পূরবী ও অবিনাশ : যুবক অনার্য

তুমি আমাকে ফোন করে বোলছো:আজ বইমেলায় যাবি?

আমি বোলছি মনে মনে- আজ সারাদিন পেটে কিছু পড়ে নি।তাছাড়া মেলায় যাবার ভাড়াও আমার কাছে নেই।কিন্তু এসব কি আর পূরবীকে বলা যায়!

আমি বলি:আজ আমার ব্যস্ততা একটু বেশি প্লিজ বিশ্বাস কর।মেলায় যে বইটা আসছে সেটার কাজ এখনো বাকি আছে।অন্যদিন যাবো নিশ্চয়ই।

আমার কথা ওর কতটা বিশ্বাস হলো- জানি না।”

ও আচ্ছা” বলে পূরবী ফোনটা রেখে দিলো।আমি ভাবছি:আমি কি পূরবীকে ঠকাচ্ছি! কিন্তু আমি তো কখনোই আগ বাড়িয়ে পূরবীর কাছে যাই নি- সে সাহস অধিকার বা ইচ্ছে কোনোটাই ছিলো না আমার।

সে নিজেই তো ঘুরে ফিরে কেবলি ফিরে আসে আমারই কাছে মেঘ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টির মতো!আজ আমি প্রায় এক মাস ধরে একটি জিন্স আর একটি টি- শার্ট প’রে দিনমান ঘুরে বেড়াচ্ছি সিদ্ধ আর নিষিদ্ধ অলিগলি।

।বইমেলার যে বইটার কথা বোললাম সেটা প্রকাশককে বুঝিয়ে দিয়েছি ১৫ দিন আগেই।এখন বাকী কাজ প্রকাশকের।আমার কোনো কিছু আর করতে হবে না।

মেলায় চলে আসবে বই পায়ে পায়ে হেঁটে। কিন্তু লজ্জা থেকে বাঁচতে গিয়ে পূরবীকে আমার প্রায়শ মিথ্যে বলতে হয়।বলার পর কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি:একটি নির্মল নিষ্পাপ মেয়েকে আমি কেবল ঠকিয়ে চলেছি।অথচ কাকে বোঝাবো এই ঠকানো আমার ইচ্ছাকৃত নয়।পূরবীর বয়স কম,মাত্র সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে।আমার বয়সও বেশি নয়।

কিন্তু এই অল্প বয়সেই আমার যে অভিজ্ঞতা তার ১০০ ভাগের এক ভাগও পূরবীর নেই,থাকবার কথাও নয়।পূরবী উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।জীবন যে কতো কুৎসিত আর ভয়াবহ সে বিষয়ে ওর জানবার কথা নয় সু্যোগও নেই।মেয়েটা ঘুরে ফিরে আমার কাছেই কেনো মরতে এলো- এ কথা পূরবীকে জিজ্ঞেস করেছি বহুবার।প্রতিবার সে এড়িয়ে গেছে।

শুধু একটি কথাই বলেছিলো:”তুমি যে কি তুমি নিজেই তা জানো না”।আমার খুব হাসি পায় আমি ওর সামনেই হো হো করে হাসি।পূরবী কিছুই বুঝতে না পেরে কিছুটা বিব্রত হয়ে তাকিয়ে থেকে ভেঙচি কাটে।আমি বুঝি খুব ভাল করেই বুঝি- এসব ওর কাঁচা বয়সের ঘোর ছাড়া আর কিছু নয়।পূরবী আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে :আমার ফাইনাল শেষ হবে তারপর জবে ঢুকবো তারপর ওর মাকে বলবে আমার কথা আমাদের বিয়ের কথা।শুনে আমি বিষয়বস্তু অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবার উদ্দেশে বলি:জানিস, আল্পি আজ আমাকে ফোন করে বলে কি…..

আমার কথা শেষ না হতেই সে চট করে উঠে পড়ে আর আমাকে বিদায় না জানিয়েই সপাং সপাং করে চলে যায়।আমি জানি আল্পির কথা বললেই কেবল সম্ভব বিষয়বস্তুকে ঘুরিয়ে দেয়া।

পূরবী চলে যাবার পর আমি মনে মনে পূরবীকে বলি:পূরবী, তোর স্বপ্নগুলোকে এই সমাজ তোর বাবা মা বুট জুতো দিয়ে নির্মমভাবে থেঁতলে দেবে আর এর বিন্দু বিসর্গ কিছুই তোর এখনো জানা নেই।তুই হয়তো প্রশ্ন করবি:তোর দোষটা কোথায়?হা দোষটা তো তোরই।নুলু ভিখিরির চেয়ে অধম এই অবিনাশ কখোনই তোর যোগ্য হতে পারে!

এ কথা শুধু এই সমাজের নয়,স্বয়ং অবিনাশেরও।অবিনাশ কখনোই তোর যোগ্য হতে পারে না।দু’চারটা কবিতা লিখলেই পুরবীদের যোগ্য হওয়া যায় না রে পূরবী-সে যে তুই বুঝবিনা।তারপর তুই বোলবি:”তাহলে ভালবাসা?”আমার হাসি পাবে পুনরায়।

কিন্তু এবার আমি না হেসে শেষ বারের মতো মিথ্যে করে বোলবো:”তুই চিন্তা করিসনা।ভালবাসার জয় হবেই”।মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়ে আমি পূরবীকে শান্ত করি।অথচ আমি তো জানি – ভালোবাসায় অশ্রু আছে বোলেই ভালবাসা মহান আর তাই ভালোবাসা কেবলি হেরে যায় বার বার খুব বেশি হেরে যায়।

নিজেকে প্রশ্ন করি:তাহলে অবিনাশ কি পূরবীকে ভালোবাসেনি?খুব হাসি পায় বাংলার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে আমি হো হো করে হাসি।অবিনাশদের ভালোবাসবার কোনো অধিকার নেই।সমগ্র বাংলাদেশ আজ যেনো বা এক জাজ্বল্য অবিনাশ।পূরবী যেভাবে অবিনাশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশকে নিয়েও স্বপ্ন দেখে কতোশত মানুষ কিন্তু কে বা কারা যেন প্রতিবার সেই স্বপ্নকে কালো কালো বুট দিয়ে দুর্দান্ত থেঁতলে দেয়।

শুধু প্রশ্ন থেকে যায় – কী দোষ ছিলো বাংলাদেশের কী দোষ ছিলো পূরবীর যে পূরবী ভালোবাসতে বাসতে ফুরিয়ে যেতে চেয়েছিলো।তবে কি সব দোষ অই অবিনাশ চৌধুরির – কবিতা লেখাই প্রধানতম অযোগ্যতা যার!

You might like