

মোঃএনামুল হক পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা জলপাইয়ের হাট এখন ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর। মৌসুমের শুরুতেই জমে উঠেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি বাজার। প্রতিদিন এখানে ১৪০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত জলপাই কেনাবেচা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।
রবিবার (০১ নভেম্বর/২০২৬) সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে ছোট-বড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে জলপাই। কোথাও চলছে ওজন, কোথাও আকার অনুযায়ী বাছাই। পরে জলপাই পরিষ্কার করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরাও অংশ নিচ্ছেন।

মৌসুমজুড়ে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে জলপাই নিয়ে আসেন কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, নছিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে এসব জলপাই আনা হয় হাটে।
কারও কাছে এই হাট নিজের গাছের ফল বিক্রির জায়গা, আবার কারও কাছে বছরের পর বছর ধরে জীবিকার উৎস।
টোকরাভাষা চিলাহাটি ভাউলাগঞ্জ ইউনিয়নের পাটিকা পাড়া এলাকার কলেজ শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন বেশ কয়েক বছর থেকে আমি নিজের গাছের জলপাই নিয়ে হাটে এসেছি। একটি বেশ বড় জলপাই গাছ রয়েছে আমার সেই গাছের চার মন জলপাই এই হাটে এসেছি ১৫ টাকা কেজি দরে ১৬০ কেজি জলপাই বিক্রি করেছি ২৪০০ টাকায়।যে দাম পেয়েছি, তাতে আমার গত বছরের তুলনায় একটু কম দাম পেয়েছি। কারন গত বছরে প্রান কোম্পানীর প্রতিনিধিরা সরাসরি বাসা থেকে নিজেদের লোক দিয়ে জলপাই পেড়ে মেপে ২০ টাকা কেজী দরে বিক্রি করে ছিলাম। তবে এবছর জলপাই এর ফলন বেশী হয়েছে গত বছরের তুলনায় সেই হিসেবে দাম সঠিক রয়েছে আমি মনে করি। তবে আমি অনেক খুশি হয়েছি।
পঞ্চগড় থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইসাহাক আলী বলেন, “৭ থেকে ৮ বছর ধরে আমরা তিনজন মিলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে জলপাই কিনে এই হাটে এনে বিক্রি করি। দিনশেষে জনপ্রতি এক হাজার থেকে বারো শত টাকা পর্যন্ত লাভ হয়ে থাকে।”
দীর্ঘদিন ধরে জলপাইয়ের ব্যবসা করছেন স্থানীয় পাইকার মো. বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টন জলপাই কেনাবেচা করি। এর কিছু প্রাণ কোম্পানিতে যায়। বাকিগুলো ঢাকা, বরিশাল, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “এই বাজার থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ টন জলপাই কিনি। আমার মতো চট্টগ্রামের আরও পাইকার আছেন, যারা ১০ থেকে ১৫ টন করে জলপাই কেনেন। এসব জলপাই বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাতেও পাঠানো হয়।”
জলপাইয়ের এই হাট ঘিরে মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক শত মানুষের। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন পাইকারের হয়ে জলপাই কেনা, বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করে থাকেন।তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিকও রয়েছেন।
হাটে ৩০ সদস্যের একটি নারী শ্রমিক দলকে জলপাই বাছাই ও বোঁটা ছাড়ানোর কাজ করতে দেখা গেছে। তাঁদের একজন সাবিত্রী দাস বলেন, “সকাল ৮টায় আসি, বিকেল ৫টায় যাই। আমাদের কাজ জলপাই বাছাই করা ও বোঁটা ছাড়ানো। সারাদিন কাজ করে ৩০০ টাকা পাই।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেবীগঞ্জ উপজেলায় ৩ হেক্টর জমিতে জলপাই চাষ হয়। স্থানীয় উৎপাদন কম হলেও পঞ্চগড় ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন এই হাটে।
দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাঈম মোর্শেদ বলেন, দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের হাট। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে জলপাই কেনাবেচা চলে। এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারেরা এই হাটে জলপাই কিনতে আসেন। দেবীগঞ্জ তথা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে এত বড় বাজার হলেও এখানে জলপাই সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার। ফলে কেনাবেচার পর দ্রুত জলপাই পাঠিয়ে দিতে হয় বিভিন্ন গন্তব্যে। হাটের পরিধি বাড়ানো ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার জোড় দাবি জানিয়েছেন জলপাই বেচা- কেনার সাথে জড়িতরা।
প্রকাশিত: রোব বার, ০১ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.














