুমাতে দিত না।
সে ভাবত—আমি কি নিজেও দোষী নই? আমি কি নীরব থেকে ক্ষতি করিনি?
এই প্রশ্নটা তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।

চার.
একদিন সকালে আরিফুল মায়ের বাড়িতে গেল। মা এখন বয়সে বড়, চোখে দেখতে পান কম। কিন্তু মনটা এখনো জাগ্রত।
আরিফুল দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। মা শুনে বললেন, “কে?”
আরিফুল বলল, “আমি, মা।”
মা একটু চুপ করলেন। তারপর বললেন, “ভেতরে আয়।”
আরিফুল ভেতরে গেল। মা বসে ছিলেন। তার মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে এখনো একটা স্নেহ ছিল।
আরিফুল বসল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর মা বললেন, “তুমি ঠিক আছ?”
আরিফুল বলল, “হ্যাঁ, মা।”
মা জানত, সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “তোমার ভাইয়ের খবর শুনেছ?”
আরিফুল চুপ করল।
মা বললেন, “সে খুব খারাপ অবস্থায় আছে। তুমি একবার দেখতে যাও।”
আরিফুল বলল, “মা, আমি যাব না।”
মা চুপ করলেন। তারপর বললেন, “তোমার বাবা বলতেন, মানুষ ভুল করে। কিন্তু ভুল বুঝে ফিরে আসতে পারে। তুমি কি তাকে একবার সুযোগ দিতে পারবে না?”
আরিফুল বলল, “মা, সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে।”
মা বললেন, “আমি জানি। কিন্তু তুমি কি তাকে কষ্ট দিতে পারবে না? তুমি কি তার জন্য দোয়া করতে পারবে না?”
আরিফুল চুপ করে গেল।
মা বললেন, “বাবা, ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়। ক্ষমা করা শক্তি। কিন্তু ক্ষমা করতে হয় নিজের ভেতর থেকে। জোর করে ক্ষমা করলে সেটা ক্ষমা হয় না।”
আরিফুল সেদিন বেশি কথা বলেনি। কিন্তু ফিরে আসার পথে তার মনে হলো—হয়তো মা ঠিক।

পাঁচ.
সেই রাতে আরিফুল আবার বারান্দায় বসল।
সে ভাবল—মানুষ কেন অন্যকে কষ্ট দেয়? টাকার জন্য? ক্ষমতার জন্য? নাকি নিজের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে?
সে ভাবল—জাহিদ টাকার জন্য করেছিল। নাসির ক্ষমতার জন্য করেছিল। রাশেদ লোভের জন্য করেছিল। কিন্তু সবার শেষ পরিণতি এক—তারা সবাই একা হয়ে গেছে।
সে ভাবল—আমি কি একা নই? আমি কি তাদের থেকে আলাদা?
এই প্রশ্নটা তাকে কাঁপিয়ে তুলল।
সে বুঝল—সেও কাউকে কষ্ট দিয়েছে। নীরব থেকে, অবহেলা করে, রাগ দেখিয়ে। সেও মানুষকে আঘাত করেছে। হয়তো ইচ্ছা করে নয়, কিন্তু ফলটা তো একই।
সে ভাবল—আমি কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে কঠিন ছিল।

ছয়.
পরের দিন সন্ধ্যায় আরিফুল মসজিদে গেল। অনেকদিন পর সে নিয়মিত আসছিল।
ইমাম সাহেব বয়স্ক মানুষ। তিনি আরিফুলকে দেখে বললেন, “অনেকদিন দেখিনি।”
আরিফুল বলল, “ব্যস্ত ছিলাম।”
ইমাম হাসলেন। বললেন, “সবাই ব্যস্ত। কিন্তু মন যখন ব্যস্ত থাকে, তখন আল্লাহর কাছে যাওয়া দরকার।”
আরিফুল চুপ করল।
নামাজের পর ইমাম তাকে ডাকলেন। বললেন, “তোমার মুখে কিছু একটা আছে। বলবে?”
আরিফুল প্রথমে চুপ করল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমার ভেতরে অনেক কিছু জমে আছে। কাউকে বলিনি।”
ইমাম বললেন, “মানুষ সব কিছু বহন করতে পারে না। কিছু জিনিস আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিতে হয়।”
আরিফুল বলল, “আমি ক্ষমা করতে পারছি না।”
ইমাম বললেন, “ক্ষমা করতে হবে না আজই। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। আর নিজেকেও ক্ষমা করতে হবে।”
আরিফুল জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে?”
ইমাম বললেন, “প্রথমে স্বীকার করো যে তুমি ভুল করেছ। তারপর দোয়া করো। তারপর অন্যকে সাহায্য করো। ধীরে ধীরে মন হালকা হবে।”
আরিফুল সেদিন মসজিদ থেকে বের হয়ে একটু হালকা অনুভব করল। সব না, কিন্তু কিছুটা।

সাত.
কয়েকদিন পর আরিফুল রাশেদের বাসায় গেল।
রাশেদ দরজা খুলে অবাক হলো। সে ভাবত না ভাই আসবে।
আরিফুল বলল, “ভেতরে যাই?”
রাশেদ পথ দেখাল।
বাসাটা ছোট, পরিষ্কার নয়। রাশেদ একা বসে ছিল। তার চোখে ক্লান্তি, মুখে নিস্তেজতা।
আরিফুল বসল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর রাশেদ বলল, “তুমি কেন এসেছ?”
আরিফুল বলল, “মা বলেছে দেখতে যেতে।”
রাশেদ মাথা নিচু করল।
আরিফুল বলল, “আমি তোমাকে ক্ষমা করিনি। এখনো করিনি। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।”
রাশেদ কাঁদতে শুরু করল। সে বলল, “ভাই, আমি ভুল করেছি। আমি জানতাম আমি ভুল করছি। কিন্তু লোভটা আমাকে ছাড়ত না।”
আরিফুল বলল, “আমি জানি।”
রাশেদ বলল, “আমি তোমাকে ফেরত দিতে চাই। কিন্তু আমার কাছে কিছু নেই।”
আরিফুল বলল, “টাকা চাই না। আমি চাই তুমি নিজেকে সোজা করো।”
রাশেদ মাথা তুলে তাকাল। প্রথমবারের মতো তার চোখে একটা আশা দেখা গেল।
আরিফুল বলল, “তুমি নতুন করে শুরু করো। ছোট কাজ করো। সততার সঙ্গে করো। আমি সাহায্য করব।”
রাশেদ কাঁদতে লাগল।
আরিফুল সেদিন বাসা থেকে বের হয়ে ভাবল—হয়তো ক্ষমা করাটা এত কঠিন না। কঠিন হলো নিজের অহংকার ভাঙা।

আট.
কিছুদিন পর আরিফুলের কাছে জেল থেকে একটা চিঠি এলো। জাহিদের লেখা।
চিঠিতে জাহিদ লিখেছিল—সে তার ভুল বুঝেছে। সে জানে সে আরিফুলের পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে। সে ক্ষমা চায় না, কারণ সে জানে সে ক্ষমার যোগ্য নয়। কিন্তু সে চায় আরিফুল জানুক, সে তার ভুল স্বীকার করেছে।
আরিফুল চিঠিটা অনেকবার পড়ল।
সে ভাবল—জাহিদ এখন জেলে। তার শরীর ভাঙছে। কিন্তু তার মন হয়তো এখন আগের চেয়ে সৎ হয়েছে।
আরিফুল সিদ্ধান্ত নিল—সে জাহিদকে উত্তর দেবে। ক্ষমা করবে না, কিন্তু উত্তর দেবে। কারণ নীরবতাও কখনো কখনো আঘাত হয়।
সে লিখল—“তোমার কথা পড়েছি। আমি তোমাকে ক্ষমা করিনি। কিন্তু আমি চাই তুমি নিজেকে সংশোধন করো। যা হয়েছে, তা ফিরে আসবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে তুমি ভালো মানুষ হতে পারো।”
চিঠিটা পাঠানোর পর আরিফুলের মনে হলো—সে একটা ভার কমিয়েছে।

নয়.
নাসিরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। সে এখন প্রায় শয্যাশায়ী। তার ছেলে তাকে দেখতে আসে না বললেই চলে। স্ত্রী আছে, কিন্তু মনে মনে দূরে।
একদিন আরিফুল তাকে দেখতে গেল।
নাসির শুয়ে ছিল। চোখ বন্ধ। আরিফুল পাশে বসল।
নাসির চোখ খুলল। বলল, “তুমি এসেছ?”
আরিফুল বলল, “হ্যাঁ।”
নাসির বলল, “আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমি তোমার বাবাকে কষ্ট দিয়েছি। আমি তোমাদের পরিবারকে কষ্ট দিয়েছি।”
আরিফুল চুপ করল।
নাসির বলল, “আমি এখন বুঝি—যে মানুষকে আমি ছোট করেছি, তারাই আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিল। কিন্তু আমি তখন বুঝিনি।”
আরিফুল বলল, “চাচা, এখন বুঝলেই হলো।”
নাসির কাঁদল। বলল, “আমি কি ক্ষমা পাব?”
আরিফুল বলল, “আল্লাহর কাছে চাইলে সবাই ক্ষমা পায়।”
নাসির মাথা নাড়ল।
কয়েকদিন পর নাসির মারা গেল। মৃত্যুর আগে তিনি তার ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন—“আমার ভুল পুনরাবৃত্তি করিস না। মানুষকে ছোট করিস না। টাকা আর ক্ষমতা সব কিছু নয়।”
ছেলেটা প্রথমে কিছু বোঝেনি। কিন্তু পরে, নিজের জীবনে কষ্ট পেয়ে, সে বুঝল—বাবার কথা কতটা সত্য ছিল।

দশ.
সময় যাচ্ছিল। আরিফুলের জীবনে ধীরে ধীরে কিছু বদল আসছিল।
সে রাশেদকে সাহায্য করছিল। রাশেদ ছোট একটা দোকান খুলেছে। সৎভাবে চালাচ্ছে। আরিফুল মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসে।
সে জাহিদকে চিঠি লিখছিল। জাহিদ উত্তর দিচ্ছিল। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠছে—পুরনো বন্ধুত্ব নয়, কিন্তু একটা সৎ সম্পর্ক।
সে নাসিরের কথা মনে রাখছিল। তার ভুল থেকে শিখছিল।
সে নিজেকেও ক্ষমা করতে শিখছিল।
একদিন সন্ধ্যায় আরিফুল আবার বারান্দায় বসল। এবার তার হাতে চা ছিল, গরম। সে পান করল।
বাইরে রাত নামছিল। কিন্তু এবার অন্ধকারটা তাকে এত ভারী লাগছিল না।
সে ভাবল—মানুষ ভুল করে। কিন্তু ভুল থেকে ফিরে আসতে পারে। যে ফিরে আসে, সে আলো পায়।
সে ভাবল—আমি এখনো পুরো আলো পাইনি। কিন্তু আমি পথে আছি।

এগার.
আরিফুলের গল্পটা শুধু তার গল্প নয়। এটা অনেক মানুষের গল্প।
আমরা সবাই কখনো না কখনো কাউকে কষ্ট দিই। কেউ ইচ্ছা করে, কেউ না জেনে। কিন্তু ফলটা এক—ভেতরে একটা ভাঙা জায়গা থেকে যায়।
আর যারা ক্ষতি করে, তাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত নিজেই সহ্য করতে হয়। জাহিদ জেলে গেল। নাসির অন্ধ হয়ে মারা গেল। রাশেদ সব হারিয়ে একা হলো।
কিন্তু গল্পটা এখানে শেষ না।
কারণ মানুষ ফিরতে পারে।
আরিফুল ফিরেছে। রাশেদ ফিরছে। জাহিদ চেষ্টা করছে।
আর এই ফেরাটাই আসল গল্প।
রাত বাড়ছিল। কিন্তু আরিফুলের ভেতরে এবার একটা আলো জ্বলছিল। ছোট, দুর্বল, কিন্তু জ্বলছিল।
সে জানত—এই আলো নিভবে না।
কারণ এটা বাইরের আলো নয়। এটা ভেতরের আলো।
আর ভেতরের আলো নিভে গেলে মানুষ সত্যিই অন্ধকারে পড়ে। কিন্তু সেই আলো জ্বললে—গোটা পৃথিবী অন্ধকার থাকলেও মানুষ নিজেকে আলোকিত দেখে।
আরিফুল সেই রাতে প্রথমবারের মতো গভীর ঘুমে ঘুমাল।
আর সকালে ঘুম ভেঙে সে দেখল—জানালার বাইরে সূর্য উঠছে।
আর তার ভেতরেও কেমন একটা সূর্য উঠছে।

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy