‘সাংবাদিক নির্যাতনের দায় কে নিবে?’

সম্পাদকীয়

সমাজকে সুন্দর করতে হলে বা সমাজকে সুশৃঙ্খলভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে সমাজ সংস্কারকদের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাই সমাজকে টিকিয়ে রাখতে অবদান রেখে চলেছেন। তারা প্রত্যক্ষ কিম্বা পরোক্ষভাবে সমাজের সেবা করে চলেছেন। সমাজ থেকে নোংরা দূর করতে, সত্যের পক্ষে কথা বলে, ভালো কিছুকে উৎসাহিত করে নিজেদের অবদান রেখে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে সাংবাদিকরা হলেন অন্যতম। সমাজ কেমন চলছে তা’ মানুষের সামনে তুলে ধরতে তাদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু তাদের প্রতি যদি নির্যাতন হয়, তাহলে সমাজের উন্নয়নে অন্তরায় সৃষ্টির জন্যে দায়ী কারা?

অবশ্য ভালো কাজে বাধা আসবেই-এটাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি। ভালো কাজ যে করে তার শত্রু সৃষ্টি হয়ে যায় অল্প দিনের মধ্যে। কেননা সমাজে খারাপ মানুষের কোনো অভাব নেই। তারা যখন দেখে ভালো মানুষের ভালো কাজের জন্যে তাদের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, অর্থাৎ তাদের খারাপ কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে তখন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং আক্রমণ করে সাংবাদিকদের কাজের গতিকে থামিয়ে দিতে চায়!

প্রিয় সময়ে ‘সাংবাদিক নির্যাতনের দায় কে নিবে?’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি অমানবিক ও নির্লজ্জ আচরণের বহি:প্রকাশ! চট্টগ্রামের সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার এর উপর নির্যাতন আবারো প্রমাণ করলো ভালো কাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লোকের অভাব নেই। সত্য প্রকাশের জন্যে যারা সমাজে রয়েছে তাদের পিছনে আক্রমণ করার লোকের অভাব নেই। অন্যথায় একজন নিরীহ সাংবাদিকের উপর নির্লজ্জের মতো কেনো এভাবে আক্রমণ করা হবে। কেন তার উপর শারীরিক নির্যাতন করা হবে? এ ঘটনাটি আবারো আমাদের সমাজকে লজ্জার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যেহেতু তিনি সাংবাদিক সেহেতু তার উপর নির্যাতন করা হয়েছে যেন সত্য প্রকাশ করতে না পারে।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, যখন তাকে উদ্ধার করা হচ্ছিলো তখন তিনি বার বারই বিড় বিড় করে বলছিলেন, ‘ ‘আমি আর নিউজ করবো না, প্লিজ আমি নিউজ আর করব না ভাই’। এই সাংবাদিক চারদিন নিখোঁজ থাকার পর রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিরা বাজার এলাকা থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো, তার প্রতি অনেক অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। শারীরিকও নির্যাতন করা হয়েছিলো। ঐ অবস্থায় তাকে একটি গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় কুমিরা বাজারের পাশে একটি ব্রিজের পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুসারে সেখানে তিনি অজ্ঞান অবস্থায় অনেক সময় ধরে পরে ছিলেন।

সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্যে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু তারাই যখন নিরাপত্তার অভাবে ভুগে থাকেন তখন সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সাংবাদিকের উপর নির্যাতন হওয়াটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ইংগিত! তার প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে ডোবার পাশে অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় দেখাটা কতোটা অমানবিক পরিস্থিতি! এসবই হয়েছে তার সত্য লেখনির জন্যে! একজন গণমাধ্যমকর্মীর এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক অশনি সংকেত হিসেবে আমাদের সম্মুখে উঠে এসেছে।

সমাজের নিকৃষ্ট মানুষগুলো নিরাপদে সমাজে অন্যায় কাজ করতে চায়। আর তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করলেই তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে। এর সমাজের শত্রু। তারা দুর্বল ও ক্ষুদ্র মনে অধিকারী। সমাজের এ ধরনের বিভীষণদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে চরম নির্যাতন করতে পিছপা হয় না; এমন কি হত্যা পর্যন্ত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না! এদেরকে দমিয়ে রাখবে কারা!
আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, চাঁদপুরের সাংবাদিক কবির মিজিকে মোবাইলে হুমকি দেয়া হয়েছিলো। সেটাও ছিলো লেখনীর জন্যেই। ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও মৃত্যুর হুমকি দিয়েছিলো। সাংবাদিক কবিরি বিষয়টির জন্যে স্থানীয় থানায় জিডি করেছিলেন নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।
এটা অত্যন্ত দু:খজনক যে এ ধরনের নির্যাতিত সাংবাদিকরা ন্যায় বিচার পায় না। বিভিন্ন কৌশলে সাংবাদিকদের নানাভাবে নাজেহাল হতে হয়! ওরা দুর্বলকের বেঁচে থাকার অবলম্বন শেষ সম্বল জমি জোরজবরদস্তি করে জমি দখল করেন। আর এজন্যে তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা কিছু লিখলেই তাদের উপর অত্যাচার করা হয়। ওরা উচ্ছৃঙ্খলতার জন্যে স্বাধীনতা চায়। নির্ভয়ে, নির্ভিঘেœ ওরা সমাজে চর্কি ঘুরাতে চায়। কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। ওরা মন চাইলেই খাল-বিল, নদীনালা, বালুমহালসহ সরকারি ভূমিও জোরদখল করবে কিন্তু তাদের কিছুই বলা যাবে না। ওরা চোরাচালানি করবে তাদের কিছুই করা যাবে না। কেউ তাদের বিরুদ্ধে লিখতে পারবে না। লিখলেই তাদের উপর অত্যাচার করা হবে। কেউ লিখলেই তারা ক্ষেপে যায়; কেননা তাদের আঁতে ঘা পড়ে। তখন নির্মমভাবে সাংবাদিককেই অত্যাচার, নির্যাতন, নানাভাবে লাঞ্ছিত, অপমানিত, নির্যাতন করার পরিকল্পনা করে; এমনকি হত্যা করতেও তারা পিচপা হয় না-এমন উদাহরণের অভাব নেই!
সাংবাদিকদের উপর অভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন হলে রাষ্ট্র কল্যাণ ব্যহত হবে। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করা যাবে না। সত্য প্রকাশের মানুষ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে সেটা বোঝা যাবে না। সুতরাং প্রশ্ন হলো- সাংবাদিক নির্যাতনের দায় কে নেবে? সাহসী সাংবাদিকতার চর্চার সুযোগ না দিলে সমাজ কলুষিত হবে। আমরা চাই, রাষ্ট্র এ বিষয়ে জরুরীভিত্তিতে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

You might like