সংকটে ক্লিকের ব্যবসা: এআই-এর যুগে টিকে থাকবে সংবাদমাধ্যম?

2. তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে এর আগে এত দ্রুত আর এত গভীর কোনো পরিবর্তন আসেনি। ছাপাখানা থেকে ইন্টারনেট, তারপর ফেসবুক-ইউটিউব অ্যালগরিদম – প্রতিটি ধাপে সাংবাদিকতাকে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে হয়েছে। এখন সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

এই পরীক্ষার গভীরতা কতটা, তা বুঝতে চোখ রাখতে হয় যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের দিকে। ২০১৬ সাল থেকেই তারা সাংবাদিকতায় এআই-এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে। তাদের মূল প্রশ্ন একটাই – এআই কীভাবে খবর সংগ্রহ, তৈরি, যাচাই, বিতরণ এবং সবশেষে মানুষের খবর গ্রহণের অভ্যাসটাই বদলে দিচ্ছে।

২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন এবং ওই প্রতিবেদন নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন সেই প্রশ্নের বেশ কিছু অস্বস্তিকর উত্তর সামনে এনেছে। আর সেই উত্তরগুলো বাংলাদেশের মতো দেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

খবরের নতুন গেটকিপার: চ্যাটজিপিটি ও জেমিনি
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণার সবচেয়ে বড় চমক হলো – মানুষ এখন আর খবর খুঁজতে গুগলে যাচ্ছে না, সরাসরি নিউজ সাইটে তো নয়ই। তারা প্রশ্ন করছে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো এআই চ্যাটবটকে।

গবেষণা বলছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ব্রেকিং নিউজ, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা, এমনকি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতেও প্রথমে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছে। পাঠক টাইপ করছে – “আজ সংসদে কী হয়েছে সংক্ষেপে বলো”, “ঢাকায় ডেঙ্গুর সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?” – আর এআই কয়েক সেকেন্ডে সারাংশ তৈরি করে দিচ্ছে।

এখানেই সংবাদমাধ্যমের ব্যবসার জন্য বড় ধাক্কা। পাঠক যদি উত্তরটা চ্যাটবটেই পেয়ে যায়, তাহলে সে কেন আর মূল নিউজ ওয়েবসাইটে ক্লিক করবে? ক্লিক কমা মানেই ট্রাফিক কমা, ট্রাফিক কমা মানেই বিজ্ঞাপনের আয় কমা। সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউরোপ-আমেরিকার সম্পাদকরা এটিকে সরাসরি অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নিউজরুমের ভেতরে এআই: সহকারী, সাংবাদিক নয়
তবে এআই শুধু হুমকি নয়, নিউজরুমের ভেতরে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী সহকারীর ভূমিকাও নিচ্ছে।

রয়টার্সের গবেষণা বলছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এআই এখন অপরিহার্য। লাখ লাখ পাতার নথি, আদালতের রায়, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন – যা মানুষের পক্ষে মাসের পর মাস লেগে যেত, এআই তা কয়েক ঘণ্টায় বিশ্লেষণ করে প্যাটার্ন বের করে দিচ্ছে। পানামা পেপারসের মতো বিশাল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের টুল ভবিষ্যতে গেমচেঞ্জার হবে।

বাংলাদেশের নিউজরুমগুলোতেও এই পরিবর্তন দৃশ্যমান। এখন প্রায় সব বড় হাউজেই এআই ব্যবহার হচ্ছে –

ছবি ও গ্রাফিক্স তৈরিতে
বড় রিপোর্ট বা প্রেস রিলিজের সারাংশ তৈরিতে
বানান ও ব্যাকরণ সংশোধনে
ডেটা সাংবাদিকতায় তথ্য বিশ্লেষণে
ভয়েস টাইপিং ও দ্রুত অনুবাদে
শুরুর দিকে সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। অনেক গণমাধ্যম সরাসরি এআই-এর লেখা প্রম্পটসহ প্রকাশ করে দিয়েছিল, যা পাঠকের কাছে ধরা পড়ে যায়। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সাব-এডিটররা এআই কনটেন্টে ‘মানবিক ছোঁয়া’ দিচ্ছেন। কারণ এআই-এর লেখায় কিছু পদচিহ্ন থেকে যায় – অতিরিক্ত সাজানো বাক্য, একই শব্দের পুনরাবৃত্তি, প্রেক্ষাপট না বোঝা – যা ভালো সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশ হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া খবর
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য এ মুহূর্তে এআই-এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ হলো মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন।

দুটির পার্থক্য বোঝা জরুরি। মিসইনফরমেশন হলো না জেনে, বিশ্বাস করে ভুল তথ্য শেয়ার করা। আর ডিসইনফরমেশন হলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য তৈরি ও ছড়ানো। এআই দুটোকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এখন ফেসবুকে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে – কোনো রাজনীতিবিদের ভুয়া ফটোকার্ড, সংবাদমাধ্যমের লোগো নকল করে বানানো ব্রেকিং নিউজের কার্ড, এআই দিয়ে তৈরি নকল ছবি-ভিডিও, এমনকি নকল কল রেকর্ড। অনেক সময় মূলধারার মিডিয়াও যাচাই না করে এসবের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় অনেক হাউজ আলাদা ফ্যাক্টচেকিং ডেস্ক তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট ঠেকাতে এআই-ই কি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠবে?

রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের সম্মেলনে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের ফ্যাক্টচেকাররা। তাদের অভিজ্ঞতা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দেখায়:

১. যৌথ প্রচেষ্টা: স্পেনের ফ্যাক্টচেকাররা জানিয়েছেন, একা লড়াই করে লাভ নেই। তারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা মিলে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। একটি ভুয়া খবর এলেই সবাই একসঙ্গে যাচাই করে।

২. রিয়েল-টাইম টুল: ব্রাজিল একটি নিউজরুম টুল তৈরি করেছে, যা লাইভ বক্তৃতা বা সংবাদ সম্মেলন চলাকালীনই তথ্য যাচাই করে সাংবাদিককে সতর্ক করে দেয়।

৩. এআই দিয়ে এআইকে ধরা: সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, তারা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত করতে এআই-নির্মিত টুলই ব্যবহার করছে। তবে তাদের পরামর্শ খুব পরিষ্কার – এআইকে ‘সোর্স’ হিসেবে নয়, ‘সহকারী’ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ।

কনটেন্ট চুরি বনাম চুক্তি: বিশ্ব মিডিয়ার নতুন লড়াই
এআই কোম্পানিগুলো তাদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে কোটি কোটি সংবাদ নিবন্ধ ব্যবহার করেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুমতি ছাড়া। এর প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে আইনি লড়াই।

গত ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য সিয়াটল টাইমস’ ও ‘নিউজডে’ ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, পেওয়ালের আড়ালে থাকা কনটেন্টসহ তাদের সব খবর কপি করে চ্যাটজিপিটি-কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাদের সাবস্ক্রাইবার কমছে। তারা আদালতের কাছে ওই ডেটাসেট ও মডেল ধ্বংস করারও দাবি জানিয়েছে।

অন্যদিকে, আরেকটি পথও তৈরি হচ্ছে – সমঝোতার পথ। কয়েকদিন আগেই ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপ ওপেনএআই-এর সঙ্গে একটি অংশীদারত্ব চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় চ্যাটজিপিটি এখন থেকে এক্সপ্রেস গ্রুপের কনটেন্ট বৈধভাবে ব্যবহার করবে এবং তার বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমটি আর্থিক সুবিধা পাবে। এতে পাঠকও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য পাবে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য এখানেই শিক্ষা। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে শুধু এআই দিয়ে ছবি বানালে বা অনুবাদ করলে চলবে না। তিনটি জায়গায় জোর দিতে হবে:

প্রথমত, বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে মূল পুঁজি। যখন চারপাশে এআই-নির্মিত ভুয়া খবরের বন্যা, তখন যে মিডিয়ার ফ্যাক্টচেকিং শক্তিশালী, যারা ভুল হলে প্রকাশ্যে সংশোধন করে, পাঠক শেষ পর্যন্ত তাদের কাছেই ফিরবে।

দ্বিতীয়ত, দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি নিউজরুমে সাংবাদিকদের জন্য এআই লিটারেসি, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তৃতীয়ত, নিজস্ব দর্শক তৈরি করতে হবে। গুগল বা ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক – নিউজলেটার, সাবস্ক্রিপশন, কমিউনিটি – গড়ে তুলতে হবে, যাতে পাঠক খবরের জন্য চ্যাটবটে নয়, সরাসরি আপনার ব্র্যান্ডে আসে।

এআই সাংবাদিককে প্রতিস্থাপন করবে না, কিন্তু এআই ব্যবহার করা সাংবাদিক, এআই ব্যবহার না করা সাংবাদিককে অবশ্যই প্রতিস্থাপন করবে। লড়াইটা তাই মানুষ বনাম যন্ত্রের নয়, বরং যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে আরও ভালো সাংবাদিকতা করার।

প্রকাশিত :  ‍মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy