

ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান প্রামানিক :
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে ১১ মার্চ এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৮২ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের সময় ছাত্রশিবিরের চার কর্মী নির্মমভাবে নিহত হন। সেই থেকে প্রতি বছর ১১ মার্চকে “শহিদ দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

ছাত্রশিবিরের চার শহিদ—সাব্বির আহমদ, আবদুল হামিদ, আইয়ুব আলী ও আবদুল জব্বার—শুধু একটি সংগঠনের কর্মী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন আদর্শিক রাজনীতির পথিক। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে আজও অনেক তরুণ সৎ ও নৈতিক শিক্ষার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আহবান করে নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠান। চারদিক থেকে শত শত ছাত্রশিবিরকর্মী গগনবিদারী শ্লোগান দিতে দিতে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে থাকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও পাশের শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। তাদের হাতে ছিল হকিস্টিক, রামদা, বর্শা, ফালা, ছোরা, চাইনিজ কুড়াল ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র। শিবিরের সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বারবার অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। শিবির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ধৈর্যের সাথেই সংঘর্ষ এড়িয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরাও শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। একপর্যায়ে নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চতুর্দিক থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিবিরকর্মীরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে সন্ত্রাসীরা আবারো সংগঠিত হয়ে হামলা চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় শহর থেকে ট্রাকভর্তি বহিরাগত অস্ত্রধারীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগ দেয়। শুরু হয় আরো ব্যাপক আক্রমণ। সন্ত্রাসীদের আক্রমণের প্রচণ্ডতায় নিরস্ত্র শিবিরকর্মীরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে।
আত্মরক্ষার জন্য শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের BNCC ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সেখানেও হায়েনাদের থাবা থেকে রেহাই পায়নি আমাদের ভাইয়েরা। সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মসজিদ ও BNCC ভবনে আশ্রয় নেয়া নিরীহ শিবিরকর্মীদের ওপর পাশবিক কায়দার হত্যায় মেতে ওঠে। সন্ত্রাসীদের আঘাতে শহীদ শাব্বির আহম্মেদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাঁর বুকের ওপর পা রেখে তাঁর মাথার মধ্যে লোহার রড ঢুকিয়ে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে সমস্ত শরীর। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শহীদ আব্দুল হামিদ ভাইকে চরম নির্যাতনের সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা একটি ইট মাথার নিচে দিয়ে আর একটি ইট দিয়ে মাথায় আঘাতের পর আঘাত করে তার মাথা ও মুখমণ্ডল থেঁতলে দেয়; ফলে তার মাথার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তাক্ত আব্দুল হামিদের মুখমণ্ডল দেখে চেনার কোনো উপায় ছিল না। ১২ মার্চ রাত ৯টায় তিনি শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করেন। শহীদ আইয়ুব ভাই শাহাদত বরণ করেন ১২ মার্চ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে। দীর্ঘ কষ্ট ভোগের পর ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন শহীদ আব্দুল জব্বার ভাই।
তাদের এ নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। শিবিরকর্মীদের আর্তচিৎকার আর আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠলেও কসাইদের পাষাণ হৃদয় এতটুকুও স্পর্শ করতে পারেনি। এ নরপশুরা দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও মাত্র অল্প দূরত্বে অবস্থানরত পুলিশবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেও এগিয়ে আসেনি। এমনকি আহত রক্তাক্ত মৃত্যুপথযাত্রী শিবিরকর্মীদের উদ্ধার করতেও কোনো ভূমিকা পালন করেনি। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামবিরোধী বাম সংগঠনগুলো ছাত্রশিবিরকে চিরতরে বাংলার জমিন থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলো। যুগে যুগে কোন তৌহিদবাদীকে অত্যাচার-জুলুম করে থামানো যায়নি, নিঃশেষ করা যায়নি। ছাত্রশিবিরকেও দমাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। কারণ ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ইসলামের জন্য সর্বদা জীবন দিতে প্রস্তুত। তারা জানে জীবনের চেয়ে শাহাদাতের মর্যাদা অনেক বেশি। তারা শহীদ সুমাইয়া, আমীর হামযা আর মুসআব (রা) এর পথে চলার জন্যই এগিয়ে চলে। শাহাদাত কতোইনা মর্যাদার।
শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন ঝরে গেছে। ১১ মার্চের শহিদরা শুধু একটি সংগঠনের জন্য নয়, বরং স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার পক্ষে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত।
শহিদদের স্মরণ করা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আজকের ছাত্রসমাজকে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। আমরা চাই, সব মতের ছাত্র সংগঠনের জন্য শিক্ষাঙ্গন নিরাপদ হোক, যাতে কেউ আর রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার না হয়।
১১ মার্চের শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগ ছাত্রসমাজের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক।
লেখক পরিচিতিঃ প্রভাষক, চাঁদপুর ইউনানী তিব্বীয়া মেডিকেল কলেজ
প্রতিষ্ঠাতা মডার্ণ শেফা ক্লিনিক,বাবুরহাট চাঁদপুর।
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ মার্চ ২০২৫ খ্রি.
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন









