

সম্পাদকীয়
চাঁদপুরের কচুয়ায় নবীন শিক্ষকদের সংবর্ধনা এবং এর পাশাপাশি মাদকবিরোধী আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। গতকাল প্রিয় সময়ে ‘কচুয়ায় মাদকবিরোধী আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি সমাজের সচেতন মানুষের নজর কেড়েছে। এ সংবাদের আলোকে আমরা বলতে পারি যে, এটি কেবল একটি সাধারণ শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল দু’টি বিষয়- শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা এবং মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে তাদের রক্ষা করা- একসাথে তুলে ধরেছে। আইনগিরী উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল পাঠদানের কেন্দ্র নয়; বরং সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

আজকের তরুণ প্রজন্ম মাদকের সহজ শিকার। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মাদকের কালো থাবা বিস্তৃত। এ পরিস্থিতিতে, শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ভরসা করে মাদক নির্ম‚ল করা সম্ভব নয়। এর জন্যে প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলা। কচুয়ার এ অনুষ্ঠানটি দেখিয়েছে যে, আলোচনা সভা এবং কুইজ প্রতিযোগিতার মতো সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করা যায়। যখন একজন শিক্ষার্থী জানতে পারে যে, মাদক তার শরীর, মন এবং ভবিষ্যৎকে কীভাবে ধ্বংস করতে পারে; তখন সে নিজে থেকেই এ ভয়াবহ পথ থেকে দূরে থাকতে আগ্রহী হয়। মানবদেহে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে শ্লোগান সম্বলিত থ্রিডি স্কেল, কলম, খাতা ও জ্যামিতি বক্স বিতরণের মতো ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
নতুন শিক্ষকদের সংবর্ধনা দেওয়া এবং তাদের এ মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। একজন শিক্ষক শুধু সিলেবাস পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে একজন আদর্শ। নবীন শিক্ষকরা যখন প্রথম থেকেই সমাজের এ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে সচেতন হবেন, তখন তারা তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারবেন। তারা কেবল ক্লাসরুমে নয়, ক্লাসের বাইরেও একজন পথপ্রদর্শকের ভ‚মিকা পালন করতে পারেন; যা’ শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করবে।
এ ধরনের উদ্যোগ কেবল কচুয়ার আইনগিরী উচ্চ বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। শিক্ষা অফিসার এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সমাজের বিভিন্ন স্তরে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেয়। একটি সমাজের যখন সকল স্তরের মানুষ এক হয়ে কোনো সমস্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেই সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।
কচুয়ার এ উদ্যোগটি একটি উদাহরণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকবিরোধী লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং নৈতিকতার বীজ বপন করতে হবে। শিক্ষকরা সেই বীজ বপনের কারিগর। অভিভাবকরা হলেন সেই ক্ষেত্রের মালি। আর শিক্ষার্থীরা হলো সেই ক্ষেত্রের ফল। যখন শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা একযোগে কাজ করবে, তখনই আমরা মাদক মুক্ত একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
এ আয়োজনটি প্রমাণ করে যে, ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো একত্রিত হয়ে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আসুন, আমরা সবাই মিলে মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে সামিল হই এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও সুস্থ জীবন উপহার দিই। কচুয়ায় অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা শুধু একটি সাধারণ অনুষ্ঠান ছিলো না, এটি ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে হলে এ ধরনের উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি, যা আমাদের পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। মাদক থেকে দূরে থাকার জন্যে তাদের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। শিক্ষকরা পথপ্রদর্শক, অভিভাবকরা সহায়ক। আসুন, আমরা সবাই মিলে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই। এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। আমরা আশা করি, এ সচেতনতা শুধু কচুয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা’ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার এ সংগ্রামে আমাদের সবাইকে নিজেদের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে শামিল হতে হবে। মাদকমুক্ত একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়ার এ অঙ্গীকার নিয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে পথ চলি।
বৃহস্পতিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫








