

একটি ছবি বা একটি লাইন থেকেই তৈরি হচ্ছে সংবাদ ভিডিও, রিলস ও ডকুমেন্টারি – হাতের স্মার্টফোনই এখন পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও
মিজানুর রহমান রানা :

এক সময় ভিডিও তৈরি মানে ছিল বড় ক্যামেরা, লাইট, মাইক্রোফোন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা এডিটিং। সেই দিন শেষ। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়েই ৩০ সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে ঝকঝকে ভিডিও। আপনি শুধু লিখে দেবেন কী চান, বাকিটা এআই করে দেবে। এই প্রযুক্তি এখন শুধু হলিউডে নয়, চাঁদপুরের মতো মফস্বল সাংবাদিকতা ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনেও বিপ্লব আনছে।
এআই ভিডিও কী?
সহজ ভাষায়, এআই ভিডিও হলো এমন ভিডিও যা মানুষ ক্যামেরা দিয়ে শুট করেনি, বরং কম্পিউটার তৈরি করেছে আপনার নির্দেশনা বা প্রম্পট থেকে। আপনি লিখলেন “পদ্মা নদীতে জেলেদের ইলিশ ধরা, ভোরের আলো” – এআই সেই দৃশ্যের ভিডিও বানিয়ে দেবে। আবার আপনার তোলা একটি স্থির ছবিকেও এআই নাড়াচাড়া করিয়ে জীবন্ত ভিডিও বানিয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে এআই ভিডিও তৈরির তিনটি জনপ্রিয় পদ্ধতি রয়েছে:
১. টেক্সট টু ভিডিও (Text to Video): সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি। শুধু লিখে দিলেই ভিডিও।
যেমন: আপনি লিখলেন – “চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে ইলিশের দরদাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার বিতর্ক, সিনেমাটিক শট” – এআই ৫-১০ সেকেন্ডের বাস্তবসম্মত ভিডিও তৈরি করে দেবে। এর জন্য বিশ্বের সেরা টুলগুলো হলো OpenAI এর Sora, Google এর Veo 3, Runway Gen-3 Turbo, Luma Dream Machine এবং চীনের Kling AI। এগুলো বাংলা ভাষাও মোটামুটি বোঝে।
২. ইমেজ টু ভিডিও (Image to Video): সাংবাদিকদের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর। আমাদের কাছে যে নিউজের স্থির ছবি থাকে, সেই ছবিকেই এআই ভিডিওতে রূপান্তর করে। ছবিতে হালকা জুম ইন, জুম আউট, প্যানিং, আকাশে মেঘ নড়া বা পানিতে ঢেউয়ের মতো এফেক্ট যোগ হয়। ফলে একটি সাধারণ সভার ছবিও দেখতে ডকুমেন্টারির মতো লাগে। Luma, Kling, Pika Labs এবং Runway এই কাজে সেরা।
৩. এআই অ্যাভাটার ও ভিডিও টু ভিডিও: আপনি শুধু স্ক্রিপ্ট লিখে দেবেন, পর্দায় একজন ভার্চুয়াল সংবাদ পাঠক বা পাঠিকা সেটি পেশাদারভাবে পড়ে শোনাবে। দেখে মনে হবে আসল মানুষ। HeyGen, D-ID, Synthesia এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে। এছাড়া আপনার নিজের একটি ভিডিওর স্টাইল পরিবর্তন করেও এআই নতুন ভিডিও বানাতে পারে।
কীভাবে তৈরি করবেন? – মোবাইল দিয়েই ৪ ধাপে
আপনার দামি কম্পিউটার লাগবে না, হাতের অ্যান্ড্রয়েড ফোনই যথেষ্ট।
ধাপ ১: আইডিয়া ও স্ক্রিপ্ট তৈরি
প্রথমে ঠিক করুন ভিডিওটি কী নিয়ে। যেমন – “চাঁদপুরে ইলিশের মূল্য বৃদ্ধি রোধে সচেতনতামূলক সভা”। এখন ChatGPT বা Meta AI কে বলুন “এই বিষয়ে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও স্ক্রিপ্ট লিখে দাও”। সে আপনাকে ভয়েসওভারের লেখা রেডি করে দেবে।
ধাপ ২: ভিডিও জেনারেশন
দুটি সহজ উপায় আছে।
ক. ফ্রি ও সহজ – CapCut App: বাংলাদেশের ৯০% কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এটি ব্যবহার করেন। Play Store থেকে CapCut ইনস্টল করুন। New Project এ আপনার নিউজের ছবিটি আনুন। নিচের মেনু থেকে 3D Zoom বা AI Video সিলেক্ট করুন। ছবিটি ৩ সেকেন্ডের ভিডিও হয়ে যাবে। এরপর Text এ গিয়ে হেডলাইন লিখুন, Audio > Text to Speech এ গিয়ে বাংলা ভয়েস সিলেক্ট করুন। আপনার হেডলাইনটি সে পড়ে শোনাবে।
খ. প্রফেশনাল লুক – Kling AI বা Luma: ব্রাউজারে kling.kuaishou.com বা lumalabs.ai এ যান। ফ্রি একাউন্ট খুলুন। Image to Video অপশনে আপনার ফটোকার্ডটি আপলোড করুন এবং প্রম্পটে লিখুন: slow cinematic zoom in, gentle camera movement, professional news style, 4k, realistic lighting, no distortion। ১-২ মিনিটের মধ্যে ভিডিও পেয়ে যাবেন। Kling AI প্রতিদিন ৫-৬টি ভিডিও ফ্রি দেয়।
ধাপ ৩: এডিটিং ও ব্র্যান্ডিং
ভিডিওটি CapCut বা Canva তে এনে নিচে আপনার পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের লোগো এবং ফেসবুক পেজের নাম যোগ করুন। সাথে একটি হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যোগ করলে ভিডিওটি আরও আকর্ষণীয় হবে।
ধাপ ৪: প্রকাশনা
ভিডিওটি 9:16 (রিলস/টিকটক/শর্টস) এবং 16:9 (ইউটিউব/ফেসবুক) দুই ফরম্যাটে এক্সপোর্ট করুন। ফেসবুকে আপলোড করার সময় ক্যাপশনে হেডলাইন ও বিস্তারিত কমেন্টে লিখে দিন।
কোন টুলের কী কাজ? – একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা
নতুনদের জন্য (ফ্রি):
CapCut Desktop & Mobile – সবচেয়ে সহজ, বাংলা সাপোর্ট আছে
Canva AI Video – ফটোকার্ড থেকে সরাসরি ভিডিও
Clipchamp (Microsoft) – উইন্ডোজে ফ্রি
মাঝারি মানের কাজের জন্য (ফ্রি + পেইড):
Kling AI – বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ভিডিও বানায়, ফ্রি ক্রেডিট দেয়
Luma Dream Machine – ছবি থেকে ভিডিও বানাতে সেরা
Pika Labs – দ্রুত ভিডিও বানায়
পেশাদার কাজের জন্য (পেইড):
Runway Gen-3 – হলিউডে ব্যবহৃত হয়
OpenAI Sora – সবচেয়ে উন্নত, এখনো সবার জন্য উন্মুক্ত নয়
HeyGen – AI সংবাদ পাঠক তৈরির জন্য সেরা, মাসে ২৯ ডলার
সাংবাদিকতায় এআই ভিডিওর ব্যবহার ও সতর্কতা
চাঁদপুরের মতো জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতার জন্য এটি আশীর্বাদ। একটি সভার একটি ছবি থেকেই আমরা ৩০ সেকেন্ডের একটি আকর্ষণীয় ভিডিও প্রতিবেদন বানিয়ে ফেসবুকে দিতে পারি, যা সাধারণ ছবির চেয়ে ৫ গুণ বেশি রিচ পায়। ইলিশের বাজার, নদী ভাঙন, স্কুলের অনুষ্ঠান – সবকিছুর ভিডিও কন্টেন্ট এখন একজন প্রতিবেদক একাই বানাতে পারেন।
তবে এখানে বড় একটি নৈতিক প্রশ্ন আছে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওকে কখনোই আসল ভিডিও বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি এআই দিয়ে কোনো ঘটনার ভিডিও বানান, তাহলে ভিডিওর উপরে ছোট করে লিখে দিতে হবে “এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ভিডিও” বা “AI Generated Visual”। অন্যথায় এটি গুজব ও অপতথ্য ছড়াতে পারে। প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছে।
আরেকটি বিষয়, এআই এখনো মানুষের হাত, চোখ বা লেখা নিখুঁতভাবে বানাতে পারে না। অনেক সময় ভিডিওতে হাতের আঙুল ৬টি দেখা যায়। তাই প্রকাশের আগে ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।
এআই আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে না, বরং যারা এআই ব্যবহার করতে জানবে না, তাদের চাকরি কেড়ে নেবে যারা এআই জানে। তাই ভয় না পেয়ে শিখুন। আজ থেকেই আপনার মোবাইলে CapCut এবং Kling AI ইনস্টল করে আপনার তোলা একটি ছবি দিয়ে একটি ৫ সেকেন্ডের ভিডিও বানিয়ে দেখুন। দেখবেন, আপনার হাতেই তৈরি হয়ে গেছে ভবিষ্যতের টেলিভিশন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যাত্রায় চাঁদপুর পিছিয়ে থাকবে না, বরং নেতৃত্ব দেবে – এটাই প্রত্যাশা।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬

















